ড. আর এম দেবনাথ
মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। করোনা ভাইরাস-১৯-এর আক্রমণে জনজীবন বিপর্যস্ত। হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে। ২ লাখের ওপর মানুষ এই অচেনা শত্রু দ্বারা আক্রান্ত। মানুষ কর্মহীন। এরই মধ্যে বন্যাকবলিত হচ্ছে জেলার পর জেলা। আবার দুই দিন বাদেই পবিত্র কোরবানির ঈদ। মাঠে আউশ ফসল। এরপরেই শুরু করতে হবে আমনের চাষ। চারদিক থেকে নানা সমস্যা এসে আমাদের জীবন ও জীবিকাকে ক্রমেই অনিশ্চিত করে তুলছে। মানুষের চোখে-মুখে অন্ধকার। দৈনিক ইত্তেফাকের ২০ এবং ২৫ তারিখের খবরগুলো পাঠ করলেই বোঝা যাবে বন্যায়, অতিবৃষ্টিতে লাখ লাখ মানুষের জীবন কীভাবে অনিশ্চিত হয়ে ওঠেছে। খবরে দেখা যাচ্ছে—বৃষ্টি কমছে না, তাই বন্যার জলও কমছে না। নদনদীর জল ক্রমাগতভাবেই বিপত্সীমার ওপরে উঠছে। আগে ছিল বন্যাকবলিত দেশের উত্তরাঞ্চল। এখন যোগ হয়েছে মধ্যাঞ্চল। ঢাকা শহরের আশপাশ অঞ্চলেও বন্যার জল বাড়ছে। ফরিদপুরে জলের তোড়ে ভেঙে গেছে শহর রক্ষা বাঁধ। সেদিন খবরে দেখলাম কীভাবে একটি সরকারি বিল্ডিং পদ্মার জলের তোড়ে বিলীন হয়ে গেছে। উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রাম, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধা ইত্যাদি জেলার জল কমছে না। জায়গায় জায়গায় ভেঙে যাচ্ছে নদী। মানুষের ঘরবাড়ি ভেসে যাচ্ছে। হাজার হাজার পরিবার গৃহহীন-ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তায়। গরু-ছাগল নিয়ে তাদের বসবাস করতে হচ্ছে। সাপের উপদ্রব সর্বত্র। বেশ কয়েক জন বন্যায় মারাও গেছেন বলে একটি কাগজে দেখলাম। হাজার হাজার মানুষ জলবন্দি। শেরপুর, মানিকগঞ্জের শিবালয়, টাঙ্গাইলের নাগরপুর, ফরিদপুর সদর, মাদারীপুরের শিবচর সর্বত্র বন্যার জল মানুষকে বর্ণনাতীত কষ্টের মধ্যে ফেলেছে। ভাতের কষ্ট, পানীয়জলের কষ্ট, বৃষ্টিতে ভেজার কষ্ট, শিশুদের অসহায়ত্ব, গবাদি পশুর খাদ্যহীনতা, ওষুধের অভাব—সবমিলে চারদিকে এক ভয়ংকর পরিস্থিতি। কেউ কেউ বলছেন ১৯৯৮ সালের বন্যার মতো অবস্থা হবে। আবহাওয়ার পূর্ভাবাস অনুকূলে নয়। প্রচুর আউশ ফসল নষ্ট হচ্ছে। আউশ আমাদের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ ধানি ফসল। বোরো ও আমনের মধ্যবর্তী সময়ে ‘বাফার’ হিসেবে এই ধানি ফসল কাজ করে। এই ফসলের ক্ষতি মাত্রাতিরিক্ত হলে খাদ্যাভাব হবে না—কিন্তু চালের ব্যবসায়ীরা পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পারে। ব্যবসায়ীরা অবশ্য কোনো সুযোগই ছাড়েন না। এই বন্যা পরিস্থিতিতেও শাক-সবজির দাম বেড়েছে। অনেক অজুহাত। এতেও মানুষের কষ্ট। এমনিতেই যাদের কিছু সঞ্চয় আছে তারা তা ভেঙে ভেঙে খাচ্ছে। সেইজন্য ব্যাংকের আমানতও হ্রাস পাচ্ছে বলে একটি খবরে দেখলাম। আর যাদের কোনো আয় নেই, রোজগার