তরুণ স্কাউটেরা বদলে দিল দুর্গম চর

>>  জুনাইদ আল হাবিব

ধরলা নদীর বুকে জেগে ওঠা চর। চরটির তিনটি অংশ। চর পলিমারি, নগদটারির চর, ওসমান তাঁতির চর। সেখানে বসাবস ২৩২টি পরিবারের। প্রায় দেড় হাজার মানুষের জীবন প্রবাহ বয়ে চলছে ওখানে। শিশুর সংখ্যা নয় শতাধিক। মানুষের মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়ানোর কোনো উদ্যোগ ছিল না। কোনোমতে চিকিত্সা সেবার জন্য ডাক্তারও ছিলেন না, ব্যবস্থা ছিল না নিরাপদ পানির। ছিল না দুর্যোগ মোকাবিলার সবুজ বলয়। কতটা দুর্গম চর এটি, যার ভিন্ন প্রমাণ সেখানে চলাচলের রাস্তা না থাকার বিষয়টি। এমন অনগ্রসর জনপদের মানুষের জীবন পরিবর্তনে কিঞ্চিত ভাবনাটাও যেন অসম্ভবের ছিল। কিন্তু এ অসম্ভবকে সম্ভব করেছে একদল তরুণের কাজ! তারা স্কাউট। তাই তো চরটির নাম এখন ‘স্কাউটের চর’। ১৯৯৬ সালে এ তরুণদের উদ্যোগে গঠিত হয় ক্রিস্টাল ওপেন স্কাউট গ্রুপ। শুরু থেকে এ পর্যন্ত যার সদস্য সংখ্যা শতাধিক। বর্তমানে ছেলেমেয়ে দুইটি ইউনিটের ৩০ জন সদস্য কাজ করছেন। যাদের কেউ কলেজের, কেউবা ভার্সিটির পড়ুয়া। তবে সাবেক সদস্যরা কোনো না কোনোভাবেই এ চরকে বদলে দিতে কাজ করছেন।

‘সেবার উদ্দেশ্যে আমরা সংগঠনটি গঠন করি। এরপর সংগঠনের সদস্যদের সক্রিয় করে বরগুনা, চাঁদপুরসহ বেশ কিছু অঞ্চলে ঘুরেছি একদম দরিদ্রপীড়িত স্থান খোঁজার জন্য। এর শুরুটা ২০০১ সাল থেকে। কিন্তু ২০০৮ সালেও তা যখন সম্ভব হয়ে ওঠেনি, পরবর্তী বছর অর্থাত্ ২০০৯ সালে আমরা ম্যাপ দেখে দেখে খুঁজতে থাকি দেশের সবচেয়ে নিম্ন আয়ের হতদরিদ্র মানুষের বসাবস কোথায়। উত্তরবঙ্গে এর প্রবণতা বেশি চোখে পড়ে তখন। এবার গাইবান্ধা, লালমনিরহাট ঘুরেছি। অনুসন্ধানে লালমনিরহাটের শহর থেকে একেবারে প্রত্যন্ত এলাকায় একটি চরের সন্ধান পাই। আমরা ওখানেই কাজ করার সিদ্ধান্ত নিই। ওখানে বসাবসকৃত মানুষের এক শ ভাগ ধরলার ভাঙনের শিকার। তাদের আমরা দুইভাগে ভাগ করি। কাউকে দরিদ্র, কাউকে হতদরিদ্র। সেখানে একটি বিষয় আমাদের বিবেক নাড়া দেয়। দিনে একবার তারা ভাত খায়। রাতে বা সকালে যে মানুষ ভাত খায়, তারা তা জানেও না। যে একবেলা খায়, তাতে কোনো রকম লবণ মরিচ হলেই হলো। বছরের তিন থেকে চার মাস সময় চরের মানুষের আয় নেই। তখন যেন একটা দুর্ভিক্ষ চলে ওখানে। তবুও শুরুতে আমরা ওইসব মানুষের জীবিকা পরিবর্তনে হাত দিইনি। শিক্ষাতে প্রথম হাত দিই।’ বলছিলেন সংগঠনটির উদ্যোক্তা এবং বাংলাদেশ স্কাউটসের জনসংযোগ ও মার্কেটিং বিভাগের জাতীয় কমিশনার সারোয়ার মো. শাহরিয়ার।

