বাস্তবতার নিরিখে দ্রুত সংস্কারের তাগিদ ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের
ইত্তেফাক রিপোর্ট
করোনা-পরবর্তী স্থানীয় ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় নতুন মেরুকরণের ফলে সমস্যার পাশাপাশি নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হবে। এই সময়ে অনেকেই চীনের বিকল্প হিসেবে ভালো বিনিয়োগের গন্তব্য খুঁজবে। এতে ভালো সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশের। কিন্তু বিদ্যমান ব্যবস্থায় প্রত্যাশিত বিদেশি বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা কম। স্থানীয় পর্যায়ে বেসরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ ধরতে দ্রুত ও কার্যকরভাবে বিভিন্ন নীতিকাঠামোয় সংস্কার আনতে হবে। গতকাল শনিবার ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের সমন্বয়ে গঠিত প্ল্যাটফর্ম রিসারজেন্ট বাংলাদেশ আয়োজিত ‘রিসারজেন্ট সংলাপে’ বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (ডিসিসিআই) সভাপতি শামস মাহমুদের সঞ্চালনায় এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। ‘কোভিড-১৯ সময়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য : বাংলাদেশে এর প্রভাব এবং উত্তরণ’ শীর্ষক ঐ সংলাপে ব্যবসায়ী নেতা ও অর্থনীতিবিদরা বিদ্যমান নীতিকাঠামোর দুর্বলতা তুলে ধরার পাশাপাশি এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় তুলে ধরেন। আলোচনায় অংশ নিয়ে ব্যবসায়ী নেতারা আমদানি-রপ্তানি সময় ও ব্যয় অপেক্ষাকৃত বেশি হওয়া, ব্যবসায়ে উচ্চ ব্যয়, কর নীতি ব্যবসাবান্ধব না হওয়া এবং ঘন ঘন পরিবর্তন হওয়া, আমদানি-রপ্তানির অর্থ পরিশোধ কিংবা প্রাপ্তিতে এলসি ও টিটির বাইরে অন্য সুবিধা না থাকা, গার্মেন্টস খাতের বাইরে অন্যান্য রপ্তানিমুখী খাতকে কিছু সুবিধা থেকে বঞ্চিত রাখার মতো চ্যালেঞ্জ উঠে এসেছে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি ব্যারিস্টার নিহাদ কবীর দীর্ঘসময় ধরে বিভিন্ন নীতিমালার সংস্কার ইস্যুতে কথা হলেও কার্যকর ফল না আসায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন। আমদানি-রপ্তানি পর্যায়ে বন্দরে শুল্ক স্টেশনে স্বয়ংক্রিয় মূল্যায়ন ব্যবস্থা এসাইকুডার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, এই ইস্যুতে বছরের পর বছর ধরে কত কথা হলো। অথচ এখনো পুরো কাজ হয়নি।
অ্যাপেক্স গ্রুপের প্রধান সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর সম্প্রতি বাজেটে কোম্পানির প্রমোশনাল ব্যয়ে আয়কর বিভাগ কর্তৃক রাশ টানা সম্পর্কিত একটি পরিবর্তনের উদাহরণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে চাহিদা বাড়ানো দরকার। এজন্য বিপণন কার্যক্রমে ব্যয় বাড়াতে হবে। অথচ এটি সোয়া এক শতাংশ থেকে কমিয়ে দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে চাহিদা বাড়ানোর চেয়ে কমিয়ে দেওয়ার কাজ করা হলো। দেশের স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনার ফলে আমাদের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ড. এম মাশরুর রিয়াজ আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়ে ব্যয় ও সময় বেশি হওয়ার বিষয়ে একটি উদাহরণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের রপ্তানিতে গড়ে ৩১৫ ঘণ্টা সময় লাগে। যেখাবে ভিয়েতনামের প্রয়োজন হয় ১১০ ঘণ্টা, ভারতের ১৬৪ ঘণ্টা আর কম্বোডিয়ার ১৮০ ঘণ্টা। অন্যদিকে রপ্তানি চালান পাঠানোর ক্ষেত্রে যেখানে বাংলাদেশে গড়ে খরচ ৬৩৮ ডলার, আর কম্বোডিয়ার ৪৭৫ ডলার এবং ভিয়েতনামের ৪২৯ ডলার। তিনি বলেন, বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা গার্মেন্টসের বাইরে অন্যান্য রপ্তানি খাত তেমন পায় না। রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) ক্ষেত্রেও বৈষম্য রয়েছে।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না যদি স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা না আসেন। তোফায়েল আহমেদ চীনের বাজারে বাংলাদেশের ৮ হাজার ২৬৫টি পণ্যের শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা কাজে লাগানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে প্রায় ২৫০ কোটি ডলারের অতিরিক্ত রপ্তানি আয় অর্জন করা সম্ভব হবে। এ সময় তিনি রপ্তানি ও ব্যবসায়ের উন্নয়নে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরেন।
এ সময় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বিজনেস ইনিশিয়েটিভ ফর লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) চেয়ারপার্সন আবুল কাসেম খান, পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জায়েদী সাত্তার, এনার্জিপ্যাক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন রশিদ, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহীম প্রমুখ।