নেই, তাদের কষ্ট বন্যায় বেড়েছে, অতিবৃষ্টিতে বেড়েছে। দ্রব্যমূল্য মুহূর্তে আরো বেড়েছে। এদিকে দৈনিক ইত্তেফাকের ২৫ তারিখের খবরে দেখা যাচ্ছে বন্যায় এখনো জলবন্দি লাখ লাখ মানুষ। ঢাকা-শরীয়তপুর সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। জামালপুরে বাঁধ ভেঙে নতুন এলাকা প্লাবিত। শরীয়তপুর, সিরাজগঞ্জ, কুড়িগ্রাম ও পাবনা অঞ্চলে ২০ লাখেরও বেশি মানুষ জলবন্দি হয়ে কষ্ট ভোগ করছে বলে খবর। খেতের ফসল বন্যার জলে ডুবে আছে। মাছ আমাদের অতি প্রয়োজনীয় একটা খাদ্যবস্তু। মাছ এখন চাষও হয় প্রচুর। এসব মাছ বহু জায়গায় ভেসে গেছে পুকুর থেকে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, সুনামগঞ্জ সর্বত্র বন্যার তাণ্ডব। কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার ভাটি অঞ্চলের একই অবস্থা। উজানের চাপে বরিশালের নদনদীগুলোর জলও বিপত্সীমার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে। এক কথায় মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। অথচ সামনে পবিত্র ঈদ।
গত রোজার ঈদ মানুষ শান্তিতে করতে পারেনি। সেটা ছিল করোনা ভাইরাস-১৯ সংক্রান্ত সমস্যার কারণে। এবার করোনার সমস্যা তো তীব্র আছেই। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে বন্যার কষ্ট। অথচ এই পবিত্র কোরবানির ঈদ মানুষ যেমন ধর্মীয়ভাবে পালন করে গাম্ভীর্যের সঙ্গে, তার সঙ্গে আবার জড়িত আছে বড় একটা অর্থনীতিও। কোরবানির ঈদে লাখ লাখ পশু কোরবানি হয়। খামারিরা, সাধারণ চাষিরা সারা বছর ধরে ব্যয়বহুলভাবে গবাদি পশু লালন-পালন করে একটি আশায়। কোরবানির ঈদে তা বিক্রি করে দুটো পয়সার মুখ দেখবে। এবার কী তা সম্ভব হবে। দারুণ অনিশ্চয়তা। করোনা ভাইরাসের কারণে খোলা মাঠে বাজার বসবে না। চলবে ই-শপিং।। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে এই ধরনের শপিংয়ে তো সাধারণ মানুষ অভ্যস্ত নয়। এমতাব্যস্থায় কী দাঁড়াবে? অথচ সরকারের ধারণা এবার ঈদের বাজার খারাপ হবে না। এই প্রত্যাশায় ২৫ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট বাজারে ছাড়বে বাংলাদেশ ব্যাংক। আবার বিদেশে কর্মরত বাঙালিরাও কিছু টাকা পাঠাচ্ছে। রেমিটেন্সের অবস্থা ভালো। অনেকেই চূড়ান্তভাবে দেশে ফিরছেন বলে সব সঞ্চয় নিয়ে চলে আসছেন। তাদের টাকাও বাজারে যাবে। এতে ঈদের বাজার কোরবানির বাজার খারাপ হওয়ার কথা ছিল না। আবার এদিকে বেসরকারি খাতে নতুন অনিশ্চয়তা। সবাই কর্মচারীদের বোনাস দেবে কি না তাতে সন্দেহ আছে। এটি হলে কোরবানি সংশ্লিষ্ট বাজারে মন্দা থাকতে পারে। কোরবানির ঈদে শুধু গবাদি পশুর বাজার নয়, মসলাপাতি, দামি চাল, সয়াবিন, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, চিনি, সেমাই ইত্যাদির চাহিদাও বাড়ে। এবার কী তা যথারীতি বাড়বে? কোরবানির ঈদে হাজার হাজার লোক সাহায্যকারী হিসেবে কাজ করে। মাংস বানায়। তাদের রোজগার এই সময়টাতেই। দা, বঁটি ইত্যাদির চাহিদা থাকে। কামারের কাজ বাড়ে। এসব কী এবার করোনা ভাইরাস ও বন্যাজনিত কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সম্ভব হবে। এরপরের কাজই চামড়ার ব্যবসা।
