করোনাকালে মানবতার প্রশ্ন

আবুল কাসেম ফজলুল হক

করোনা ভাইরাসের প্রকোপ সাত মাস ধরে চলছে। এর মধ্য ৫ লাখের বেশি মানুষের এই ভাইরাসে মৃত্যু ঘটে। আসলে মৃত্যুর সংখ্যা আরো অনেক বেশি। পৃথিবীব্যাপী করোনার আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য মানুষ গৃহবন্দি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বিভিন্ন দেশের এ সংক্রান্ত গবেষণা কেন্দ্র, চিকিত্সক এবং সরকার নানা নিয়মবিধি ঘোষণা করেছে। এর মধ্যেই চলছে মানুষের জীবনযাত্রা ও মৃত্যু। করোনার গ্রাস থেকে অব্যাহতি লাভের কার্যকর কোনো উপায় এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। কলকারখানা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। সরকার, বিভিন্ন সংস্থা ও ধনী লোকেরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে গরিব লোকদের সাহায্য করার চেষ্টা চালাচ্ছে। চাহিদার তুলনায় এসব অপর্যাপ্ত। শেষ পর্যন্ত কী হবে বলা যায় না। দুনিয়াব্যাপী সবাই এবং বাংলাদেশে আমরা আশা করছি গবেষকদের চেষ্টার মধ্য দিয়ে প্রতিকারের উপায় হবে।

করোনা সূচিত হলে বিশিষ্ট নাগকিরদের থেকে বলা হয়েছিল যে বিপদের অভিজ্ঞতার মধ্যে মানবতার বিকাশ ঘটবে। তারা রিলিফ দেওয়ার দৃষ্টান্ত দেখে হয়তো এটা ভেবেছিলেন। কিন্তু মানবতার বিকাশ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটে না। তার জন্য নেতৃত্ব, সাংগঠনিক প্রচেষ্টা এবং শিক্ষা ও কাজ দরকার হয়। একসময় ছিল, যখন ধর্ম প্রবর্তকেরা মানবকল্যাণের সমর্থকদের নিয়ে কাজ করতেন। তারা বাধাবিপত্তির মধ্য দিয়ে অবস্থার উন্নতি ঘটাতেন। পরবর্তীকালে দার্শনিক বৈজ্ঞানিকেরা আত্মপ্রকাশ করেছেন গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, আন্তর্জাতিকতাবাদ ইত্যাদি আদর্শ নিয়ে। আদর্শের সঙ্গে ছিল কর্মসূচি, কর্মনীতি ও কার্যক্রম। এখন অবস্থা ভিন্ন। ধর্ম, আদর্শ, নীতি—এসব প্রায় নেই। সুবিধাবাদ, মুনাফেকি ও ভোগবাদ এখন দুনিয়াব্যাপী শাসকশ্রেণির লোকদের জীবননীতি। সাধারণ মানুষও শূন্যতার মধ্যে পড়ে গেছে। এ অবস্থায় করোনাকালে মানবতা বিকাশের সমস্যা বিবেচ্য।

বৃহত্ শক্তিবর্গ আগের মতোই আচরণ করছে। তাদের মধ্যে মানবতা, সভ্যতা, প্রগতি—এসব নিয়ে কোনো চিন্তাই দেখা যায় না। চীনকে কোণঠাসা করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগীরা। চীন তার বাণিজ্যনীতি নিয়ে এগিয়ে চলার চেষ্টা করছে। ঠান্ডা লড়াই চলছে বৃহত্ শক্তিবর্গের মধ্যে। আছে কেবল স্বার্থের ব্যাপার, আদর্শের কোনো ব্যাপার নেই। প্রত্যেক রাষ্ট্রের ভেতরে শাসকশ্রেণি ও কয়েমি স্বার্থবাদীরা আগের নীতি নিয়েই চলছে। অবস্থার চাপে করোনা মোকাবিলার চেষ্টা করছে মাত্র। দুর্নীতি ও সব রকম অনাচার চলছে। আসলে মানবতা বিপন্ন হয়ে চলেছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই। এর মধ্যে অনেক ঘটনা ঘটেছে; কিন্তু মানবতা উত্থানশীল হয়নি, নিম্নগামী। যে অবস্থা বিরাজ করছে, তাতে দরকার মানবতা বিকাশের লক্ষ্যে একটি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে সেই কেন্দ্র থেকে সাংগঠনিক  আন্দোলন পরিচালনা করা। কেন্দ্রের মূল উদ্দেশ্য হবে সাংগঠনিক প্রচেষ্টার দ্বারা সমাজে, বিশেষ করে ছাত্র, তরুণদের মধ্যে মানবিক গুণাবলির বিকাশ সাধন আর পাশবিক প্রবণতার অবদমন। মানুষের স্বভাব থেকে ক্ষতিকর প্রবণতা নির্মূল করার উপায় আজও অজানা। যেসব গুণ কেবল মানুষের আচরণে আছে অন্য কোনো প্রাণীর আচরণে নেই, সেগুলোই মানবিক গুণ। মানবিক গুণাবলিই মানবতা বা মনুষ্যত্ব। কোনো ব্যক্তির মধ্যে মানবিক গুণাবলির অভাব ঘটলে সেই ব্যক্তি অমানুষ বা মানবেতর প্রাণী বা পশু বলে অভিহিত হয়।

