চিররঞ্জন সরকার
ধনী হওয়ার বা কোটিপতি হওয়ার ইচ্ছে সব মানুষেরই থাকে। সবাই চায় টাকাপয়সা আয় করে নিজেকে সবার ওপরে তুলে নিতে। কিন্তু সবাই ধনী হতে পারে না, কেউ চেষ্টা করে সফল হয় কেউ-বা বৃথা চেষ্টা করে যায়। সঠিক উপায় জানা না থাকায় ধনী হওয়ার সে সুযোগ কাজে লাগাতে পারে না তারা।
ধনী হওয়ার জন্য কায়দা-কানুন জানতে হয়, কিছু কৌশল অবলম্বন করতে হয়। ‘সঠিক’ পদ্ধতি বা কায়দা-কানুনের প্রয়োগ করতে পারলে আপনি সহজে ধনী হতে পারবেন।
আমাদের দেশে দ্রুত ধনী হওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে রাজনীতিতে যোগ দেওয়া। এটা আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জাতীয় পার্টির সনাতন ধারার দলীয় রাজনীতি নয়, এটা হচ্ছে ‘মাল কামাও পার্টি।’ আপনার মূল ধান্দা হবে যে কোনোভাবে মাল কামানো, টাকা বানানো। রাজনৈতিক দল হবে আপনার আত্মরক্ষার ঢাল। কেবল সাইনবোর্ড। মনে রাখতে হবে যে, আপনি দলের নন। দল হবে আপনার স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার। এজন্য এক দলে স্থির থাকা চলবে না। যখন যে দল ক্ষমতায় যায়, যখন যেখানে গেলে লাভ হয়, আপনাকে সেই দলে ভিড়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় যদি আপনি একবার এমপি হতে পারেন। এমপি হওয়াটাও খুব কষ্টসাধ্য নয়। দরকার আন্তরিক ইচ্ছে, আর কার্যকর পরিকল্পনা। লক্ষ্মীপুরের এমপি কাজী শহিদুল ইসলাম পাপুলের এমপি হওয়ার প্রক্রিয়াকে আপনি উদাহরণ হিসেবে নিতে পারেন।
এমপি হওয়ার জন্য আপনি ২০০ কোটি টাকার প্রজেক্ট নিন। মনোনয়ন পেতে আপনি খরচ করবেন ১০০ কোটি টাকা। মনোনয়ন নিশ্চিত হওয়ার পর আপনি থানা, পুলিশ আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, প্রশাসনের জন্য রাখলেন ৫০ কোটি। বাকি ৫০ কোটি টাকা ওড়ালেন নির্বাচনি এলাকায়। এলাকার সমস্ত মসজিদ, মক্তব, মাদ্রাসা, মন্দিরে গিয়ে আপনি নগদ কিছু অনুদান দিন। কিছু বাছাই করা গরিব-দুঃখীকে শাড়ি-লুঙ্গি দিন। এলাকার টাউট-বাটপাড়-ধান্দাবাজগুলোকে আলাদা আলাদা বাসায় ডেকে নিয়ে একটু পোলাও-মাংস খাওয়ান। এরপর নগদ কিছু ধরিয়ে দিন। ভবিষ্যতে আরো কিছু দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিন। টাকা পেলে খেটে-খাওয়া আর চেটে-খাওয়া উভয় ধরনের মানুষই আপনার পক্ষে কথা বলবে। এভাবে যদি ঠিকঠাকমতো টাকা ছিটাতে পারেন, তাহলে আপনার বিজয় নিশ্চিত।
নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর আপনাকে মনোনিবেশ করতে হবে টাকা ওঠানোর খেলায়। ডিউটি ফ্রি গাড়ি দিয়ে শুরু করুন। গাড়ি বেচে পাবেন অন্তত ১ কোটি। এরপর শুরু করুন চাকরির সুপারিশ। মনে রাখবেন, চাকরির বাজারে চরম আকালের দিনে এমপিদের সুপারিশ যেন দুর্ভিক্ষে লঙ্গরখানা। কাজেই সুপারিশ শুরু করুন। সবকিছু ঠিকঠাকমতো করার জন্য সিস্টেম চালু করুন। মনে রাখবেন, চাকরির জন্য মিছিল আসবে। আপনি বিশ্বস্ত লোক ঠিক করুন যে আপনার হয়ে নগদ গুনে নেবে। তাকেও নজরদারিতে রাখুন। দু-এক জন চামচা গোছের ব্যক্তিকে গোয়েন্দা হিসেবে লাগিয়ে রাখুন। তবে তাদের পেমেন্টে নিয়ে কোনো ঝামেলা করবেন না। প্রত্যেককে আলাদা আলাদাভাবে ডেকে বলুন, সে-ই আপনার সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষ। স্ত্রী-সন্তানও তার মতো বিশ্বস্ত নয়। বিভিন্ন পদের চাকরির জন্য আলাদা আলাদা রেট ঠিক করুন। চাকরির বাজারে নানা পদের চাকরির সুপারিশ আসবে। পুলিশের কনস্টেবল থেকে বিসিএস অফিসার। কৃষি থেকে সমবায়, প্রাথমিক শিক্ষক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। পৌরসভার ঝাড়ুদার থেকে সচিবালয়ের পিয়ন। আপনাকে সব ধরনের চাকরির জন্যই তদবির করতে হবে। প্যাডের মধ্যে ডিও দিন। চাকরি হওয়া বা না-হওয়া পরের কথা। তবে টেলিফোনে কিছু লোকের সঙ্গে খায়খাতির লাগানোর চেষ্টা করুন। সব সুপারিশই যেন ব্যর্থ না হয়। মানুষ তাহলে অবিশ্বাস করবে।