কোরবানির ঈদের সময় সারা দেশে চামড়া বেচাকেনা হয়। লাখ লাখ পিস চামড়া বাজারে আসে। দোকানদার, পাইকার, রপ্তানিকারক ও চামড়াশিল্পের মালিকরা তা কেনে। সরকার এই ব্যবসায় ঋণের ব্যবস্থা করে যদিও চামড়া ব্যবসায়ীদের ব্যাংক পাওনা শোধের রেকর্ড ভালো নয়। তবু সরকার খামারিদের স্বার্থে ছোট ছোট পাইকার, দালাল, ফড়িয়াদের স্বার্থে প্রতি বছর বেশ টাকা ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করে। এবারও ৫০০ কোটি টাকার ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এবার কী খামারিরা কোরবানিদাতা, এতিম খানায় চামড়া দান, ন্যায দাম পাবে? গেল বছর চামড়া নিয়ে চামড়ার বড় বড় ব্যবসায়ীরা জব্বর খেলা খেলেছিল। ফলে খামারি ও সংশ্লিষ্ট ছোট ছোট ব্যবসায়ীরা চামড়ার দাম পাননি। লবণের সংকট তৈরি করে যাতে চামড়া রক্ষণ তারা না করতে পেরে বড় ব্যবসায়ীর কাছে তা বিক্রি করতে বাধ্য হয় তার ব্যবস্থা করা হয় গত বছর। এরজন্য তারা সিন্ডিকেটও গঠন করে। এমতাবস্থায় প্রশ্ন এবারও কী তাই হবে?
করোনা ভাইরাস-১৯, বন্যা, ঈদ, ঈদের অর্থনীতির পাশাপাশি যে প্রশ্নটি এখন সংশ্লিষ্ট সকলের মনে তা হচ্ছে মানুষ এতসব সমস্যার মধ্যে বাঁচবে কী করে। ১৯ তারিখের ইত্তেফাকের পর ‘সরকারি সহায়তার পরও বেঁচে থাকার লড়াইয়ে ৫ কোটি মানুষ। অর্থাত্ আমাদের মোট লেকসংখ্যার ২৫ ভাগেরও বেশি মানুষের জীবন দারুণ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। বলাবাহুল্য এই জুন মাসের দিকের হিসাব। সর্বশেষ যোগ হয়েছে বন্যাজনিত দারিদ্র্য। আমাদের উন্নয়ন এখনো টেকসই উন্নয়নের পর্যায়ে উত্তীর্ণ হয়নি। এখন ‘টেকসই উন্নয়নের’ কাজ চলছে। ফলে দেখা যাচ্ছে—নিম্নমধ্যবিত্ত একটা সংকটেই পড়ে যায় নিচে। মধ্যবিত্ত হয়ে পড়ে নিম্নমধ্যবিত্ত। নিম্নমধ্যবিত্ত হয় যায় দরিদ্র। দরিদ্র হয়ে যায় অতি দরিদ্র। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে—বন্যা পরবর্তীকালে ৫ কোটি নয় আরো অনেক বেশি লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে পড়বে। এদের বাঁচানোর কাজই এক নম্বর কাজ এখন। উন্নয়ন, জিডিপির প্রবৃদ্ধি এসব হবে, হতে থাকবে। এই মুহূর্তের কাজ দুঃখী মানুষদের বাঁচিয়ে রাখা। তাদের জন্য সরকার অনেক কিছু করছে। কিন্তু তা আরো দৃশ্যমান হওয়া দরকার। দরিদ্র পরিবার পিছু আরো একবার নগদ টাকা দেওয়া যায় কি না তা ভাবা দরকার।
n লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়