>> মামুনুর রশিদ রাজিব
সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর থানার এক অজপাড়া গাঁয়ের নাম আগ-নুকালী। সে গ্রামেই বেড়ে ওঠা এক উদ্যমী যুবক মামুন বিশ্বাস। কখনো তিনি ছুটে চলেন পশুপাখির প্রতি ভালোবাসার টানে কখনোবা মানবিকতার আহ্বানে। ছুটে চলেন সময়ে অসময়ে, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে কিংবা চর-বেষ্ঠিত এলাকাসহ বনবাদারের পথে পথে। কখনো হয়তো খুঁজে পান আহত পশুপাখির সন্ধান কিংবা কারও হাতে অবৈধভাবে আটক হওয়া পশুপাখির। কখনোবা পান আবার মানুষের অসহায়ত্বের সন্ধান। কেউ হয়তো বিরল রোগে আক্রান্ত হয়েও টাকার অভাবে চিকিত্সা করাতে পারছেন না, কেউবা আবার সন্তানদের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে পারছেন না। কেউ শীতের বাতাসে হাড় হিম হয়ে পরে থাকেন জড়সড় হয়ে কিংবা বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাতে জর্জরিত হয়ে উদ্বাস্তুর মতো ঘুরে বেড়াচ্ছেন পথে প্রান্তরে। আর এসব মানুষের পাশেই সৃষ্টিকর্তার পাঠানো দূতের মতো সাহায্য নিয়ে হাজির হন মামুন বিশ্বাস। অসহায় মানুষগুলোর হাতে তুলে দেন ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যম থেকে সংগ্রহ করা অর্থ।
প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন কারণে পশুপাখির আহত হওয়া দেখে এবং নিজের বড় বোনের অটিজম হয়ে জন্ম নেওয়া ও তার নিজের সদ্য ভূমিষ্ট ছেলে সন্তানকে নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ঘোরার পরেও পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যু হওয়া দেখে তিনি পর্যায়ক্রমে পশুপাখি এবং মানবতার কাজে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। কিন্তু, সকল ভালো কাজেরই শুরুতে যেমন বাধা আসে, তেমনই মামুন বিশ্বাসের কাজেও বাধা এসেছিল। সমাজ তথা আশপাশের লোকজন তাকে পাগল ভাবতে শুরু করেছিল, শুরু করেছিল নানাভাবে উপহাস। কিন্তু স্কুল শিক্ষক বাবা মাহবুবুল হোসেনের উত্সাহে তিনি এগিয়ে চলেন আপন গন্তব্যে। গড়তে থাকেন এক মানবিক মামুন বিশ্বাসের ভিত্তি।
কথা হয় মানবিকতার ফেরিওয়ালা মামুন বিশ্বাসের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি প্রথমে অসহায় মানুষগুলোর অবস্থা ফেসবুকে পোস্ট করে তুলে ধরি এবং সেই পোস্ট দেখে দেশ ও দেশের বাইরে থেকে বিভিন্ন মানুষ বিকাশের মাধ্যমে এই অসহায় মানুষগুলোর জন্য আর্থিক সাহায্য পাঠাতে থাকে। আমি সেগুলো সংগ্রহ করে তাদের হাতে পৌঁছে দিই। যার ঘর নেই তাকে ঘর করে দিই, যার চিকিত্সার প্রয়োজন তাকে চিকিত্সার ব্যবস্থা করি। এ ছাড়াও অনেকে আছেন, যাদের ছেলেমেয়ের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেয়েও টাকার অভাবে ভর্তি হতে পারছে না, তাদের ভর্তির ব্যবস্থা করি। বন্যা কিংবা শীতে অসহায়দের মাঝে খাবার এবং শীতবস্ত্র বিতরণ করি। তবে, অসহায় মানুষের পাশে এসে দাঁড়ানোটা যতটা সহজ অনেক সময় অসহায় পশুপাখির পাশে দাঁড়ানো ঠিক ততটাই কঠিন হয়ে পরে। কারণ, কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ যখন নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থে অবৈধভাবে পশুপাখি শিকার করে। তাদের হাত থেকে পশুপাখিগুলো মুক্ত করার অভিযানে যখন যাই, তখন অনেক সময় উল্টো পশুপাখি শিকারিদের হামলার শিকার হতে হয় আমাকে। তখন অবশ্য বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কর্মকর্তাসহ উপজেলা কর্মকর্তা এবং প্রশাসনের সাহায্য নিতে হয়।’
অসহায় মানুষগুলোর মুখে তৃপ্তির হাসিকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিদান উল্লেখ করে নিজের অনুভূতি বর্ণনা করতে গিয়ে অনেক উদাহরণের মধ্যে বেতকান্দির ৬ বছরের শিশু ফাতেমার উদাহরণ টেনে বলেন, ‘৬ বছরের ফাতেমার পেটে যখন ৯ কেজি ওজনের টিউমার ছিল এবং বাবা-মা অর্থের অভাবে তার চিকিত্সা করাতে পারছিল না। তখন আমি তাদের সেই অসহায়ত্বের কথা ফেসবুকে প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে অর্থ সহায়তার সাড়া পেতে থাকি। একসময় ঢাকার একটি হাসপাতালে তাকে চিকিত্সা করিয়ে ভালো করে আনি। এখন যখন দেখি সে, আরও দশটা ছেলেমেয়ের মতো দৌড়াদৌড়ি করছে, সবার সঙ্গে স্কুলে যাচ্ছে। তখন আমার হূদয় যেন ভরে ওঠে পরিপূর্ণতার অশ্রুতে। শুধু ফাতেমাই নয়, যখন অসহায় পশুপাখিগুলোও সুস্থতা কিংবা শিকারির হাত থেকে মুক্তি পেয়ে ছুটে চলে আপন নীড়ে তখন যেন মনে হয় আমার একেকটা স্বপ্ন আজ পরিপূর্ণতার স্বাদ নিয়ে ছুটে চলেছে দিগন্ত পেরিয়ে।’