পাটশিল্পের পরিণতি কী হবে?

আমাদের দেশে সমগ্র পাট খাতের ওপর এক মরণাঘাত নেমে এসেছে। যদিও সরকার দাবি করছেন যে পাট খাতকে আরো জীবন্ত করার জন্যই এই আঘাত! সরকার সোনালি করমর্দনের মাধ্যমে বিজিএমসির ২৫টি পাটকারখানার ২৫ হাজার শ্রমিকের ‘আগাম বিদায়’ [Early Retirement] দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অর্থাত্ আপাতত কারখানাগুলোতে উত্পাদন বন্ধ থাকবে, এরা পাটও নিশ্চয় এ বছর কিনবেন না এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এ বছর এরা রপ্তানিও করবেন না। পরবর্তী সময়ে প্রাইভেট-পাবলিক পার্টনারশিপের মাধ্যমে এগুলোকে চালু করা হবে। পাট কমিশনের সদস্য খালেদ রব অবশ্য মনে করেন, পাটকলগুলো এভাবে একবার বসে গেলে এদের বাজারটি হাতছাড়া হয়ে যাবে। তাই তার মতে একসঙ্গে সব বন্ধ করার এই তথাকথিত ‘শক-থেরাপি’ একটি হঠকারী সিদ্ধান্ত। যে কারখানাগুলোর বৈদেশিক অর্ডার আছে সেগুলো বন্ধ না করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

বিজিএমসির দুর্নীতি-অদক্ষতা, ক্রমাগত লোকসান ইত্যাদির বোঝা সরকার আর বহন করতে রাজি নন। দেশের অনেক ‘বুদ্ধিমান নাগরিকও’ এই ফুটো কলসিতে পানি ঢালতে নারাজ। ভর্তুকি দিয়ে রাষ্ট্রীয় অলাভজনক শিল্প-কলকারখানা ও সেবা খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে চালু রাখতে অনেকেই এই কঠিন সময়ে রাজি নন। এই যুক্তিকে কেউ কেউ অবশ্য চরম পর্যায়ে টেনে নিয়ে দাবি করেন যে ‘রাষ্ট্রীয় খাত’ মাত্রই পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া উচিত। কারণ বাজারকে রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্র দিয়ে বশ করার সকল চেষ্টা নাকি অতীতে সর্বত্রই ব্যর্থ হয়েছে। সেজন্যই রাষ্ট্রীয় খাতে পাট খাত যে অলাভজনক হয়েছে তা শুধু শুধুই হয়নি। তা অনিবার্য বিষয়ও ছিল বটে। এই চরম মতের প্রবক্তারা তাই মনে করেন ‘ব্যক্তিগতকরণ’ ছাড়া পাটকলকে লাভজনক করা সম্ভব নয়। বিশ্ব ব্যাংকের এটাই ছিল সব সময়ই সাধারণ অভিমত। এরা ভুলে যান যে, এই বাংলাদেশেই রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানার লাভ করার দৃষ্টান্ত আছে, তেমনি ব্যক্তি খাতেও লোকসানের অনেক দৃষ্টান্ত আছে।

