রোহিঙ্গা শরণার্থীরা যখন দলে দলে বাংলাদেশে প্রবেশ করছিল, তখন রাজিয়া সুলতানা নিজেকে আবিষ্কার করলেন মহামারি আকারে যৌন সহিংসতা ও নিপীড়নের শিকার হওয়া নারীদের সামনে। সংখ্যালঘু মুসলিমদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে দীর্ঘদিন ধরে অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। এর মধ্যে ২০১৬ ও ২০১৭ সালে তাদের সেনাদের দমন-পীড়ন ছিল সবচেয়ে আগ্রাসি। প্রাণ বাঁচাতে সে সময় ৭ লাখ ৭০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আশ্রয় নেয় বাংলাদেশে। সাধের ঘরবাড়ি, জমিজমা ছেড়ে আসা এসব রোহিঙ্গাদের আবাসস্থল এখন উখিয়াসহ কক্সবাজারের বেশ কয়েকটি স্থান। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর যা ঘটেছে তা গণহত্যার শামিল বলে মনে করছে জাতিসংঘের তদন্তকারীরা। মিয়ানমার সেনাদের হাতে সবচেয়ে বেশি অত্যাচার-নিপীড়নের শিকার হয়েছেন রোহিঙ্গা নারী ও তরুণীরা। ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটেছে অসংখ্য। তাদের রোমহর্ষক আখ্যান বিভিন্ন মাধ্যমে তুলে ধরার মধ্যেই নিজের কাজের ক্ষেত্র খুঁজে নেন রাজিয়া সুলতানা। বাংলাদেশে বেড়ে ওঠা রাজিয়ার জন্ম মিয়ানমারের মংডুতে হওয়ায় রোহিঙ্গাদের ভাষা-ভাব ভালো করেই জানা তার। এখন কাজ করেছেন রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের শিক্ষক, কাম্পেইনার ও দোভাষী হিসেবে।
মিয়ানমার আর্মির যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের শিকার শত শত নারীর সাক্ষাত্কার নেওয়া রাজিয়া প্রতিষ্ঠা করেছেন রোহিঙ্গা উইমেন্স ওয়েলফেয়ার সোসাইটি নামে একটি প্রতিষ্ঠান। যৌন নিপীড়নের শিকার রোহিঙ্গা নারীদের কাউন্সেলিং করেন। গৃহনির্যাতন, বাল্যবিবাহ ও স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়েও কাজ করেন তার এই সংস্থা। এছাড়া রোহিঙ্গা অধিকার নিশ্চিতে নানা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন রাজিয়া। কাজের স্বীকৃতিও পেয়েছেন রাজিয়া। রোহিঙ্গা নারীদের দুর্দশা তুলে ধরেছেন জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলে। গত ৭ মার্চ তাকে ‘ইন্টারন্যাশনাল উইমেন অবকারেজ অ্যাওয়ার্ডে’ ভূষিত করে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। ওয়াশিংটন ডিসিতে রাজিয়ার হাতে পুরস্কার তুলে দেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। পুরস্কার গ্রহণের পর রোহিঙ্গা নারীদের নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা রাজিয়া তুলে ধরেন টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে।
কীভাবে রোহিঙ্গা নারী নিপীড়নের কাজে সম্পৃক্ত হওয়া? এমন প্রশ্নে রাজিয়ার জবাব, ‘তাদের সহায়তায় আমাকে এগিয়ে আসতেই হতো। ধর্ষিত ও নিপীড়িত হওয়ার অভিজ্ঞতা এবং কীভাবে প্রিয়জনকে চোখের সামনে মারা হয়েছে সেসব অভিজ্ঞতা তারা আমার কাছে শেয়ার করত। কারণ এসব পুরুষদের কাছে বলাতে তারা স্বস্তি বোধ করত না।’ ধর্ষিত হওয়ার ঘটনা আলোচনায় আসুক, রোহিঙ্গা নারীরা কি তা চাইতো? রাজিয়া বলেন, কেন তারা এসব লুকাবে? কেউ কেউ সাহসী। তবে কেউ নীরব থাকে। এটা আমার জন্যও কঠিন ছিল। কয়েকটি সাক্ষাত্কার নেওয়ার পর আমি দুঃস্বপ্ন দেখতাম। মাঝেমধ্যে আমি শুধুই কাঁদতাম আর কাঁদতাম। জানতাম না কেন কাঁদতাম। মন খুব খারাপ লাগলে মাঝেমধ্যে আমি কক্সবাজারে যেতাম। আমি আমার ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করতাম। তিনি আমাকে বলতেন, ‘তুমি কী তাদের নিয়ে কাজ করতে চাও?’ আমি বলতাম, ‘আমি আমার সম্প্রদায়কে সাহায্য করতে চাই।’ তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে, সেক্ষেত্রে তোমাকে অবশ্যই শক্ত হতে হবে’।
রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্ষিত ও নিপীড়িত হওয়ার মতো ঘটনাগুলো খোলাখুলিভাবে আলোচিত হয় কি না— এ ব্যাপারে রাজিয়া জানান, তারা লজ্জায় এসব বলতে চায় না। ভুক্তভোগী নারীরা তাদের পরিবারের মানসম্মানের ভয়েও অনেক সময় বলতে চায় না। এমনকি তারা ডাক্তারের কাছে যাওয়াটাও ভয় পায়। কিছু স্বামী ও পরিবার ভালো হলেও অধিকাংশ ধর্ষিত নারীর ঠাঁই হয় না পরিবারে। অবিবাহিত ধর্ষিত তরুণীদের তারা গ্রহণ করতে চায় না। এই ভয়ে প্রথমে কেউ কেউ মুখ খুলে না। প্রায় তারা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে যায়। আমরা ডাস্টবিনে পাঁচ-ছয়টা নবজাতক পেয়েছি।
রাজিয়ার মতে, রোহিঙ্গাদের মতো জাতিগোষ্ঠী নারীদের ধর্ষণ করা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পুরাতন একটি কৌশল। তারা প্রথমে নারীদের টার্গেট করে। এরপর মানুষজন পালিয়ে যায়। ধর্ষণের মাধ্যমে ভয় সৃষ্টি করা একটি পুরাতন কৌশল। মানুষজন দেখে তাদের মেয়েদের সেনাবাহিনী তুলে নিয়ে যাচ্ছে। তাই তারা ভাবে, ‘আমাদের বাড়িতে থাকার দরকার নেই। আমাদের মেয়েদের বাঁচাতে হবে; পরিবারের সম্মান রক্ষা করতে হবে’। তাই তারা বাড়ি, জমিজমা ফেলে চলে যায়। দেশ ছেড়ে চলে যায়।
ধর্ষণের মতো ঘটনাগুলো মিয়ানমারের সেনারা দলবেঁধে করে বলে জানালেন রাজিয়া। এটা একটি দলীয় প্রচেষ্টা। তারা তরুণী ও তুলনামূলক বয়স্ক নারীদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করায় এবং ধর্ষণ করে। ...আমি ১৪ বছর বয়সি এক তরুণীর দেখা পেয়েছিলাম। তাকে ৩০ জনের বেশি সৈন্য ধর্ষণ করেছে।
ধর্ষণকে বিশ্বের আরো অনেক জায়গায় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে মনে করেন রাজিয়া। কেবল মিয়ানমার নয়, শ্রীলঙ্কা, বসনিয়া, ঘানা ও পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায় যেখানে ধর্ষণ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে—সব জায়গার জন্যই আমি কাজ করে যাচ্ছি। আমরা এর বিচার চাই।