আপনার বাসায় বিভিন্ন ধরনের কামরা বানান। নিয়োগসংক্রান্ত কাজের জন্য একটা। উন্নয়নসংক্রান্ত কাজের জন্য আরেকটা কামরা বানান। উন্নয়নসংক্রান্ত কাজে রয়েছে সীমাহীন টাকা। রাস্তা নির্মাণ, ব্রিজ নির্মাণ, হাসপাতাল নির্মাণ। ঠিকাদাররা আপনার বাসায় আসবেন। আগেকার দিন হলে তারা ফল, মিষ্টি, মাছ, মুরগি, সবজি নিয়ে যেত। এখন ডিজিটাল বাংলাদেশে টাকাই সবচেয়ে বড় উপহার। টেন্ডার নিয়ে আলোচনা হবে, ভাগবাঁটোয়ারা চূড়ান্ত হবে। এরপর আপনি ডিসি, কিংবা ইউএনও, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা সিভিল সার্জনকে বলে দেবেন। (তাদের ভাগটাও অবশ্য গোপনে ঠিকাদার পৌঁছে দেবে।) কোনো কোনো ঘাড়ত্যাড়া সরকারি কর্মকর্তা আপনার কথা নাও শুনতে পারে। সেক্ষেত্রে আপনাকে অবশ্যই একজন-দুজন মন্ত্রীর সঙ্গে খাতির তৈরি করতে হবে। ডিসি, টিএনও, কিংবা ইঞ্জিনিয়ারদের সামনে সেই মন্ত্রীর সঙ্গে উচ্চ স্বরে রসিকতাপূর্ণ আলাপ করে বুঝিয়ে দিতে হবে যে, আপনি অতটা ফেলনা নন। মন্ত্রীরা পর্যন্ত আপনার ইয়ার দোস্ত। এটা যদি আপনি বোঝাতে পারেন, তাহলে সরকারি কর্মকর্তারা বাপ বাপ করে আপনার সব পরামর্শ মেনে নেবে।
এরপর আছে মামলা-মোকদ্দমার তদবির। আর বেতনের মতো আসবে টিআর, কাবিখা। বন্যা, দুর্যোগ হলে তো কথাই নেই। টাকা আসতে থাকবে বানের পানির মতো।
আর শুধু এক্সট্রা ইনকাম নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে না। নিজে আরো ব্যবসায় দাঁড় করান। সরকার ক্ষমতায়, তাই বানিয়ে ফেলেন হোটেল, কিংবা হাসপাতাল অথবা শপিং কমপ্লেক্স। এমপি হলে অনেক সুবিধা, অনুমতি নেওয়ার বালাই নেই। ঠিকাদারি ব্যবসায়ও শুরু করতে পারেন। ঠিকাদারিতে লাভ অনেক। ক্ষমতা দেখিয়ে কাজ নিয়ে কাজ বেঁচে দেওয়া। ব্যস। বছর ঘুরতেই নির্বাচনের খরচ উঠে আসবে। এরপর শুধু লাভ আর লাভ।
আপনি যদি কামেল ব্যক্তি হন, যদি লাইনঘাট ভালো থাকে, তাহলে অবশ্য চাকরির তদবির করার দরকার নেই, স্থানীয় টেন্ডারে নাক গলানোর দরকার হবে না, এমনকি টিআর, কাবিখার চাল-গম নিয়ে হাতও নোংরা করতে হবে না। মেগা প্রজেক্টে ভাগ বসান। বড় প্রজেক্ট নেন, ব্যাংকের মালিক হন, সরকারি বড় কেনাকাটা বাগিয়ে নিন। দেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে। বাজেটও আকারে বড় হচ্ছে। তাই হাজার কোটি টাকার একটা প্রজেক্ট হলেই হলো। এক দানে ছক্কা।
অনেকে বলতে পারেন, রাজনীতির এই বাণিজ্যে খেলোয়াড় কজন? এমপি হন মোটে ৩৫০ জন। সবাই তো আর এমপি হতে পারবেন না। বাকিদের কী হবে? তাদেরও নিরাশ হওয়ার কিছু নেই। এই মন্ত্রী-এমপিদের ‘বিশ্বস্ত অনুচর’ সেজে কমিশন বা চাঁদাবাজি করেও কোটিপতি হওয়া যায়। এজন্য দরকার হলে মন্ত্রী-এমপির প্রতিদ্বন্দ্বী বা শত্রুস্থানীয় কাউকে আপনি খুন করে আস্থা অর্জন করতে পারেন। আপনি নিজের একটা ‘সুশীল’ ইমেজ গড়ে তুলেও ফায়দা লুটতে পারেন। বাসায় নিয়মিত পার্টি দিন। সেখানে মিডিয়ার হোমরাচোমরাদের ডাকুন। তাদের সঙ্গে সেলফি তুলে ফেসবুকে দিন। চাই তো তাদের সন্তানের জন্য একটা দামি ফোন উপহার দিন। তাদের বশ করুন, তাহলে তারাই আপনাকে লিফট দেবে। টকশোতে ডাকবে। মন্ত্রীদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ করিয়ে দেবে। তখন আপনাকে আর ঠেকায় কে?
