জাতিসংঘ মিশনের ওপর অনিশ্চয়তার ছায়া

এম এ আলআমিন

 

সুদানে শান্তি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতিসংঘের একটি নতুন মিশন শুরুতেই হোঁচট খেয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের প্রভাবশালী সদস্যদের মধ্যে মতানৈক্য এই ব্যর্থতার কারণ। এই বিরোধের এক পক্ষে ছিল ফ্রান্স অন্যদিকে রাশিয়া ও চীন।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস জুনের শুরুতে নবগঠিত ইউনাইটেড নেশন্স ইন্টেগ্রেটেড ট্রানজিশন অ্যাসিস্টেন্স মিশন ইন সুদান মিশনের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য দুই জনের নাম প্রস্তাব করেন। মিশনটির লক্ষ্য ছিল সংঘাতকবলিত দেশটিতে পর্যায়ক্রমে গণতন্ত্রে উত্তরণ প্রক্রিয়াকে সহযোগিতা করা। গুতেরেস যাদের নাম প্রস্তাব করেন তাদের একজন দক্ষিণ আফ্রিকার নিকোলাস হেইসম, তার জাতিসংঘ মিশনে বিরোধ নিরসনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি আফগানিস্তান ও সোমালিয়ায় জাতিসংঘ মিশনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তবে সুদানের প্রধানমন্ত্রী আবাদালা হামদোক জুনের প্রথমদিকেই এ প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন। দ্বিতীয় যার নাম প্রস্তাব করা হয় তিনি ফ্রান্সের জ্যঁ ক্রিস্টোফি বেলিয়ার্দ। তিনি ইউরোপিয়ান এক্সটারনাল অ্যাকশন সার্ভিসের ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেছেন। তার ব্যাপারে আপত্তি তোলে চীন ও রাশিয়া। এই দেশ দুটির বক্তব্য বেলিয়ার্দ সুদানের সেনাবাহিনীর সমর্থন তিনি পাবেন না। এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মকর্তা নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচটি স্থায়ী সদস্যের মধ্যে গোপনে কতটা রাজনৈতিক দর কষাকষি চলে।

গত তিন বছরে দেখা গেছে স্বাগতিক দেশ অথবা বৃহত্ শক্তিগুলোর পছন্দে জাতিসংঘ মিশনগুলোর প্রধান নিয়োগ পেয়েছেন। মিশন প্রধানরা সাধারণত স্পেশাল রিপ্রেজেনটিভ অব সেক্রেটারি জেনারেল (এসআরজিএস) নামে পরিচিতি পান। এক্ষেত্রে জাতিসংঘের প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ প্রক্রিয়াটি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। বিষয়টি জাতিসংঘের ভেতরে উদ্বেগ তৈরি করছে। সিলেকশন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িতরা দেখতে পাচ্ছেন মহাসচিবের পছন্দ অপছন্দকে তোয়াক্কা করছে না বৃহত্ শক্তিগুলো। ২০১৭ সালের ফ্রেব্রুয়ারিতে গুতেরেস সাবেক ফিলিস্তিনি প্রধানমন্ত্রী সালাম ফায়েদকে জাতিসংঘের লিবিয়া মিশনে তার বিশেষ দূত মনোনীত করেন। যুক্তরাষ্ট্র তখন এর বিরোধিতা করেছিল। জাতিসংঘে নিযুক্ত তত্কালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালি বলেন, যে সংস্থার কোনো সিনিয়র পদের জন্য ফিলিস্তিনি নাগরিকদের বিবেচনা করা যায় না। মূলত ওয়াশিংটনের আপত্তির মুখে ভেস্তে গিয়েছিল গুতেরেসের ঐ মনোনয়ন। এরপর ঐ পদে নিয়োগ পান লেবাননের সাবেক সংস্কৃতি মন্ত্রী গাসান সালাম। তিনি ঐ বছর ২২ জুন ইউনাইটেড ন্যাশনস সাপোর্ট মিশন ইন লিবিয়ার (ইউএনএসএমআইএল) দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং চলতি বছর ২ মার্চ ঐ পদ থেকে ইস্তফা দেন। যদিও স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে তিনি পদত্যাগ করেছেন তবে ধারণা করা হয় যে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তার এই প্রস্থানের নেপথ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আছে। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, লিবিয়া মিশনের কাজের দায়-দায়িত্ব দুটো পৃথক অংশে ভাগ করা প্রয়োজন। একটি অংশ লিবিয়ায় জাতিসংঘ মিশন তত্ত্বাবধান করবে, অপর অংশটি বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে শান্তি প্রচেষ্টা চালাবে। দুই অংশের নেতৃত্বে থাকবেন দুই জন সিনিয়র কর্মকর্তা। যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাব করলেও বিষয়টি নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনা শুরু করেনি।

চলতি বছর এপ্রিলে জাতিসংঘ মিশনে দুই জন আফ্রিকান পদপ্রার্থীর নিয়োগ আটকে দেয়। এরা হচ্ছেন—আলজেরিয়ার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী রামতানে লামামরা এবং ঘানার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী টেটেচ। এদের মধ্যে লামামরার সালামের উত্তরসূরী হওয়ার কথা ছিল। কেবল আফ্রিকার নয়, জাতিসংঘ সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় প্রতিনিধিদের পথে বিভিন্ন সময় প্রতিবন্ধকতা আরোপ করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি হলো জাতিসংঘ মিশনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে তাদের লোক থাকবে। একই রকম উচ্চাশা ফ্রান্সেরও। তারা চায় ফরাসি ভাষায় কথা বলে এমন কোনো আফ্রিকান দেশ থেকে ঐ সমস্ত পদে নিয়োগ দেওয়া হোক। পর্যবেক্ষকদের মতে, বৈশ্বিক জোটটির মিশনগুলোতে প্রতিনিধি পাঠানো নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য দেশের মধ্যে সুক্ষ্ম দড়ি টানাটানি আগে থেকেই ছিল। কিন্তু গুতেরেস মহাসচিবের দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে।

বৃহত্ শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে তিনি অন্যান্য দেশ এই পদগুলোর পূরণের উদ্যোগ নেন। দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দুই বছরের মধ্যে তিনি প্রতিযোগিতামূলক বাছাই নীতি অনুসারেই শীর্ষ দূতদের প্রায় অর্ধেকের নিয়োগ দিয়েছেন। বাকি যাদের নিয়োগ দিয়েছেন তাদের অনেকের ব্যাপারে বৃহত্ শক্তিগুলো আপত্তি জানিয়েছে। সুদান সাবেক ব্রিটিশ উপনিবেশ, ফ্রান্স সেখানে নিজের প্রভাব বলয় বিস্তার করতে চাইছে। এতে বাধ সেধেছে রাশিয়া। দেশটিতে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে বেসামরিক প্রশাসনের যেমন দ্বন্দ্ব রয়েছে, তেমনি জাতিসংঘ মিশন নিয়ে প্রভাবশালী দেশগুলো প্রকাশ্যে বিরোধে জড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন এর ফলে দেশটিতে গণতন্ত্রে উত্তরণ প্রক্রিয়া যেমন বাধাগ্রস্ত হতে পারে তেমনি অনিশ্চয়তার ছায়া পড়তে পারে অন্যান্য দেশে দায়িত্বরত মিশনগুলোর ওপরও।