তিন বছরের বেশি সময় যুদ্ধ চললেও কোনো পক্ষই স্পষ্ট জয়ী হতে পারেনি। এই অবস্থা চলতে থাকলে আগামী দিনগুলোতে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়বে ইয়েমেন। তাই এই মুহূর্তে সেখানে অস্ত্রবিরতি কার্যকর করে স্থিতিশীলতা অর্জন করাটাই ইয়েমেনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আর এই চ্যালেঞ্জে জিততে হলে ইয়েমেনের বিবদমান পক্ষগুলোর পাশাপাশি কার্যকরি ভূমিকা রাখতে হবে জাতিসংঘকে
বিশ্বপ্রবাহ ডেস্ক
ইয়েমেনে অস্ত্রবিরতি কার্যকর হওয়ার পরপরই ভেঙে পড়েছে। ফলে লোহিত সাগরের তীরবর্তী দেশটির একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর দিয়ে ত্রাণ সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। হুদাইদা বন্দরটি ইয়েমেনের অন্যতম প্রবেশদ্বার। এ বন্দর ও হুদাইদা শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হুতি বিদ্রোহী ও সরকারি বাহিনীর মধ্যে সম্প্রতি তীব্র লড়াই চলেছে। শেষ পর্যন্ত সুইডেনে আলোচনা ও দর কষাকষির মধ্য দিয়ে উভয় পক্ষ অস্ত্রবিরতিতে রাজি হয়।
সৌদি নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন বাহিনী বলেছে, তারা রাজধানী সানায় বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত বিমানবন্দর লক্ষ্য করে বিমান আক্রমণ শুরু করেছে। তাদের আক্রমণের মুখে একটি ড্রোন উড়ার জন্য প্রস্তুতিকালে ধ্বংস হয়ে গেছে। সুইডেনে শান্তি আলোচনা শুরুর পর সৌদি বাহিনীর এটিই প্রথম বিমান হামলা। এটি হোদাইদা বন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে ত্রাণ সংস্থাগুলোর উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে ইয়েমেন মানবিক সঙ্কট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রায়ই সেখানকার কঙ্কালসার শিশুদের ছবি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশ পাচ্ছে। ১৮ ডিসেম্বর অস্ত্রবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইয়েমেনে দীর্ঘ দিনের হানাহানির পথ বন্ধ হতে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সবাই আশাবাদী হয়েছিল। এর আগে সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপে অস্ত্রবিরতির ঘোষণা বিলম্বিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল অস্ত্রবিরতির ঘোষণাপত্রে যেন ইরানের ভূমিকা, যেমন- হুতি বিদ্রোহীদের অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করার বিষয়টি উল্লেখ থাকে। যেমন ব্যালিস্টিক মিসাইল ও মনুষ্যবিহীন যুদ্ধ বিমান ব্যবহারের কথা। হুতি বিদ্রোহীরা এগুলো ব্যবহার করেছে। এসব অস্ত্র আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি স্বরূপ।
যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যে তার মিত্ররা হুতিদের কাছে অস্ত্রগুলো সরবারহ করেছে, এই কথা যেন সেখানে উল্লেখ থাকে। কিন্তু রাশিয়া ভেটো দেয়ার হুমকিতে কথাগুলো অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। রাশিয়ার কথা হলো যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো যে সৌদি আরবের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী সে কথার উল্লেখ সেখানে নেই, তাই এতে ইরানের নাম অন্তর্ভুক্ত করলে খসড়া বিবৃতিটি ভারসাম্যহীন হবে। অস্ত্রবিরতির খসড়া প্রস্তাবে যেন তিন বছর ধরে চলা যুদ্ধে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘনের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের বিষয়টি বাদ দেয়া হয়, সেজন্য সৌদি আরব শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা চালায়। উদ্দেশ্য ছিল ইয়েমেনে সৌদি বোমারু বিমানগুলোর পাইলটদের বাঁচানো। তারা বেসামরিক লোকজনের ওপর নির্বিচারে বোমা ফেলেছে। তবে শেষ পর্যন্ত অস্ত্রবিরতি প্রস্তাবে স্বচ্ছ, বিশ্বাসযোগ্য এবং সময়োচিত তদন্তের বিষয়টি রাখা হয়। এসব কারণে স্টকহোম আলোচনায় অচলাবস্থা দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের মধ্যস্থতায় সব পক্ষ একটি অস্ত্রবিরতি মেনে নেয়।
ইয়েমেনের সৌদি সমর্থনপুষ্ট সরকার জাতিসংঘ স্বীকৃতি লাভ করে। অস্ত্রবিরতির সবচেয়ে দুর্বল দিক এটি বিবদমান পক্ষগুলো আলোচনা করে ঠিক করলেও এর সমর্থনে নিরাপত্তা পরিষদে কোনো প্রস্তাব পাস হয়নি। জাতিসংঘের সমর্থন না থাকায় আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের অস্ত্রবিরতি তত্ত্বাবধান করা প্রায় অসম্ভব।