আপনি ব্যবসায় শুরু করে দিতে পারেন। বড় বড় ব্যবসায়। মন্ত্রী-এমপিদের সঙ্গে খাতির করুন। বড় বড় জিনিস (ফ্ল্যাট-গাড়ি ইত্যাদি) ‘উপহার’ দিন। এভাবে মন জয় করে তাদের সুপারিশ ও সহযোগিতায় ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের টাকা লোন নিন। তারপর সেই টাকা মেরে দিয়ে বড়লোক হয়ে যান। বাইরের কোনো দেশে ‘সেকেন্ড হোম’ বানান। বিপদ দেখলে কেটে পড়ুন। ব্যবসায়ের ঝামেলা ভালো লাগে না? ছোটবেলা থেকেই যে কোনো মূল্যে আমলা হওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। আপনি যদি আমলা হতে পারেন এবং রিজেন্ট, জেকেজির মতো দুই-চারটা ভুয়া প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে পারেন, তাহলেই আপনার টেবিলে অটোম্যাটিক চলে যাবে ঘুষের টাকা। আরো নানা মওকা আপনি পাবেন। সব সময় হাত পেতে নেওয়ারও দরকার নেই। এমনিতেই আপনার ভাগের অংশ আপনার কাছে পৌঁছে যাবে। আপনি যদি প্রকৌশলী কিংবা কোনো ঠিকাদার হন, তাহলে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে নির্মাণকাজ করে হাতিয়ে নিতে পারেন অনেক টাকা। আপনি যদি বিচার বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউ হন তবে রায় ওলটাতে টাকার বস্তা আপনার বাসায় পৌঁছে যাবে। আপনি যদি বিদ্যুত্, গ্যাস, ওয়াসাতে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীও হন, তবে আপনার কোটিপতি হতে বেশি দেরি লাগবে না। অবৈধ সংযোগের বিল আপনার পকেট ভারী করে তুলবে।
রাজস্ব বা কর অফিসে চাকরি করলে দেখেও না দেখার ভান করে কোটিপতি হওয়া যায়। কাস্টমস অথবা বিমানবন্দরে আপনি সুইপার হলেও আপনার কোটিপতি হতে বেশি সময় লাগবে না। পুলিশের বা আনসারের ছোট পোস্টে চাকরি করলেও কোটিপতি হওয়া যায়। এ জন্য একটু জায়গা বরাবর পোস্টিং হলেই চলে। অবৈধ মাদক ব্যবসা, মানব পাচার ইত্যাদি করলেও রাতারাতি কোটিপতি হওয়া যাবে।
সরকারি সম্পত্তি অবৈধ দখল করে কোটিপতি হওয়া সহজ। সরকারি ওষুধ রোগীদের না দিয়ে অবৈধভাবে বিক্রি করে কোটিপতি হওয়া যায়। রোগীদের বিভিন্ন টেস্টের কমিশনের টাকা নিয়ে, অথবা টেস্ট না করে ভুয়া রেজাল্ট ধরিয়ে দিয়ে কোটিপতি হওয়া যায়। সাধারণ ভোগ্যপণ্যের সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়ে সহজে কোটিপতি হওয়া যায়।
ধনী হওয়ার আরো নানা উপায় আছে। এজন্য আপনার অপরিসীম লোভ ও টাকার ক্ষুধা থাকতে হবে। লাজ, লজ্জা, ভয়, বিবেকের দংশন বিসর্জন দিতে হবে। প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে!
n লেখক :রম্যরচয়িতা