ব্যক্তিগত মানবতার মতোই আছে জাতীয় মানবতা। সময়ের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেক জাতির মানবতাই গতিশীল; গতিপথ আঁকাবাঁকা, উঁচুনিচু। অভ্যন্তরীণ ও আভ্যন্তরীণ বিরোধে জটিল। কোনো রাষ্ট্রে মানবিক গুণাবলির প্রতি নাগরিকদের আস্থা থাকলে তারা সেই গুণাবলি রক্ষা করে চলতে এবং কাজের মধ্য দিয়ে নিজেদের জীবন ও পরিবেশকে উন্নত করতে চেষ্টা করে। তাতে রাষ্ট্রে সুশাসন সম্ভব হয়। সমাজে মানবিক গুণাবলির প্রতি আস্থা কমে গেলে ভাওতা, প্রতারণা, মিথ্যাচার, দুর্নীতি, বৈষম্য, সন্ত্রাস, জুলুম, জবরদস্তি, অসামাজিক কার্যকলাপ, হত্যা, আত্মহত্যা ও দুর্ঘটনা বেড়ে যায়। তাতে রাষ্ট্রে দুঃশাসন অনিবার্য হয়। অবশ্য সুশাসন ও দুঃশাসনের মধ্যে নেতৃত্বের ভূমিকা থাকে। যে জনসাধারণ যখন যেমন নেতৃত্বের যোগ্য হয় সেই জনসাধারণ তখন ঠিক সেই রকম নেতৃত্বই লাভ করে।

উত্পাদনশীলতা, সৃষ্টিশীলতা, চিন্তাশীলতা, ভাষা, মূল্যবোধ, নৈতিক চেতনা, আইনকানুন, রীতিনীতি, স্নেহ-প্রেম, শ্রদ্ধা, সামাজিক সম্প্রীতি, সর্বজনীন কল্যাণবোধ, ধর্ম, আদর্শ, জ্ঞান-বিজ্ঞান, আবিষ্কার-উদ্ভাবন, পরিবার, জাতি, রাষ্ট্র ও বিশ্বব্যবস্থা ইত্যাদি নিয়ে মানুষ চলছে। এসবের ভালোমন্দ অবস্থার মধ্য দিয়াই প্রকাশ পায় সভ্যতার। সভ্যতাই মানবতার অবলম্বন। সংস্কৃতি সভ্যতারই নামান্তর। ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষ উন্নতি করে চলছে এবং পরিবেশকেও উন্নত করছে। আবহমান কাল ধরে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে মানুষের কর্মশক্তি ও সৃষ্টিশক্তি বিকশিত হচ্ছে এবং এই বিকাশের সম্ভাবনা অফুরন্ত।

নগদ কোনো স্বার্থ হাসিলের জন্য যখন কোনো ব্যক্তি মূল্যবোধ, নৈতিক চেতনা, সর্বজনীন কল্যাণ, বুদ্ধি ইত্যাদি বিসর্জন দিয়ে সুবিধাবাদ অবলম্বন করে, তখন সেই ব্যক্তি মানবেতর প্রাণীর পর্যায়ে নেমে যেতে থাকে। সে অবস্থায় লোকে তাকে জানোয়ার বা পশু বলে অভিহিত করে। সুবিধাবাদীরা ব্যক্তিগত ও সম্মিলিতভাবে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য সমাজ, জাতি ও রাষ্ট্রের ক্ষতি করে।

মানুষের সত্তায় মানবিক প্রবণতা ও পাশবিক প্রবণতা দুটোই একসঙ্গে বিরোধরত থাকে। ব্যক্তির জীবনে যেমন, জাতির জীবনেও তেমনি দুই প্রবণতার মধ্যে চলে বিরোধ। জাতীয় জীবনে ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিরাজমান এই বিরোধে পাশবিক প্রবণতা প্রবল ও ক্ষমতাসীন হলে দুর্নীতি, সন্ত্রাস, অসামাজিক কার্যকলাপ, হত্যা, আত্মহত্যা, জুলুম-জবরদস্তি ও দুঃশাসন প্রাধান্য বিস্তার করে; আর মানবিক প্রবণতা প্রবল ও ক্ষমতাসীন থাকলে সমাজে শান্তি বিরাজ করে, সম্প্রীতি বৃদ্ধি পায়, সুশাসন দেখা দেয়। রাষ্ট্র ব্যবস্থায়, সংগঠনে ও প্রতিষ্ঠানে শুভশক্তি প্রবল ও কর্তৃত্বশীল থাকলে আইনকানুন ও অবস্থা ভালো থাকে, আর অশুভ শক্তি প্রবল ও কর্তৃত্বশীল হলে আইনকানুন ও অবস্থা খারাপ হয়।

ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত চেষ্টা দ্বারা ব্যক্তিজীবন, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থাকে উন্নত করতে করতে মানুষই একসময় পৃথিবীকে স্বর্গে উন্নীত করবে। তার জন্য ক্রমাগত মানবতার বা মনুষ্যত্বের উন্নতি সাধন করতে হবে। স্বতঃস্ফূর্তভাবে হবে না। নিরন্তর ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত চেষ্টা ও চিন্তা লাগবে।

উন্নত বিজ্ঞান-প্রযুক্তির ও শ্রমশক্তির কল্যাণে ১৯৮০-র দশক থেকেই পৃথিবীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় উত্পাদন বৃদ্ধি বেশি হচ্ছে। অবস্থা এখন এমন হয়েছে যে, এই প্রথমবারের মতো পৃথিবীব্যাপী সব মানুষেরই খাওয়া-পরার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আগে লোকসংখ্যা কম থাকলেও উত্পাদন কম হওয়ার ফলে সব মানুষের খাওয়া-পরার সুযোগ হতো না। এখন আইনকানুন উন্নত করা হলে—অন্যায় কমালে ও ন্যায় বাড়ালে গোটা পৃথিবীতে সব মানুষের নিরাপত্তা ও সম্মানজনক জীবনযাত্রা সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তবে শুভ বোধের অভাবে এই সুযোগের সদ্ব্যবহার হচ্ছে না। চলমান বাস্তবতায় ডিজিটাল পদ্ধতির সুফল জনজীবনে অল্পই আসছে। ক্ষমতা ও সম্পদ পুঞ্জীভূত হচ্ছে মোট জনসংখ্যার এক ক্ষুদ্র অংশের কাছে। পৃথিবীর প্রায় সব রাষ্ট্রেই ক্ষমতা ও সম্পদের এই কেন্দ্রীকরণের গতি মনোপলির দিকে। বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থায় বৈষম্য বাড়ছে। অন্যায়-অবিচার বাড়ছে, যুদ্ধ, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ চলছে, শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থাকে গণবিরোধী রূপ দেওয়া হয়েছে; মতপ্রকাশের ও চিন্তার স্বাধীনতা খর্ব করা হয়েছে, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং জাতীয়তাবাদ ও তার সম্পূরক আন্তর্জাতিকতাবাদ, পুরাতন পরিত্যক্ত সংস্কার-বিশ্বাস পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে, সাধারণ মানুষের মধ্যে অদৃষ্টবাদ বাড়ছে—মানবতা বিপন্ন থেকে বিপন্নতর হচ্ছে।

এই অবস্থায় মানবতার উন্নতিকল্পে নতুন চিন্তাধারা ও কর্মধারা সৃষ্টির লক্ষ্যে গঠন করা হয়েছে মানবতা চর্চাকেন্দ্র। এতে মানুষ ও তার পরিবেশবিষয়ক সবকিছু নিয়েই অনুসন্ধান, অধ্যায়ন ও গবেষণা চালানো হবে। দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্য ও শিল্পকলা ইত্যাদি সবকিছুই চর্চায় আসবে। ছাত্র-তরুণদের মধ্যে প্রগতিশীল নতুন চেতনা ও কর্মস্পৃহা সৃষ্টির জন্য এই কেন্দ্র থেকে প্রচারকার্য চালানো হবে। মানবিক গুণাবলির বিকাশের জন্য এবং মনোজগতের পরিবর্তনকে স্থায়িত্ব দেওয়ার জন্য আর্থসামাজিক-রাষ্ট্রিক ব্যবস্থারও অনুকূল পরিবর্তন অপরিহার্য। সেই পরিবর্তনের জন্যও প্রচারকার্যের দ্বারা জনমত গঠন করা হবে। এই সংগঠন কাজ করবে বাংলাদেশের পরিসরে, গোটা পৃথিবীকে সামনে নিয়ে।

কেবল সামাজিক দূরত্ব ও বিচ্ছিন্নতা বজার রেখে চললেই হবে না, সব রকম কাজকর্ম করার ও উন্নতির উপায় বের করতে হবে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, দুঃসময়ের সুযোগ নিয়ে অপরাধপ্রবণতা ও মানবতাবিরোধী কার্যকলাপ বেড়ে চলছে। দুর্নীতি দমন কমিশন দিয়ে সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। এ অবস্থায় সবকিছুর মূলে মানবতার বিকাশের বৃহত্তর কার্যক্রম অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে। সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো এ কাজে অগ্রসর হলে ভালো হতো। বিবেকবান চিন্তাশীল ব্যক্তিদের এ কাজে অগ্রসর হতে হবে।

n লেখক : চিন্তাবিদ ও সাবেক অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়