সরকারের মধ্যে এই ‘অবাধ পুঁজিবাদের’ প্রবক্তারা সরকারের হাতে কোনো অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানই থাকা উচিত নয় বলে বিশ্বাস করেন। তাদের বিশ্বাস, বর্তমানে যা করা হলো তা বহু আগেই করা উচিত ছিল, আদমজী বন্ধ করে অনেক লাভ হয়েছে, এবার এগুলো বন্ধ করেও অনেক লাভ হবে। এদের মধ্যে কেউ কেউ পারলে বিদ্যুত্, ওয়াসা, শিক্ষা, চিকিত্সা, আইনশৃঙ্খলা ইত্যাদি সব সেবা এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সব ব্যবসায় ও শিল্পকে ব্যক্তি মালিকানায় দিয়ে দেওয়ার সুপারিশ করে থাকেন। ১৯৯০-এ সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত মডেলের বিপর্যয়ের পর তারা এ দেশে আরো সরব হয়েছেন। এই প্রবণতাকে ‘নয়া উদারনীতিবাদ’ বলা হয়, যার শুরু হয়েছিল আমেরিকা ও ব্রিটেনের দুই লৌহমানব-মানবী রোনাল্ড রিগ্যান ও মার্গারেট থেচারের আমলে। তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দর্শন ছিল ‘সেই রাষ্ট্রই সবচেয়ে ভালো, যা হবে সবচেয়ে ছোট।’ নোট ছাপানো, পররাষ্ট্রনীতি ও সীমানা রক্ষা ছাড়া রাষ্ট্রের হাতে অন্য কোনো দায়িত্ব থাকা উচিত নয়। তাদের উত্তরসূরিরা এখনো বহাল তবিয়তে জীবিত আছেন।

তবে করোনাকালে এই মতামতের নেতিবাচক দিকটি সারা বিশ্বে অনেক ভালোভাবে উন্মোচিত হয়ে গেছে। প্রমাণিত হয়েছে যে যেসব দেশে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় খাত শক্তিশালী—সেসব দেশে করোনা সংকটকে অনেক পারঙ্গমভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হয়েছে। সবকিছু বিরাষ্ট্রীয়করণ না করেও চীন-ভিয়েতনাম-কিউবার মিশ্র মালিকানার মডেলটি সফল হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা ‘Washington Consensus’কে ‘Beijing Consensus’ দ্বারা প্রতিস্থাপিত করার কথা বলতে শুরু করেছেন। [দেখুন John Williamson, “Is the ‘Beijing Consensus’ now dominant?”, Asian Affairs, 2012] পুরোনো উদারনীতিবাদীরা কিন্তু অতটা চরমপন্থি নন তারা অনেকেই ‘কল্যাণমুখী পুঁজিবাদের’ কথা বলেন। পক্ষান্তরে ‘নয়া উদারনীতিবাদ’, ‘বাজার ও ব্যক্তিমালিকানাকে’ অ্যাবসোলিউট করে ফেলেছে।

প্রথম পর্ব-ব্রিটিশ ও পাকিস্তান পর্ব

পূর্ব বাংলায় নীল চাষ, পাট চাষ, ইত্যাদি হতো। এসব কৃষিপণ্য ব্রিটিশরা নিজেদের দেশে নিয়ে প্রসেস করে ভারতেই পুনরায় রপ্তানি করতেন। আমরা ছিলাম কাঁচামাল রপ্তানিকারক এবং ওরা ছিল তৈরি পণ্য রপ্তানিকারক। ফলে আমাদের দারিদ্র্য কমেনি। পূর্ব বাংলার কৃষকের রক্তে ডান্ডির জুট মিলগুলোর সমৃদ্ধি গড়ে উঠেছিল। পাকিস্তান কায়েমের পর প্রায় একই ঘটনা ঘটেছে। একদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের সমৃদ্ধি ও ২২টি ধনী পরিবার গড়ে উঠেছে পাট থেকে উদ্বৃত্ত মূল্য আহরণ করে। এজন্য পুরো পাকিস্তান আমলে ১৯৫৪, ১৯৬৬, ১৯৬৯, ১৯৭০ সালে যত বড় বড় গণতান্ত্রিক আন্দোলন তখন হয়েছিল তার পুরোভাগে দাবিটি ছিল পাটশিল্পের জাতীয়করণ এবং সেই সূত্রে ২২টি পরিবারের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের হাত থেকে অর্থনীতিকে মুক্ত করার দাবি।

