যুক্তরাষ্ট্র-চীনের মধ্যে নতুন স্নায়ুযুদ্ধ

মো. হযরত আলী

করোনা ভাইরাস ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে পৃথিবী আজ সংকটাপন্ন। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলতে থাকা রাজনৈতিক ও নানাবিধ টানাপোড়েন ইতিমধ্যেই প্রকট আকার ধারণ করে গড়িয়েছে শীতল যুদ্ধে। ইতিপূর্বে পৃথিবী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রসহ এবং তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমান রাশিয়া) মধ্যে শীতল যুদ্ধ দেখেছে। ১৯৪০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ৮০র দশক পর্যন্ত যার ব্যাপ্তিকাল ছিল। গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক মতবাদ নিয়ে বিভক্ত হয়েছিল তখনকার বিশ্বের দুই পরাশক্তি। মূলত তাদের লক্ষ্য ছিল একক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন। বর্তমান বিশ্বের দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে একই আইডিওলজির ওপর ভিত্তি করে দানা বেঁধেছে শীতল যুদ্ধ বা স্নায়ুযুদ্ধ। বিশ্ব রাজনীতিতেও তা খুব দ্রুতই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। কারণ দুই দেশই বর্তমান বিশ্বের অর্থনীতির বৃহত্ শক্তি। চীনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য বিস্তারের জাল বুঝতে পেরে ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ১৯৭১ সালে তত্কালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের করা কৌশলগত বন্ধুত্ব চুক্তির তোয়াক্কা না করে চীনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চীন কৌশলগতভাবে এগিয়েছে তার লক্ষ্যের দিকে। সাফল্যের জন্য যা যা দরকার, তার সবকিছুই চীন করছে। ১৯৪৫ সালের পর ইউএস মার্শাল প্ল্যান নামের যে অর্থব্যবস্থা চালু হয়েছিল, সেই মার্কিন নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার জায়গায় নিজের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা স্থাপন করার উদ্দেশে চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) নামের একটি আন্তর্জাতীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রকল্প শুরু করেছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসাবে নিজের রেনমিনবিকে চালানোর জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফকে চাপ দিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া চীন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্বে আসতে চাচ্ছে। সে বর্তমানে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে আছে। দেশটি বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফে তার কণ্ঠ উচ্চকিত করার জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কোথাও বাধাগ্রস্ত হলে দেশটি নিজের মতো করে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক এবং নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মতো নিজস্ব কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে। করোনায় যখন নাকাল যুক্তরাষ্ট্র, তখন কোভিড-সংক্রমিত দেশগুলোকে চীন ফেস মাস্ক, টেস্টিং কিট, সুরক্ষা সরঞ্জাম, ভেন্টিলেটর—এসব স্বাস্থ্য উপকরণ সরবরাহ করেছে। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের টিম পাঠিয়েছে।

অন্য দিকে, ২৫ বছরের কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় দ্বারপ্রান্তে চলে গেছে ইরান আর চীন, এমন খবর পাওয়া গেছে। নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যে এই অংশীদারিত্বের, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সামরিক সহযোগিতা এবং সম্ভবত চীনা সামরিক ঘাঁটি থাকবে। কৌশলগত অংশীদারিত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে দুই দেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা। এর মধ্যে রয়েছে অস্ত্র উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্যবিনিময়। চীনকে নিজের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতেও দেবে ইরান। যা চীনকে মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য বিস্তারের প্রবল সুযোগ করে দিবে। মহাকাশে বিশ্ব নেতৃত্ব দেওয়া এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা জাহিরের চেষ্টায় চীন যুক্তরাষ্ট্রের মঙ্গল অভিযানের মতোই তাদের প্রথম এই স্বাধীন ‘তিয়ানওয়েন-১’  মিশন শুরু করেছে।

বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র তার আধিপত্য ধরে রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রথমেই আঘাত করেছে অর্থনীতিতে। ২০১৯-এর শুরু থেকে এ পর্যন্ত বাণিজ্যযুদ্ধে চীনের ক্ষতি প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার। চীনও নিয়েছে পালটা পদক্ষেপ। চীনের মতো বিপুল না হলেও যুক্তরাষ্ট্রেরও ক্ষতি কম নয়। এই বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে গত বছর বিশ্ব জিডিপির দশমিক ৫ ভাগ ক্ষয় হয়েছে। ভবিষ্যতে এটা আরো বাড়বে। ইতিপূর্বে রাশিয়া ও আমেরিকার শীতল যুদ্ধে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল উভয় দেশের পুরো বাণিজ্যের মাত্র ১ শতাংশ। ফলে ইতিহাসের সেই ঠান্ডাযুদ্ধে বিশ্ববাণিজ্য নিরাপদই ছিল। কিন্তু বেইজিং-ওয়াশিংটন দ্বন্দ্বের শুরুই হয়েছে অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির মধ্য দিয়ে। অথচ উভয়ে তারা বিশ্ব-পুঁজিতন্ত্রের দুই প্রধান স্তম্ভ। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের মধ্যে বাণিজ্যের অঙ্ক ছিল ৭৩৭ বিলিয়ন ডলার। একই বছর চীনে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ ছিল ১১৭ বিলিয়ন ডলার। এসব কিছুই এখন হুমকিতে।

তবে আক্রমণ এক ফ্রন্টে সীমিত রাখতে চাইছেন না ট্রাম্প। প্রতিপক্ষকে সব উপায়ে কোয়ারেন্টাইন করতে চান তিনি। চীনের চারদিকে একের পর এক যুদ্ধজাহাজ পাঠানো হচ্ছে। দমে নেই চীনও। নিজেদের চারদিকে টহলে নেমেছে রণতরির ঝাঁক। উভয়ের মিসাইলের ব্যবধান ক্রমে কমছে। চীনের শিপইয়ার্ডগুলো প্রথমবারের মতো চীনের নৌবাহিনীর জন্য টাইপ ০৭৫ নামের দুটি উভচর যুদ্ধজাহাজ বানিয়েছে। এটি জল ও স্থল উভয় থেকেই হামলা চালাতে সক্ষম।

ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাবকে পাশে নিয়ে সাংবাদিকদের পম্পেও চীনের বিরুদ্ধে জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের হিউস্টনে চীনের কনস্যুলেট ৭২ ঘণ্টার (শুক্রবার) মধ্যে বন্ধের নির্দেশ দেয় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। চীনও পালটা জবাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের—এই ঘোষণার পর বদলা হিসেবে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় চেংদু শহরে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেট বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে বেইজিং।

সম্পূর্ণ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। সমানে সমানভাবে পালটাপালটি সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। যদিও চীন একটু বেশি চাপে রয়েছে। তার পরও এখনো পর্যন্ত মোটামুটি ভারসাম্য অবস্থা বিরাজ করছে। এখনি বলা যাচ্ছে না এই স্নায়ুযুদ্ধে জয়ী কে হবে। আগামীর সময়ই বলে দিবে কে এই স্নায়ুযুদ্ধে জয়ী হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়