অস্ত্রবিরতি প্রস্তাবে হোদাইদা থেকে দুই পর্যায়ে সৈন্য প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে। বিষয়টি তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পেয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত ডাচ জেনারেল প্যাট্রিক ক্যামার্ট। কিন্তু জাতিসংঘের প্রস্তাব ছাড়া তিনি কার্যত ক্ষমতাহীন। ইয়েমেনের সরকারও বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য তাগাদা দিয়েছে। বলেছে, জাতিসংঘ দ্রুত অস্ত্রবিরতি অনুমোদন না করলে এটি ভেঙে পড়তে পারে, নতুন করে ছড়িয়ে পড়তে পারে সহিংসতা। সরকার ও বিদ্রোহীদের মতঐক্যে অস্ত্রবিরতিটি হয়েছে। উভয় তরফে তিনজন করে প্রতিনিধি ঠিক করা হয়েছে যারা চলতি সপ্তাহে ক্যামার্টের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
জাতিসংঘের ত্রাণ সংস্থাগুলোও অতিসত্বর জাতিসংঘ প্রস্তাব পাস করানোর দাবি জানিয়েছে। তারা পরিস্থিতিতে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। কারণ দুর্বল মতৈক্যে যেকোন সময়ে ভেস্তে যেতে পারে মানবিক ত্রাণ তত্পরতা। পরিস্থিতি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ বলে তারা জানিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিষয়ক যুক্তরাজ্য সরকারের মুখপাত্র এডুইন স্যামুয়েল বলেছেন, ‘আমরা আশা করি, নিরাপত্তা পরিষদে আমাদের সহযোগী ও মিত্ররা ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সহনশীলতার পরিচয় দেবেন।’ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যরা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন।
সৌদি ও মার্কিন আপত্তির কারণে গত মাসে যুক্তরাজ্যের উদ্যোগে অনুরূপ একটি অস্ত্রবিরতির চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্ট ১৯ ডিসেম্বর তার দেশের পার্লামেন্টে বক্তব্য রাখেন। এমপিরা তাকে প্রশ্ন করেন, কোনো পক্ষ যদি অস্ত্রবিরতি লঙ্ঘন করে তবে তার ফল কী হতে পারে। তিনি বলেন, ‘তারা জাতিসংঘের রোষানলে পড়বে’। তিনি স্বীকার করেন, (একদিন আগে) হোদাইদা বন্দর ঘিরে বলবত হওয়া অস্ত্রবিরতির অবস্থা খুবই নাজুক। তবে ইয়েমেনে শান্তি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘সুড়ঙ্গের শেষে আলোর আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ইয়েমেন এতদিন সুড়ঙ্গের ভেতর ছিল।’ এরই মধ্যে অস্ত্রবিরতি ভেঙে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। বিষয়টি নিয়ে ক্যামার্ট চলতি সপ্তাহে জাতিসংঘে রিপোর্ট করবেন। হুতি বিদ্রোহী ও সরকারী বাহিনীর মধ্যে জানুয়ারিতে পুনরায় আলোচনা শুরুর কথা রয়েছে। ওই আলোচনায় দুই পক্ষ একটি জাতীয় সরকার গঠনের কাছাকাছি আসতে পারে।
অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কারণে দেশটি এখন ত্রাণ এবং মানবিক সহায়তা সরবরাহ ও বিতরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যাদের জরুরি ভিত্তিতে ত্রাণ প্রয়োজন তারা খুব সামান্যই সহায়তা পাচ্ছেন। একদিকে সমুদ্র অন্যদিকে আকাশপথে বাণিজ্যিক পণ্যের আমদানি অবরোধ করে সৌদি আরব নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে ভয়াবহ খাদ্য সঙ্কট তৈরি করেছে। বিশেষ করে শিশুদের অবস্থা খুবই করুণ। দেশটিতে অভ্যন্তরীণ উত্পাদন বলতে এখন কিছু নেই। পুরোপুরি বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
ইয়েমেনে সঙ্কটের সূচনা ২০১১ সাল থেকে, যখন প্রেসিডেন্ট আলী আব্দুল্লাহ সালেহর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। সালেহ দুই দশকের বেশি সময় ক্ষমতায় ছিলেন। ২০১২ সালে সরকার ও বিদ্রোহী গ্রুপগুলোর মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী সালেহ ক্ষমতা ছাড়লে তার ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদ রাব্বু মানসুর হাদি সরকার প্রধান হন। এ সময় দেশটি উত্তরে আল কায়েদা সংশ্লিষ্ট জঙ্গি ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের এবং দক্ষিণে শিয়া বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
২০১৫ সালে শিয়া হুতি বিদ্রোহীরা ইয়েমেন দখল করে সানায় নতুন সরকার প্রতিষ্ঠা করে। ওই বছর মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বে বহুজাতিক জোট সেখানে সামরিক হামলা শুরু করে। বাহরাইন, কুয়েত, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত সৌদি আরবের সঙ্গে গলা মিলিয়ে বলে, তাদের লক্ষ্য ইয়েমেনে ‘হুতি আগ্রাসনকে প্রতিরোধ করা’। তিন বছরের বেশি সময় যুদ্ধ চললেও কোনো পক্ষই স্পষ্ট জয়ী হতে পারেনি। এই অবস্থা চলতে থাকলে আগামী দিনগুলোতে আরো ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়বে ইয়েমেন। তাই এই মুহূর্তে সেখানে অস্ত্রবিরতি কার্যকর করে স্থিতিশীলতা অর্জন করাটাই ইয়েমেনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আর এই চ্যালেঞ্জে জিততে হলে ইয়েমেনের বিবদমান পক্ষগুলোর পাশাপাশি কার্যকরী ভূমিকা রাখতে হবে জাতিসংঘকে।