যুক্তরাষ্ট্রে এখন দুইজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। একজন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং অপরজন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের নতুন স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি। বৃহস্পতিবার পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নেন ডেমোক্র্যাটরা। আর পেলোসিকে দলের পক্ষ থেকে স্পিকার বানানো হয়। দেশটিতে এই দুই নেতার মধ্যে এখন ক্ষমতার লড়াই চলবে। এতদিন প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন রিপাবলিকানরা। ফলে যে কোনো বিল পাস করতে ডেমোক্র্যাটদের কাছে খুব বেশি ধরনা দিতে হয়নি। কিন্তু সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে। নির্বাহী আদেশ ছাড়া প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ন্যান্সি পেলোসিকে
এড়িয়ে কোনো বিল পাস করতে পারবেন না। আবার পেলোসিও কেবল প্রতিনিধি পরিষদে বিল পাস করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করতে পারবেন না। কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে।
ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে গেছে
বৃহস্পতিবারই অচলাবস্থা কাটাতে প্রতিনিধি পরিষদে একটি বিল পাস করেন ডেমোক্র্যাটরা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চাওয়া অর্থ বরাদ্দ না রেখেই বিলটি পাস হয়েছে। এতে সীমান্তে বেড়া নির্মাণের জন্য এক দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার এবং অন্যান্য সীমান্ত নিরাপত্তা (ক্যামেরা এবং বিভিন্ন প্রযুক্তি) বিষয়ে ৩০০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মেক্সিকো সীমান্তে বেড়া নির্মাণ করতে ৫০০ কোটি ডলার দাবি করেছিলেন। এর আগে রিপাবলিকানপন্থি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ডেমোক্র্যাটদের প্রতি এই অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে শপথ নেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই ন্যান্সি পেলোসি বলেন, আমরা মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের জন্য কিছু করছি না। তিনি বলেন, এর সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। এটা অনৈতিক এবং পুরানো চিন্তা। এটা ফলপ্রসূও হবে না। বিলটি পাস হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, সিনেটে পাস হলেও তিনি বিলটিতে স্বাক্ষর করবেন না।
মার্কিন সরকারের অচলাবস্থা কাটাতে শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেন কংগ্রেস নেতারা। এদের মধ্যে ন্যান্সি পেলোসিও ছিলেন। সেই বৈঠকে তাদের মধ্যকার মতবিরোধ রয়েই গেছে। কেউ কাউকে ছাড় দেননি। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে কংগ্রেস নেতাদের বৈঠকে কোনো সমাধান হয়নি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ডেমোক্র্যাটদের বিলে সমর্থন দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এছাড়া রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠ সিনেটেও বিলটি পাস হচ্ছে না। সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা মিচ ম্যাককোনেল বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমর্থন ছাড়া তারা কোনো বিলে সমর্থন দেবেন না। ৮ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী এই অচলাবস্থার শিকার হচ্ছেন। গত ২২ ডিসেম্বর থেকে তাদের বেতন ভাতা বন্ধ আছে।
অনেক ক্ষেত্র আছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং ন্যান্সি পেলোসির মধ্যে বিরোধ অব্যাহত থাকবে। কারণ ট্রাম্প গত দুই বছর কীভাবে প্রশাসন চালিয়েছেন তার দিকে নজর দেবেন পেলোসি। তিনি অনেক বিষয়ে তদন্তের চেষ্টা করতে পারেন। তিনি ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিকে কষ্টকর করে তুলতে পারেন। তারা রাজনৈতিক এবং মানসিকভাবে একে অপরের বিরোধী। পেলোসি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অপসারণের প্রস্তাব আনতে পারেন। তিনি স্পেশাল কাউন্সেল রবার্ট মুলারকে এক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারেন। মুলার যদি এমন কোনো রিপোর্ট দেন যাতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিপদে পড়তে পারেন। পেলোসি সেই রিপোর্টকেই ব্যবহার করতে পারেন। যদিও ন্যান্সি পেলোসি এর আগে ট্রাম্পকে অপসারণের উদ্যোগ নেবেন না বলে জানিয়ে ছিলেন।
ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট পেলোসি মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে জাগিয়ে তুলতে পারেন, জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যু, অবৈধ অভিবাসীদের শিশুদের সুরক্ষা, লিঙ্গ সমতা নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সরব হতে পারেন। মেক্সিকো সীমান্ত দেয়াল নির্মাণ ইস্যু হচ্ছে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে পেলোসির তোপ।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও তার রাজনৈতিক শত্রু পেলোসিকে মোকাবিলা করার উপায় খুঁজছেন। তিনিও হুমকি দিয়েছেন, অচলাবস্থা কাটাতে তিনি কোনো পদক্ষেপ নেবেন না। বরং এটিকে চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা তার হাতে আছে। দেয়াল নির্মাণে অর্থ বরাদ্দ না দিলে তিনি মাস কিংবা বছর পর্যন্ত শাটডাউন চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, প্রতিনিধি পরিষদে জয় ডেমোক্র্যাটরাই উদযাপন করবেন। দেয়াল নির্মাণে অর্থ বরাদ্দ দিলে সেই জয়ের ভাগিদার হবেন ট্রাম্প। পেলোসি সেই সুযোগ দিতে চাইছেন না। ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হারার দুঃখ তারা এই জয় দিয়ে ভুলতে চান।
দু্’জনের মিল খুব বেশি নেই
ট্রাম্প এবং পেলোসির মধ্যে মিল খুব একটা বেশি আছে বলে মনে হয় না। ফলে তারা খুব দ্রুত একটা সমাধানে যেতে পারবেন বলে বিশ্বাস করছেন না অনেকেই। পেলোসি একজন রাজনীতিক যিনি অল্প বয়স থেকেই পারিবারিক ব্যবসা দেখে আসছেন। ট্রাম্প নির্বাচনে জয় পেলেও তার রাজনৈতিক কোনো অভিজ্ঞতা নেই। দ্বিতীয়বারের মতো স্পিকার হয়েছেন ন্যান্সি পেলোসি, যদিও তরুণ কংগ্রেসম্যানদের মধ্যে এত বেশি বয়সে তাকে দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে সমালোচনা ছিল। ফলে শেষ বয়সে তাকে ওয়াশিংটনের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় দক্ষতা দেখাতে হবে। প্রথমবার দায়িত্ব পালনের সময় ওবামাকেয়ারকে আইনে পরিণত করার ব্যাপারে পেলোসি সফলতা দেখিয়ে ছিলেন। অন্যদিকে ট্রাম্প আইনগতভাবে এবং রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠদের সমর্থন পেলেও তিনি কোন সময় কী করে বা বলে বসেন তা বোঝা মুশকিল। ট্রাম্পের সঙ্গে পেলোসি লড়াই চললে তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। অন্তত যাদের জর্জ ডাব্লিউ বুশের সময় ইরাক যুদ্ধের তহবিল নিয়ে পেলোসির বাধা দানের কথা স্মরণে আছে। তবে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থাকলেও বুশ ও পেলোসির মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক খুবই ভালো ছিল। গত মাসে বুশের বাবা সিনিয়র বুশের মৃত্যুর সময় তাকে জড়িয়ে ধরে নিজের কষ্ট প্রকাশ করেছিলেন পেলোসি। ট্রাম্প পেলোসির জয়ে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন ঠিকই। তবে বুশের মতো তার ব্যক্তিত্ব স্থির নয়।