অর্থনীতিতে করোনা মহামারির থাবার অন্যতম বড় শিকার বিমান খাত। করোনা মহামারির কারণে চলতি বছর বিশ্বের এয়ারলাইনস ইন্ডাস্ট্রির ৮ হাজার ৪০০ কোটি ডলার ক্ষতি হতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন আইএটিএ। এ খাতের সবচেয়ে দুর্বিষহ বছর হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে চলতি বছরকে। দ্রুতই সমস্যার সমাধান না হলে এ খাত বিপর্যস্ত হওয়ার পাশাপাশি লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হারানোর শঙ্কা সংস্থাটির।
এই বছরটিকে এয়ারলাইন্স ইন্ডাস্ট্রির জন্য দুর্যোগের বছরই বলছে আইএটিএ। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের উহানে করোনা ভাইরাস শনাক্তের পর কয়েক মাস ধরেই বন্ধ অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রীবাহী বিমান চলাচল। ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়েছে এয়ারলাইনসগুলো। আইএটিএ বলছে, ২০২১ সালেও এ খাতের ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো সম্ভাবনা নেই। আইএটিএ মহাপরিচালক বলছেন, বিমান খাতের জন্য এ সংকটটি খুবই ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
করোনার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ইউরোপীয় শীর্ষ উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসে। বিশ্বব্যাপী ১৫ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা করছে এয়ারবাস। ২০২১ সালের গ্রীষ্মের মধ্যে এ ছাঁটাই কার্যকর হবে বলে বিবৃতিতে জানানো হয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় বাণিজ্যিক এভিয়েশন ব্যবসায় প্রায় ৪০ শতাংশ পতন হয়েছে। কোভিড-১৯-পূর্ব আকাশপথে ভ্রমণ শুরু হতে ২০২৩ সাল নাগাদ লেগে যেতে পারে। এখনো মহামারি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন দেশ কুলকিনারা করতে না পারায় ২০২৫ সাল নাগাদ লেগে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন অনেকে।
ফ্রান্সভিত্তিক এয়ারবাস বলছে, ফ্রান্স ৫ হাজার, জার্মানিতে ৫ হাজার ১০০, স্পেনে ৯০০, ব্রিটেনে ১ হাজার ৭০০ এবং বিশ্বের অন্যান্য অংশে ১ হাজার ৩০০ কর্মী ছাঁটাই করা হবে। করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে খরচ কমাতে ৯ হাজারের বেশি কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এমিরেটস এয়ারলাইন্স। বিশ্বে করোনা ভাইরাসের সময় কোনো বিমান সংস্থায় এটিই ছাঁটাইয়ের সবচেয়ে বড় তালিকা। করোনা সংকটের আগে এই বিমান সংস্থাটির কর্মীসংখ্যা ছিল ৬০ হাজার। প্রতিদিন সংস্থাগুলোর ক্ষতির হার বাড়ছে। আতঙ্ক নিয়ে প্রতিদিন কাজে যাচ্ছেন কর্মীরা। এতে তাদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ এবং কাজের স্বচ্ছতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একটি মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে কাটছে তাদের দিন। যে কোনো সময় চাকরি হারানোর ভয় জেঁকে বসেছে তাদের মধ্যে।
বিশ্বের অন্তত ৭০০ সংস্থার ৪ হাজার ৫০০ বিমানচালক তাদের কর্মস্থল থেকে কোনো কারণ ছাড়াই নেতিবাচক নোটিশ পেয়েছেন। যাদের মধ্যে অন্তত ১ হাজার ২০০ বিমানচালক বলছেন, করোনা ভাইরাস শুরুর পর তারা চাকরি হারিয়েছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে চাকরি হারাচ্ছে সৌদি এয়ারলাইনসের আড়াই লাখ কর্মী। করোনা ভাইরাসের প্রেক্ষিতে এই বিপুল কর্মীবাহিনীর প্রয়োজন দেখছে না সৌদি এয়ারলাইনস। বরং কর্মীসংখ্যা কমিয়ে পুনর্গঠন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এমনিতেই লাখ লাখ যাত্রী হারিয়ে সৌদি এয়ারলাইনস বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খেসারত দিচ্ছে। এরপর আড়াই লাখ কর্মী ছাঁটাই হলে এয়ারলাইনসটি খুব সহজে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না বলে মনে করছে দি ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট। আরাবি টুয়েন্টি ওয়ান সৌদি রাজপরিবারের সিদ্ধান্তে দেশটির জাতীয় এয়ারলাইনসে কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের আরেক বড় এয়ারলাইনস সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাতীয় এয়ারলাইনস এতিহাদ এয়ারওয়েজ বিপুলসংখ্যক কর্মচারীকে অব্যাহতি দিয়েছে। একই সঙ্গে দ্বিতীয় দফায় কর্মীদের হ্রাস করার জন্যে উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে।
করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকে গোটা বিশ্বেই এই খাত মুখ থুবড়ে পড়েছে। দেশগুলো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। বড় বড় এয়ারলাইনস কোম্পানিগুলো লোকসানের কারণে কর্মী ছাঁঁটাই করতে বাধ্য হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী সব আন্তর্জাতিক বিমান সেবাই বন্ধ আছে এখন। কবে শুরু হবে সে বিষয়ে সঠিকভাবে কেউ বলতে পারছে না। যুক্তরাজ্যের পতাকাবাহী বিমান পরিবহন সংস্থা ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ আনুমানিক ৩৬ হাজার কর্মীকে ছাঁটাই করার ঘোষণা দিতে যাচ্ছে। করোনার কারণে ব্যবসা বিপুল লোকসানের কারণে এমন সিদ্ধান্ত বলে জানানো হয়েছে।