পাটশিল্পের দ্বিতীয় পর্ব—১৯৭২-৭৫

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর সরকার প্রায় ৯৫ শতাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করে নেয়। গঠিত হয় ১১টি সেক্টর করপোরেশন। কিন্তু সেখানে প্রথমেই যে সংকট সৃষ্টি হয় তা হচ্ছে উপযুক্ত ‘ব্যবস্থাপনার সংকট’। পৃথিবীতে তখনো এবং এখনো বহু জায়গাতেই রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে বহু বৃহত্ কারখানা বা করপোরেশন দক্ষতার সঙ্গে চলছে। চীনের শক্তিশালী সফল রাষ্ট্রীয় করপোরেশনগুলো তার উদাহরণ। এছাড়া ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান, ভারত, ভিয়েতনাম, কিউবা, বিভিন্ন জায়গায় নানা ধরনের ব্যবস্থাপনা মডেলে সামাজিক বণ্টনের শুভ দিকটি টিকিয়ে রেখে ব্যক্তিগত উদ্দীপনাকে নিশ্চিত করার জন্য বহু চমকপ্রদ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। এসব থেকে বোঝা যায় যে, ‘কেন্দ্রীভূত আমলাতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের’ বিকল্প ‘নয়া উদারনীতিবাদী মুক্তবাজার’ নয়, বরং কোনো না কোনো ধরনের দেশোপযোগী প্রয়োগবাদী মিশ্র অর্থনীতিই হচ্ছে অধিকতর কল্যাণকর ও দক্ষ বিকল্প; যেমনটি আমাদের ৭২-এর সংবিধানে বর্ণিত আছে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমরা পাট খাতের জন্য রাষ্ট্রীয় মালিকানা রেখেই সেরকম কোনো Innovative Management Sestem গড়ার দিকে অগ্রসর হলাম না। এত রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার পরেও এ খাতে ৪৪ বছরে মোট লোকসান হয়েছে মাত্র ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আর খোঁজ নিয়ে দেখা যায় যে, রাষ্ট্রীয় মালিকানা অব্যাহত রেখে, শুধু বিজিএমসির মাথাভারী প্রশাসন থেকে মুক্ত হতে পারলে (বর্তমানে কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংখ্যা ২৯০৯ জন!), বিজিএমসি পাটটা ঠিকমতো কিনলে, যন্ত্রপাতির আধুনিকায়ন হলে এবং উত্পাদনক্ষমতার পূর্ণ সদ্ব্যবহার হলে এ লোকসান হতো না।  কম দাম বা সংকুচিত বাজার বা উচ্চ মজুরি কোনো সমস্যা হতো না, নতুন মেশিনে উত্পাদনশীলতা তিন গুণ বেড়ে যায় বিধায় দ্বিগুণ মজুরি দিয়ে বর্তমান শ্রমিকসংখ্যা রেখেই কারখানা লাভজনকভাবে চালানো সম্ভব হতো।

অতীতে যত পেছনে যাওয়া যাবে ততই দেখা যাবে পাট সব সময়ই কিছুটা লোকসান দিলেও তাকে রাষ্ট্র সামাজিক প্রয়োজনেই ভর্তুকি দিয়ে টিকিয়ে রেখেছে। কারণ পাটশিল্প একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রাবান্ধব, পরিবেশবান্ধব, কৃষিবান্ধব ও শ্রমবান্ধব একটি শিল্প।

পাটশিল্পের আত্মহত্যা :তৃতীয় পর্ব

পাটশিল্প পুনরুজ্জীবনের তিনটি বিকল্প প্রস্তাব এ মুহূর্তে  টেবিলে ছিল—১। প্রথমত, শ্রমিকদের সোনালি করমর্দনের মাধ্যমে ৫ হাজার কোটি টাকা দিয়ে বিদায় করে দেন। তাতে পাটকলগুলো আপাতত বন্ধ হয়ে যাক, কিন্তু আমরা বছর বছর ফুটো পাত্রে পানি ঢালা থেকে রক্ষা পাই। এক বছর পর ব্যক্তি খাতের হাতে কারখানাগুলো পিপিপি করে তুলে দেওয়া হোক। পিপিপির শর্ত কী হবে পাটমন্ত্রীর বক্তব্যে তা কিন্তু কোথাও স্পষ্টভাবে বলা হচ্ছে না। যদিও এর দুই দিন পর শ্রম প্রতিমন্ত্রী ৩০ জুলাই শ্রমিকনেতাদের বলেছেন যে, এক্ষেত্রে আধুনিকায়নের নানা মডেল অনুসরণ করা যেতে পারে, যেমন—লিজ মডেল, জি টু জি মডেল, জয়েন্ট ভেনচার মডেল, পিপিপি মডেল ইত্যাদি।

