হজের শিক্ষা ও কোরবানির বিধান

 

ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ ‘হজ’। প্রাণঘাতী বৈশ্বিক মহামারি করোনার প্রাদুর্ভাবে এবারের হজ আয়োজন করা হয়েছে সীমিত আকারে। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের খোদাপ্রেমিক বান্দা-বান্দীরা এবার হজে না যেতে পেরে নীরবে চোখের পানি ফেলছেন। ইবাদত পালনের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও জীবনের নিরাপত্তার বিষয়টিও ইসলামে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই হজ ফরজ হওয়া সত্ত্বেও প্রাণঘাতী করোনার কারণে যাদের পক্ষে এবারের হজ পালন সম্ভব হয়নি, সংকট থেকে উত্তরণের পর অবশ্যই আগামী বছর তাদের হজ পালন করতে হবে। ওজরের কারণে হজ বিলম্ব হতে পারে, কিন্তু আদায়কারীর জন্য তা কখনো বাতিল হবে না।

একটি মকবুল হজের প্রতিদান হচ্ছে জান্নাত। এ হজ থেকে আমরা অনেক শিক্ষা পেয়ে থাকি। হজ বিশ্ব সংহতি মানব ঐক্যের এক মিলনমেলা। এখানে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে নানা বর্ণের লোক এসে জড়ো হন। সবার গায়ে একই পোশাক, সবার মুখে একই বুলি। বর্ণ-গোত্র, আশরাফ-আতরাফ বলে এখানে কোনো ভেদাভেদ নেই। গোটা মুসলিম উম্মাহ একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গের মতো জড়িয়ে একসঙ্গে হজ পালন করেন। রাসুলুল্লাহ (স) বিদায় হজের ভাষণে বলে গিয়েছেন, ‘আরবের ওপর অনারবের এবং অনারবের ওপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, তোমাদের শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড হচ্ছে তাকওয়া।’ তাই আমরা হজের সমাবেশ থেকে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা গ্রহণ করব।

কোরবানি হজের একটি অনুষঙ্গ হলেও আল্লাহ তাআলা তা প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিম নর-নারীর ওপর ওয়াজিব করেছেন। কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার জন্য শর্ত হচ্ছে প্রাপ্তবয়স্ক ও জ্ঞানসম্পন্ন হওয়া। যিনি ১০ জিলহজ থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবেন, তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে। নগদ অর্থ, স্বর্ণ-রুপা, অলংকার, বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজনে আসে না এমন জমি, প্রয়োজনের অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যাবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সব আসবাবপত্র কোরবানির নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য। নেসাব বলতে বোঝায় স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত তোলা, রুপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন তোলা, নগদ অর্থ ও অন্যান্য বস্তুর ক্ষেত্রে এর মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া। আর স্বর্ণ-রুপা কিংবা নগদ অর্থ—এগুলোর কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে, তবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত একাধিক বস্তু মিলে যদি সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়, তাহলেও তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে। কোরবানির গোশত বণ্টনের মুস্তাহাব তরিকা হল—সব গোশত তিন ভাগ করে এক ভাগ গরিব মিসকিনকে দেওয়া, এক ভাগ আত্মীয়স্বজনকে দেওয়া এবং এক ভাগ নিজের পরিবার-পরিজনের জন্য রাখা। কারো পরিবারের সদস্য বেশি হলে তিনি প্রয়োজনমতো বেশিও রাখতে পারেন; ইসলাম এ অনুমোতি দিয়েছে। কিন্তু যদি মান্নতের কোরবানি হয়, তাহলে তা নিজেরা খেতে পারবে না এবং ধনী আত্মীয়স্বজনকেও দিতে পারবে না, গরিবদের মধ্যেই কেবল তা বণ্টন করতে হবে। আকিকার গোশত সাধারণ কোরবানির গোশতের মতো, নিজে খেতে পারবে, আত্মীয়স্বজনকে দিতে পারবে এবং গরিব-দুঃখীকেও দান করতে পারবে।

লেখক :আজিমপুর দায়রা শরিফের বর্তমান

সাজ্জাদানসীন পির ও মুতাওয়াল্লি