সিন্ডিকেটের চাপমুক্ত হচ্ছে না জনতা ব্যাংক

এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক। একের পর এক ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না থাকায় সুসংহত হতে পারেনি ব্যাংকটি। বরং সামনে এগিয়ে যাওয়ার বিপরীতে অন্য ব্যাংকের গ্রাহকদের দায়দেনাও নিজের কাঁধে নিতে চাইছে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের সঙ্গে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের যোগসাজশ করেই বড় বড় গ্রুপকে অর্থায়ন করতে চাইছে।

এদিকে, জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জামাল উদ্দিন আহমেদকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অবৈধ আর্থিক লেনদেনের একটি ভিডিওর সূত্র ধরে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। নতুন চেয়ারম্যান করা হয় বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন টেকনোলজির ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. এস এম মাহফুজুর রহমানকে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে বরাবরই নানা নাটক হয়ে আসছিল। সাম্প্রতিককালে কোনো চেয়ারম্যানই মেয়াদ পূরণ করতে পারেননি। এর মধ্যে প্রভাবশালী মহলের সন্তুষ্টির বিষয় তো থাকেই। যদিও কোনো কোনো সূত্রমতে, ব্যাংকিং খাতে এখন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষেরই দাপট বেশি। তাদের যোগসাজশেই যত অনিয়ম হয়ে থাকে। তারাই আবার বহাল তবিয়তে থাকছেন। বিসমিল্লাহ, এ্যাননটেক্সসহ বেশ কয়েকটি গ্রুপের ঋণ জালিয়াতির ঘটনার পরও ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের ঊর্ধ্বতনদের ঘারে কোনো দোষই চাপেনি। অথচ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তারাই সব ঋণ প্রস্তাব তৈরি ও অনুমোদনের জন্য বোর্ডকে সুপারিশ করে থাকেন। এসব সূত্রমতে, সম্প্রতি জনতা ব্যাংকে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গ্রুপগুলোর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও পরিচালনা পর্ষদের মধ্যে মতদ্বৈধতা দেখা দেয়। অগ্রণী ব্যাংকের একটি বড় গ্রাহক সেই ব্যাংকের দায়দেনাসহ জনতা ব্যাংকের                গ্রাহক হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে এবং প্রস্তাবও দেওয়া হয়। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সেই প্রস্তাবে সম্মত হননি অব্যাহতিপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ড. জামালউদ্দিন আহমেদ। এখানেই ঘটনার সূত্রপাত বলে দাবি করে সূত্রগুলো। এরপর ড. জামালউদ্দিনের বিরুদ্ধে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের একটি ভিডিওচিত্র সামনে চলে আসে, যা সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ মহলে পাঠানো হয়। বিষয়টি ড. জামালউদ্দিন অস্বীকার করলেও তা টেকেনি। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির কয়েক জন শীর্ষ নেতা ছাড়াও কেউ কেউ তার পক্ষে লবিং শুরু করেন। বিষয়টি তার শুভাকাঙ্ক্ষীদের কেউ কেউ আবার তাকে সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া উচিত বলেও পরামর্শ দেন। তবে চেষ্টা-তদ্বির চালালেও তিনি সফল হননি। তার এই ভিডিওচিত্র সামনে আসার আগে কয়েক জন সংসদ সদস্য জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে তাদের পছন্দের একজনের নামে ডিও লেটার দেন বলেও জানিয়েছে ব্যাংকের একটি সূত্র। গতকাল দিনভর আরো কয়েক জনের নাম আলোচনায় এলেও শেষ পর্যন্ত ড. এস এম মাহফুজুর রহমানের নাম সামনে চলে আসে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকের সাধারণ কর্মীরাও বিব্রত। এই ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে এর আগেও নানা নাটক হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে সবাই সরব। গত দুই দিন ব্যাংকিং খাতে জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান, ভিডিও ইত্যাদি ছিল আলোচনার কেন্দ্রে। তবে এবারে ভিডিওর কারণে অব্যাহতিপ্রাপ্ত হলেও অতীতের ঘটনাগুলো ছিল ভিন্ন প্রেক্ষাপট। খোদ অর্থ মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, প্রভাবশালীদের স্বার্থ রক্ষা করতে না পারলেই যত সমস্যা। তবে সার্বিকভাবে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি উল্লেখ করে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী ইত্তেফাককে বলেন, ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতার বহিঃপ্রকাশ। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিষ্ক্রিয়তা জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে, যখন দেশে অর্থমন্ত্রীও অনুপস্থিত রয়েছেন।

নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ড. এস এম মাহফুজুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল বিজনেসের অধ্যাপক ছিলেন। তিনি এর আগে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান ছিলেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং বিভাগের উপসচিব মো. জেহাদউদ্দিন স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, জনতা ব্যাংক লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদে পরিচালক ও চেয়ারম্যান হিসেবে ড. এস এম মাহফুজুর রহমানকে তার যোগদানের তারিখ থেকে তিন বছর মেয়াদে নিয়োগের উদ্দেশ্যে ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর বিধান মোতাবেক বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন গ্রহণসহ প্রয়োজনীয় কার্যক্রমের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।

এদিকে, বিশ্বস্ত একটি সূত্র জানিয়েছে, আইসিবির এই সাবেক চেয়ারম্যানের রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হওয়ার বাসনা ছিল। অগ্রণী ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান জায়েদ বখতের মেয়াদ আর কয়েক মাস বাকি।