মো. জাহিদ হাসান
‘কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও বুক সমান, বাঁধ ভেঙে প্লাবন, পানির মধ্যে জেগে থাকা গ্রামগুলো যেন একেকটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ’—এমন করুণ চিত্র দেখা যাচ্ছে বন্যা, অতি বর্ষণ ও জলাবদ্ধতায় নিমজ্জিত বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকায়। ২১ জেলায় ৩০ লাখের বেশি মানুষ এখন পানিবন্দি। পানিবন্দি থাকায় পানি ও খাবারসংকট দেখা দিয়েছে এসব এলাকায়। অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে রয়েছে মহামারি আকার ধারণ করা করোনা ভাইরাস। মহামারি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বিপর্যস্ত গোটা দেশ। শুধু বাংলাদেশ নয়; দক্ষিণ এশিয়ার আরো দুটি দেশ ভারত ও নেপালে বন্যা পরিস্থিতির অবনতির সঙ্গে সঙ্গে মানবিকসংকট চরম আকার ধারণ করেছে। চারদিকে আজ শুধু মৃত্যুর মিছিল। ইউনিসেফের তথ্যমতে, বাংলাদেশে চলমান বন্যা পরিস্থিতিতে ক্ষতির মুখে পড়েছে ২৪ লাখের বেশি মানুষ। এর মধ্যে ১৩ লাখ শিশু আছে এবং ৫ লাখের বেশি পরিবার তাদের ঘরবাড়ি হারিয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের হিসাবেই (২৩ জুলাই পর্যন্ত) গত তিন সপ্তাহে বন্যার পানিতে ডুবে ও সাপের কামড়ে ৮৭ জন মারা গেছে। এরই মধ্যে পানিবাহিত নানা রোগে ৬ হাজার ৩৮০ জন আক্রান্ত হয়েছে।
কিন্তু কথা হচ্ছে, বন্যায় কি শুধু মানুষেরই জীবন বিপন্ন হয়? বানের পানিতে ভেসে আসতে দেখা যায় গৃহপালিত প্রাণী থেকে শুরু করে বন্যপ্রাণীদের। আবাসস্থল হারিয়ে, খাবার না পেয়ে একটু উঁচু ডাঙার খোঁজে অনেক সময় এসব অসহায় প্রাণী মানুষের কাছাকাছি চলে আসে। সংবাদপত্র মারফত জানতে পেরেছি, দেশের কয়েকটি জায়গায় গণহারে কুকুর, শিয়াল, মেছোবাঘ ও সাপ হত্যা চলছে। প্রাণিকুলের সঙ্গে এমন নিষ্ঠুরতা কেবল অমানবিকই নয় বরং প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় হুমকিস্বরূপ। অপর দিকে, বন্যাকবলিত এলাকার কৃষকেরা গবাদি পশু নিয়ে পড়েছেন চরম বিপাকে। বিশেষ করে কোরবানিতে বিক্রি করার জন্য সারা বছর ধরে যারা পশু পালন করেছেন, তারা পড়েছেন মহাবিপাকে। কোরবানির পশু ভালো দামে বিক্রির স্বপ্ন এখন বানের পানিতে ভাসছে। প্রতি বছরই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো মৌসুমি বৃষ্টির প্রভাবে কমবেশি বন্যাকবলিত হয়। বাংলাদেশের উত্তরে হিমালয় ও দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর থাকার কারণে ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ সব সময়ই বিপদাপন্ন। যেমন: এ বছর মে মাসে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের কারণে সারা দেশের ২৬টি জেলায় প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিগত কয়েক বছর ধরে একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপে দিশেহারা দেশের মানুষ। কিন্তু প্রকৃতির এই স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের ব্যবস্থাপনায় আমরা কতটুকু সফলতা দেখাতে পেরেছি?
‘বন্যা হলে ত্রাণ বিতরণ করতে হবে’—এমন বহু বছরের পুরোনো চিন্তাভাবনায় আমরা নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। একটি পত্রিকায় দেখলাম বন্যা নিয়ন্ত্রণে কী করতে হবে এমন প্রশ্নের উত্তরে অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত মনে করেন, নিয়ন্ত্রণ নয়, ব্যবস্থাপনায় মনোযোগ দিতে হবে। যেখানে জলাবদ্ধতার আশঙ্কা আছে সেখানে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। বেড়িবাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে ষাট বা সত্তরের দশকের মতো করে ভাবলে হবে না। বাঁধের অবকাঠামো নিয়ে ৫০ বা ১০০ বছরের জন্য পরিকল্পনা করতে হবে। বাঁধের নির্মাণ প্রকৌশল বদলাতে হবে। প্রয়োজনে মাটির বাঁধের পরিবর্তে কংক্রিটের দেয়াল নির্মাণ করতে হবে। বাংলাদেশে অঞ্চলভেদে বন্যার বিভিন্ন ধরন ও বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। তাই স্থান, কাল ও অঞ্চলভেদে বন্যানিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনায় ভিন্ন ভিন্ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। একে সামাজিক বিজ্ঞানের ভাষায় বলা যায় ‘Network management theory’। শুধু ত্রাণসহায়তা ও পুরোনো পরিকল্পনা বন্যা নিয়ন্ত্রণে খুব গৌণ ভূমিকা রাখবে। সাম্প্রতিক সময়ে ত্রাণসহায়তাকে কেন্দ্র করে চুরি, অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অব্যবস্থাপনা কারো অজানা নয়। আমাদের উচিত যুগোপযোগী ও টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণ করা। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ অসংখ্য নদনদীর অব্যাহত ভাঙন থেকে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা ও অস্তিত্ব রক্ষার বিষয়টিও জরুরি। আরেকটি বিষয় না বললেই নয়, দুর্যোগসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ বন্যার সময় ও পরবর্তী সময়ে স্বল্পমেয়াদি কিছু উদ্যোগ নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়। আবার বন্যা প্রকোপ শেষ হয়ে গেলে সরকার, সুশীলসমাজ, গণমাধ্যম ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো অন্য দিকে মনোযোগ দিলে বন্যা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি কোথায় যেন হারিয়ে যায়।
একবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশের জন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সাধারণত বন্যায় গ্রামীণ জনপদে দারিদ্র্য আরো বেড়ে খাদ্যসংকট দেখা দেয়, কর্মসংস্থানের অভাব দেখা দেয়, জীবিকা থাকে না; রাস্তাঘাট, গাছপালা, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, কৃষিজমি, ফসল, যোগাযোগ ব্যবস্থা, ঘরবাড়ি, আবাসভূমি খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুর্যোগ পূর্বকালীন ও দুর্যোগ পরবর্তীকালীন প্রস্তুতি সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে সামাজিক শক্তি, সরকারি সংস্থাগুলোর পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিপর্যায়ের উদ্যোগকে সঙ্গে নিয়ে এগোতে হবে।
n লেখক:শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়