জয়িতা শিল্পী
বৈশ্বিক মহামারি করোনা সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ পুলিশ বিশ্বে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। মহামারি করোনার প্রাদুর্ভাবকালে বাংলাদেশ পুলিশ যেভাবে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে তা বিশ্বের আর কোথাও দেখা যায় না। অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ পুলিশ মানুষের আস্থা ও ভরসার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। মানবিকতার এক উচ্চ আসনে ঠাঁই পেয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। এ অর্জন কাঙ্ক্ষিত, এ অর্জন গৌরব ও মর্যাদার।
করোনা সংকটের শুরুর দিকে পুলিশের পর্যাপ্ত নিরাপত্তাসামগ্রী ছিল না। কিন্তু তার তোয়াক্কা পুলিশ করেনি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষের সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ পুলিশের মোট ৬১ জন সদস্য এ পর্যন্ত (২৮.৭.২০২০ইং) জীবন উত্সর্গ করেছেন এবং ১৪ হাজার ১৮৩ সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন। সুস্থ হয়ে কাজে যোগদান করেছেন মোট ১১ হাজার ৩১৪ সদস্য, করোনা উপসর্গ নিয়ে আইসোলেশনে আছেন ৪ হাজার ৪২৩ জন এবং আক্রান্তের সংস্পর্শে এসে কোয়ারেন্টাইনে আছেন ১৫ হাজার ৫২৯ কর্মকর্তা। করোনা ভাইরাসে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর সদস্যই আক্রান্ত হয়েছে সবচেয়ে বেশি। তবুও পুলিশ সদস্যগণ মনোবল হারাননি। বরং এ সংকট উত্তোরণে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দিয়ে কাজ করে চলেছেন।
করোনা সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ পুলিশ যা যা করেছে— ১. সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কঠোরভাবে লকডাউন বাস্তবায়নে সহায়তা। ২. করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিদের আইসোলেশন এবং সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করা। ৩. করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিদের বাড়ি চিহ্নিত করে নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করা। ৪. করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির পরিবারের লোকজন আক্রান্ত ব্যক্তির খোঁজখবর না নিলে তাকে হাসপাতালে প্রেরণ করা। ৫. আক্রান্ত ব্যক্তিকে তার আত্মীয়স্বজন রাস্তায় ফেলে যাবার পর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা। ৬. করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণ করায় পরিবারের লোকজন মৃত ব্যক্তিকে রাস্তায় ফেলে যাওয়ায় মৃতদেহ উদ্ধার করে দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করা। ৭. করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিকে হাসপাতালে ফেলে পালিয়ে গেলে তার চিকিত্সার খোঁজখবর নেওয়া। ৮. মানুষকে বুঝিয়ে অপ্রয়োজনে বাইরে না এসে ঘরে থাকার ব্যবস্থা। ৯. করোনায় মৃত্যুঝুঁকি আছে সেটা বুঝিয়ে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাচল করতে/যে কোনো কাজ করতে অভ্যস্ত করা। ১০. হাটবাজারে, শপিংমলে কেনাকাটার সময় দোকানদার এবং সাধারণ মানুষের মাস্ক পরিধান নিশ্চিত করা। ১১. গণপরিবহনে চালক এবং যাত্রীদের মাস্ক পরিধান করা এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে বসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। ১২. এছাড়াও সবচেয়ে বড় কাজটি পুলিশ করেছে—হাজার হাজার মানুষকে ত্রাণ বিতরণ করেছে ব্যক্তিগত উদ্যোগে। মানবিক কারণে নিজেদের বৈশাখীভাতা, ঈদ বোনাসের অর্থ দিয়ে অসহায়, দুস্থ অনাহারী কর্মহীন মানুষকে খাদ্যসহায়তা প্রদান করেছে। নিজেদের রেশনসামগ্রী বিলিয়ে অসহায় মানুষকে খাদ্যসহায়তা প্রদান করেছে। বেতনের অর্থ দিয়ে পথশিশু, বস্তিবাসী, বেদে, রিকশাশ্রমিক, দিনমজুরদের ত্রাণসহায়তা দিয়েছে। এ সব কাজ পুলিশ স্বপ্রণোদিতভাবেই করেছে।
এখানে উল্লেখ্য বিষয় হলো—করোনা সংকট মোকাবিলায় পুলিশ অনেক কাজই করেছে যা পুলিশের একা করার কথা ছিল না বা পুলিশের আদৌ করার কথা ছিল না; কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই করোনা সংকট কালে সাধারণ মানুষ পুলিশকেই কাছে পেয়েছে বেশি। কেউ করোনা উপসর্গ দেখা দিলে করোনা টেস্ট করানোর জন্য পুলিশের সাহায্য চেয়েছে। লকডাউনে কোনো ক্রাইসিস দেখা দিলে পুলিশের সহযোগিতা চেয়েছে। চিকিত্সা না পাওয়ার কারণে পুলিশকে জানিয়েছে। পারিবারিক কোনো সমস্যা হলেও পুলিশকে জানিয়েছে। এ সংকটে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, ডিউটি অফিসার, বিভিন্ন ইউনিট প্রধান বিশেষ করে পুলিশ সুপার/উপপুলিশ কমিশনারগণের সরকারি মোবাইল নম্বর এবং জরুরি সেবা ৯৯৯-এ প্রচুর টেলিফোনে কল এসেছে মানবিক সাহায্যের জন্য এবং পুলিশের কাছ থেকে আশানুরূপ সেবা মানুষ পেয়েছে।
বৈশ্বিক মহামারি করোনা সংকটকালে পরিবারের কাছের মানুষ, আত্মীয়স্বজন—সবাই যখন দূরে সরে গিয়েছে, বাবা সন্তানের মৃতদেহ দেখতে যাননি, সন্তান হাসপাতাল থেকে বাবার মৃতদেহ গ্রহণ করেনি, স্বামী স্ত্রীকে ফেলে গিয়েছে, স্ত্রী স্বামীকে ফেলে গিয়েছে—এরকম বহু ঘটনার সাক্ষী পুলিশ। পুলিশই মুখ্য ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে এসেছে নিজের জীবন বাজি রেখে। বাংলাদেশ পুলিশ দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য জীবন দিতে কখনো কুণ্ঠাবোধ করেনি, করোনা সংকটকালে আরেকবার তা প্রমাণ দিল। করোনা সংকট থেকে নিশ্চয়ই আমরা একদিন মুক্ত হব। সেদিনও পুলিশকে একইভাবে জনগণের সেবায় নিয়োজিত থেকে কাঙ্ক্ষিত সেবা পৌঁছে দিতে হবে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এখন থেকেই পুলিশকে তৈরি থাকতে হবে। এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মনোভাব পরিবর্তনেরও প্রয়োজন রয়েছে। মানুষকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। জনগণের আইন মান্য করার প্রবণতা বৃদ্ধি করে সচেতন করতে হবে। সব নাগরিক যদি দায়িত্বশীল আচরণ করে তবে আইন প্রয়োগ অনেকাংশে সহজ হয়। বাংলাদেশ পুলিশ মানবিক পুলিশিং কার্যক্রম নিয়ে এগিয়ে যাক ২০৪১-এর অভীষ্ট লক্ষ্যে সেই প্রত্যাশা।
n লেখক :অতিরিক্ত পুলিশ সুপার