তিনি বলেন, ‘ধরলা নদীর ওপারে গিয়ে কিছু ছেলে-মেয়ে পড়ত। যারা ধনী, তাদের ছেলেমেয়েরাই কেবল এ সুযোগটা পেত। কিন্তু যাদের আয় নেই, তাদের ছেলেমেয়েরা তো শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তখন ষাট হাজার টাকা খরচে টিনের একটি ঘর তৈরি করি। যেখানে বেঞ্চ করা হয়েছে বসার জন্য এবং বই রাখার জন্য। তখন একজন শিক্ষক খুঁজি। ওইখানেরই একটা মেয়ে আরজু আক্তার নাম, তাকে পাই। সে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে। শুরু হয় শিশুদের ক্লাস টুতে পড়াশোনা। তখন একটা ভিশন ঠিক করি। স্কুলের বাইরে যেন কোনো শিশু না থাকে। নিরাপদ পানি, প্রাথমিক স্বাস্থ্য, জলবায়ু সংকট থেকে নিরাপত্তার জন্য চরটাকে সবুজ করে ফেললাম। পনের হাজার গাছ লাগিয়েছি। শিশুদের স্কুলে পড়াশোনার আওতায় নিয়ে আসি। এরপর শ্রেণিকক্ষ বাড়ল। আরও একজন শিক্ষক নিয়োগ করলাম। ১৭ জন শিশু শিক্ষার্থীকে নিয়ে শুরুটা হলেও বর্তমানে স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দেড় শ। ২০১৪ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত স্কুল থেকে শিশুরা ৫ম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষা দিয়ে আসছে। এতে কোনো শিক্ষার্থী ফেল করেনি। ফলাফলও অনেক ভালো।’

কাজের সফলতার চিত্র তুলে ধরে সারোয়ার মো. শাহরিয়ার বলছিলেন, ‘এরপর আমরা ২০১৫ সালে মানুষের জীবিকায় হাত দিই। ৭২ জন মহিলাকে আমরা দুইটি করে মেয়ে ছাগল দিই। এখন প্রত্যেক মহিলা ২০ থেকে ৩০টি ছাগলের মালিক। যাদের কেউ ঘর করেছে, কেউ সোলার কিনেছে, কেউ স্বামীকে দোকান করে দিয়েছে, কেউ জমি বন্ধক রেখেছে। এভাবেই আজ মানুষগুলো স্বাবলম্বী।’

চলমান কাজ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে ৩৬টি পরিবারের ঘরকে বদলালাম। যার ঘরের যেটা দরকার সেটা নতুন লাগিয়ে দিয়েছি। প্রত্যেক ছাত্রের পিছনে বছরে ৮ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। ২ বছর পর পর প্রত্যেক পরিবার থেকে একটা ছাগল ফেরত নিই। যেটা অন্য আরেক পরিবারকে দেওয়া হচ্ছে। এতে ক্রমান্বয়ে সবাই উপকারভোগী হচ্ছে। এসব খরচ জোগাতে আমরা ফেসবুককে কাজে লাগাই।’ কাজের পিছনের প্রতিবন্ধকতা ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমাদের কাজের প্রধান সমস্যাটা হলো দূরত্ব। যেমন ঢাকা থেকে চরের দূরত্ব ৪৫০ কিলোমিটার। লালমনিরহাট জেলা শহর থেকে এর দূরত্ব ২০ কিলোমিটার। একেবারে পিছিয়ে পড়া এলাকা এটি। রাস্তা ঘাট নেই, তাই যোগাযোগব্যবস্থা একদম অনুন্নত। তাই আমাদেরও সেটা মোকাবিলা করতে হয়। মাঝখানে কিছু মানুষ ওখানে একটা মাদ্রাসা খুলে বিভ্রান্তি ছড়াতে চাইছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সফল হতে পারেনি।’

সামনের পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন কী? জানতে চাইলে সারোয়ার মো. শাহরিয়ার বলছিলেন, ‘সেখানে স্বাস্থ্যসম্মত উন্নত চুলার ব্যবস্থা করব। যেটাকে বন্ধু চুলা বলা হয়। সোলার বিদ্যুত্ স্থাপনের মাধ্যমে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ডাক্তারি চিকিত্সার ব্যবস্থা করা হবে। যেটা টেলি-ট্রিটমেন্ট নামে পরিচত। এ পরিকল্পনার মধ্যে শিক্ষাখাতকে অনন্য উচ্চতায় নেওয়া সম্ভব হবে। এ প্রকল্পটি এ বছর স্কাউটসের এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের ২৭টি দেশের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ প্রকল্প। যার জন্য আমার ৩ হাজার ডলার সহযোগিতা পাব। আশা করি, তা দিয়ে চরটিকে আরও বদলে দেওয়া যাবে।