খাশোগি হত্যাকাণ্ড

ন্যায়বিচারে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি

 

সৌদি সরকারের কড়া সমালোচক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডের তিন মাস পেরিয়েছে। এই হত্যাকাণ্ড বিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই হত্যাকাণ্ডে সৌদি আরবে বাক-স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা কর্মীদের একটি শঙ্কাজনক চিত্র উঠে এসেছে।

সাবেক স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদের সনদ নিতে গত ২ অক্টোবর তুরস্কের ইস্তাম্বুলস্থ সৌদি কনস্যুলেটে প্রবেশের পর থেকে নিখোঁজ হন খাশোগি। গত ২০ অক্টোবর প্রায় ১৮ দিনের মাথায় সৌদি আরব স্বীকার করেছে যে, কনস্যুলেট ভবনেই খুন হয়েছেন তিনি। তবে প্রথমদিকে সৌদি আরব এই হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকারই করতে চায়নি। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বলেছে, কনুস্যলেটে মারামারির সময় মৃত্যু হয়েছে খাশোগির। এরপর কয়েক দফা তারা এই ঘটনার ব্যাখ্যা বদলে শেষ পর্যন্ত স্বীকার করেছে খাশোগিকে হত্যা করা হয়েছে। সৌদি আরব স্বীকার করলেও খাশোগির মরদেহ এখনো পাওয়া যায়নি। সৌদি আরবের কাছে মরদেহ ফেরত চাওয়া হলেও তারা এ ব্যাপারে কোনো সাড়া মেলেনি। প্রকৃত ঘটনা নিয়ে এখনো অন্ধকারে সবাই।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে যে, সৌদি আরবের ১৫ সদস্যের একটি ‘কিলিং স্কোয়াড’ এই হত্যাকাণ্ড সংগঠিত করেছে। ঘটনার কিছু অডিও রেকর্ডে হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা সম্পর্কে জানা গেছে। খবরে বলা হয়েছে, খাশোগিকে হত্যার পর মরদেহ টুকরো টুকরো করা হয়। এরপর তা এসিডে গলিয়ে ফেলা হয়েছে। তার মরদেহ না পাওয়ায় এই তথ্য অনেকটাই সত্য বলে মনে করা হচ্ছে।

এই হত্যাকাণ্ডের পর পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন পশ্চিমা দেশ। তবে শুরু থেকেই সৌদি আরব এ বিষয়ে তেমন আগ্রহ দেখায়নি! সৌদি সরকার এ ঘটনাটি নিজেদের মতো করে তদন্ত করে ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে। এর মধ্যে পাঁচ জনকে ফাঁসির সাজা দিতে চায় সৌদি কর্তৃপক্ষ। চারজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকেও বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে এ হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতার ব্যাপারে কিছুই বলেনি তারা। যদিও প্রথম থেকেই হত্যার নির্দেশদাতা হিসেবে সবার সন্দেহের শীর্ষে রয়েছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। কারণ যুবরাজই সৌদি আরবের কার্যত সরকার প্রধান। তার নির্দেশ ছাড়া দেশটিতে কোনো কিছুই হয় না।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইপে এরদোয়ানের দাবি খাশোগি হত্যার নির্দেশ সৌদি সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এসেছে। তার এই দাবির সঙ্গে অনেকেই একমত। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র বিশ্বাস খাশোগিকে হত্যার নির্দেশ সৌদি যুবরাজই দিয়েছিলেন। মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, এ রকম একটি হত্যাকাণ্ড ঘটানোর অভিযান কেবল যুবরাজের অনুমতি নিয়েই হতে পারে। তবে সৌদি আরব এ রকম দাবিকে মিথ্যা বলে বর্ণনা করেছে। 

এই হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়াই তড়িঘড়ি করে বিচার শুরু করেছে সৌদি আরব। গত বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে সাংবাদিক খাশোগি হত্যা মামলায় ১১ জনের বিচার

 

শুরু হয়েছে। সরকারি কৌঁসুলিরা সেখানে পাঁচ আসামির মৃত্যুদণ্ড চেয়েছেন। তাদের দাবি শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী কিছু সৌদি এজেন্ট খাশোগিকে হত্যা করেছে। তাকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ইস্তাম্বুলে তাদের পাঠানো হয়েছিল। এই বিচার সম্পর্কে সৌদি সরকারি গণমাধ্যমেও খুব কমই তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এ মামলায় ১১ আসামি কারা, সেই তথ্যও প্রকাশ করা হয়নি।

যে ফৌজদারি আদালতে বিচার চলছে তার প্রথম অধিবেশনে মামলার শুনানি হয়। সেখানে ১১ জন আসামি এবং তাদের আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা অভিযোগপত্রের একটা কপি চেয়েছেন। এটি পর্যালোচনা করার জন্য সময় চেয়ে আবেদন করেছেন তারা। পরবর্তী শুনানির তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি বলে জানা গেছে।

এই বিচার প্রক্রিয়া শুরুর পরপরই আপত্তি জানিয়েছে জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশন বলেছে, খাশোগি হত্যাকাণ্ডের যে বিচার চলছে তার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে এই বিচার ‘যথেষ্ট নয়’ বলে মনে করে তারা। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনের মুখপাত্র রাভিনা শামদাসানি বলেন, তার সংস্থা খাশোগি হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মহলের সংশ্লিষ্টতায় একটি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানাচ্ছি। একইসঙ্গে তিনি অভিযুক্তদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের আবেদনের বিরোধিতা করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেছেন, খাশোগি হত্যাকাণ্ডের বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের ক্ষেত্রে এখনও ঘাটতি রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের আটটি দেশ সফরের অংশ হিসেবে চলতি সপ্তাহে রিয়াদ সফরে যাচ্ছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও। সফরকালে তিনি খাশোগি হত্যাকাণ্ড নিয়ে সৌদি আরবের ওপর চাপ প্রয়োগ করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তড়িঘড়ি করে এই বিচার শুরু করায় সৌদি আরবের উদ্দেশ্য নিয়ে অনেকেই সন্দিহান। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক পরিচালক সামাহ হাদিদ বলেছেন, খাশোগি হত্যকাণ্ডে সৌদি কর্তৃপক্ষের জড়িত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। যথাযথ নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া এ ধরনের বিচার অনেক প্রশ্নের মুখে পড়বে। এজন্য জাতসংঘ নেতৃত্বাধীন একটি স্বাধীন তদন্ত জরুরি। ইতোমধ্যে তুরস্কও বলেছে যে, তারা খাশোগি হত্যকাণ্ড জাতিসংঘে নিতে চায়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোও মনে করে, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত হত্যাকারীদের চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমেই ন্যায় বিচার পেতে পারে খাশোগি’র পরিবার, স্বজন ও বাক-স্বাধীনতার জন্য আন্দোলনরত তার বন্ধুরা।