২। দ্বিতীয়, প্রস্তাব ছিল চাইনিজদের সঙ্গে ২০১৬ সালের এমওইউ পুনরুজ্জীবিত করা হোক। চাইনিজ রাষ্ট্রীয় করপোরেশন ও বিজিএমসি যৌথ বিনিয়োগ করে কারখানার যন্ত্রপাতি খোলনলচে বদলে ফেলুক। প্রতিটি কারখানার সঙ্গে আলাদা Performance Contract হোক। চীনের জন্য বড় অংশ রেখে বাকি পণ্য স্বদেশের ও বহির্বিশ্বে বাজারজাত করা হোক। এটাকে জয়েন্ট ভেনচার বলা যেতে পারে, যার উল্লেখ শ্রম প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ানের প্রস্তাবে আছে। এজন্য ৬ হাজার কোটি টাকা লাগতে পারে। এতে রাষ্ট্রীয় মালিকানার শেয়ার ও চীন সরকারের ঋণ বা  শেয়ার থাকতে পারে। কিন্তু আমরা ৬ হাজার কোটি টাকা পুরোটাই দিলে তখন মালিকানা সবটাই আমাদের হতে পারে।

 ৩। কয়েকটি নির্বাচিত পাটকলে ঐসব প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক সংস্থা, ম্যানেজমেন্ট ও বিজিএমসি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে Performance Contract করে নতুন কর্তৃপক্ষের হাতে ১ হাজার ২০০ ঐ নির্বাচিত কারখানা কয়টি আধুনিকায়ন করে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হোক। পরীক্ষার দিনগুলো পর্যন্ত অন্য সব পাটকলগুলো যাদের অর্ডার আছে—বিদেশে ক্রমবর্ধমান বাজার আছে, তা আপাতত চালু রাখা হোক। আর চলতি জুলাই-আগস্ট মাসে পাট কেনার জন্য তাদের চলতি পুঁজি ধার দেওয়া হোক এবং পাট ক্রয়ে দুর্নীতি বন্ধ করা হোক। তার পরও যেটুকু লোকসান হবে তা মেনে নিয়ে সংস্কারের সাফল্যকে আস্তে আস্তে ছড়িয়ে দিতে হবে।

সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, এই প্রস্তাবগুলো নিয়ে কোনো বিবেচনাই হলো না। পাটের বাজার আমরা হারাচ্ছি। পাটচাষি ও পাট ব্যবসায়ীরা হঠাত্ করে মৌসুমের সময় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। শ্রমিকরা বেকার হয়ে গেছেন। তাদের পাওনা দেওয়া হবে সেপ্টেম্বরের পর যখন বাজেটের টাকা বিজিএমসির হাতে আসবে। তাও কখন কতটুকু কীভাবে দেওয়া হবে, সবই অনিশ্চিত। করোনাকালে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার না করে নতুন করে আমরা অনেক বেশি টাকা খরচ করে (সরকারের প্রস্তাব কার্যকর করার জন্য লাগবে ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি  টাকা, কিন্তু শ্রমিকদের প্রস্তাবানুসারে লাগবে মাত্র ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা) দরিদ্রতা বৃদ্ধি করার উদ্যোগ নিয়েছি। তবে এখনো সময় আছে শ্রমমন্ত্রীর বিকল্প প্রস্তাবগুলো বিবেচনায় নিয়ে নয়া উদারনীতিবাদের রাশ টেনে ধরার।

n লেখক :অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়