করোনা সংকটে আয়-রোজগার সীমিত হয়ে পড়ায় বন্দরনগরী চট্টগ্রামে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের ঘটনা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধে সরকারি নির্দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেকটাই সীমিত আকারে চলছে। সরকারি অফিস খুললেও এখনো সেভাবে গতি আসেনি বেসরকারি বা ব্যক্তিগত খাতে। অসংখ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শপিংমল ও দোকানপাট বন্ধ। করোনা আতঙ্কে চেম্বারে বসেন না অনেক চিকিত্সক। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের আয়-রোজগার পুরোপুরি বন্ধ। প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষই আয় হারিয়ে বেকায়দায় পড়েছেন। এ অবস্থায় যারা ভাড়া বাসায় থাকেন তাদের বাড়িভাড়া মওকুফের দাবি উঠেছে। করোনার অজুহাত দেখিয়ে অনেক ভাড়াটিয়া গত কয়েক মাস ধরে ভাড়া দিচ্ছেন না। অনেকে ভাড়া দিতে না পেরে বাসা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। এই অবস্থায় অবস্থাপন্ন বাড়িওয়ালা ভাড়াটিয়াদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ করলেও ভাড়ার ওপর নির্ভরশীল বাড়িওয়ালারা পড়েছেন বেকায়দায়। নিয়মিত ভাড়ার টাকা না পাওয়ায় অন্য পেশার মতো বাড়িওয়ালাদের সংসারেও শুরু হয়েছে টানাপোড়েন। ভাড়ার টাকা আদায় নিয়ে প্রায়ই বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে ঝগড়া-ফ্যাসাদ কিংবা মারামারি হাতাহাতির মতো ঘটনাও ঘটছে। অনেক বাড়িওয়ালা নিরুপায় হয়ে কম ভাড়া নিচ্ছেন। আবার অনেকে সমঝোতার জন্য ছুটছেন ওয়ার্ড কাউন্সিলর, থানা পুলিশ বা আদালতে। ভাড়াটিয়া পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন বাড়িভাড়া মওকুফের দাবি তুললেও এ নিয়ে সরকার বা সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত কিছু বলা হয়নি। বাড়ির মালিকদের হোল্ডিং ট্যাক্সসহ বিভিন্ন ধরনের কর ও সার্ভিস চার্জ মওকুফের মতো কোনো সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়নি। ফলে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়া উভয়েই পড়েছেন সংকটে। সব মিলিয়ে চরম এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির দিকে এগুচ্ছে বাড়িওয়ালা-ভাড়াটিয়া সম্পর্ক।
এদিকে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টির পেছনে ৩০ বছরের পুরাতন আইনটি সংস্কার না হওয়াকে চিহ্নিত করেছে মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন। বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনকে যুগোপযোগী করার আহ্বান জানিয়ে সংস্থাটির পরিচালক অপারেশন অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান বলেন, ৩০ বছরের পুরোনো আইন দিয়ে চলছে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রকের আদালত। যে আদালতের নিজস্ব কোনো বিচারক নেই। সিনিয়র সহকারী জজকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এ আদালতের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়। ফলে এই আদালতে হাজার হাজার মামলার জট তৈরি হয়েছে। দুর্বল আইনটিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ সংক্রান্ত এবং আপস বিরোধ নিষ্পত্তির কোনো বিধান উল্লেখ নেই। ভাড়া চুক্তিনামায় কী কী বিষয় অবশ্যই উল্লেখ থাকতে হবে তারও উল্লেখ এই আইনে। ফলে ৮০ শতাংশ বাড়িভাড়া চলে মনগড়া পদ্ধতিতে। চুক্তিনামায় থাকে অদ্ভুত শর্ত যা স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থি। তাই বিরোধ নিষ্পত্তি দূরের কথা বাড়িওয়ালা-ভাড়াটিয়া সম্প্রীতি নষ্ট হয়ে সামাজিক শান্তিও বিনষ্ট হচ্ছে প্রতিনিয়ত।