পশু-পাখির প্রতি মানবিকতা ও আল্লাহর নৈকট্য লাভ

 

আসছে ঈদুল আজহা। এই ঈদে মুসলমানগণ সাধ্যমতো পশু কোরবানির মাধ্যমে নিজের প্রবৃত্তি ও মনের পশুত্বকে দমন করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করার চেষ্টা চালান। সারা বছর এই ঈদকে কেন্দ্র করে পশু লালন-পালন, মোটা-তাজাকরণ এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাদের পরিবহন করা হয়ে থাকে। এ সময় একশ্রেণির অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ অজ্ঞতাবশত এদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করে। এই আচরণে অনেক পশু শারীরিক ও মানসিকভাবে নিদারুণ কষ্ট পেয়ে থাকে, অসুস্থ হয়ে যায় এবং অনেক পশু-পাখির মৃত্যুও হয়ে থাকে।

প্রতিটি পশু-পাখি মানব জাতির ন্যায় আল্লাহ তাআলার পরিবারের সদস্যভুক্ত এবং নিরন্তরভাবে তারা আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তুমি কি দেখ না যে, নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে যারা আছে, তারা এবং উড়ন্ত পক্ষীকুল তাদের পাখা বিস্তার করত আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে? প্রত্যেকেই তার যোগ্য ইবাদত এবং পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা ও পদ্ধতি জানে (আল-কোরআন, ২৪:৪১)। 

পশু-পাখি মানব জাতির খাদ্য-পুষ্টি, পোশাক-পরিচ্ছদ, পরিবহন, শিক্ষা, চিকিত্সা, নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণসহ বিভিন্ন উপকারে ব্যবহার করে থাকে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা কি লক্ষ করে না যে তাদের জন্য  আমি নিজ হাতে সৃষ্ট বস্তুদের মধ্যে সৃষ্টি করেছি গৃহপালিত জন্তু এবং তারাই এগুলোর অধিকারী? আমি এগুলোকে তাদের হাতে অসহায় করে দিয়েছি। ফলে এদের কতক তাদের বাহন এবং কতক তারা ভক্ষণ করে। তাদের জন্য এগুলোতে আছে বহু উপকারিতা আর আছে পানীয় বস্তু। (আল-কোরআন, ৩৬:৭১-৭৩)।’

মানব জাতির ন্যায় পশু-পাখিও খাদ্য-পানীয়সহ আল্লাহর অন্যান্য নিয়ামতের অংশীদার। ইসলামে তাদের প্রাপ্য অংশ প্রদানের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, একদা নবি করিম (স) এমন একটি উটের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যার অনাহারে পেট ও পিঠ একত্র হয়ে গিয়েছিল। তা দেখে মহানবি (স) বললেন, তোমরা এসব বোবা পশুর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। এদের দানাপানি দিয়ে সুস্থ-সবল রাখো ও সুস্থ-সবল পশুর পিঠে চড়ো এবং খাওয়ার সময়ও সুস্থ-সবল প্রাণীর গোশত খাও। (সুনানে আবু দাউদ- ২৫৩৯)

হজরত আবু সাইদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবি করিম (স) এক ব্যক্তির নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। লোকটি তখন একটি বকরির কান ধরে হেঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছিল। তিনি বলেন :তুমি এর কান ছেড়ে দাও এবং ঘাড় ধরো (ইবনে মাজাহ-৩১৭১)। পশু-পাখির শারীরিক নিরাপত্তা বিধানে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হজরত মুজাহিদ বর্ণনা করেন যে, হযরত ইবনে উমর (রা.) চতুষ্পদ জন্তুসমূহকে পরস্পরে লড়াই করিতে উদ্বুদ্ধ করাকে অত্যন্ত অপছন্দ করিতেন (আল-আদাবুল মুফরাদ-১২৪৯)

পশু-পাখি পরিবহনের সময় অমানবিক ও নিষ্ঠুর আচারণ করা হয়ে থাকে। এ সময় তাদের দাঁড় করানো অবস্থায় গাদাগাদি করে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে স্থানান্তর করা হয়। দীর্ঘ যাত্রায়ও তাদের খাদ্য-পানীয় থেকে দূরে রাখা হয়। ইসলাম পশু-পাখি পরিবহনের সময় পর্যাপ্ত খাদ্য, বিশ্রাম, শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের নির্দেশনা দিয়েছে। হজরত মুসা (আ) মাদয়ান থেকে তার পরিবারবর্গ ও পশুর পাল নিয়ে মিসরের দিকে যাওয়ার পথে তার লাঠির মাধ্যমে পশুপালের খাদ্যের ব্যবস্থা করেছিলেন।

ইসলাম পশু-পাখি পরিবহনের সময় সব ধরনের অনিষ্ট থেকে তাদের নিরাপত্তার নির্দেশনা দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘রাসুল (স) বলেছেন, যখন তোমরা উর্বর ভূমি দিয়ে চলাচল কর, তখন উটকে ভূমি থেকে তার পাওনা আদায় করতে দিও। আর যখন দুর্ভিক্ষগ্রস্ত ভূমি দিয়ে পথ চল, তখন তাড়াতাড়ি পথ অতিক্রম করবে এবং যখন কোথাও রাত যাপনের জন্য অবতরণ করবে, তখন পথে মঞ্জিল করবে না। কেননা, তা হচ্ছে জন্তুদের রাতে চলার পথ এবং ছোট ছোট অনিষ্টকর প্রাণীদের রাতের আশ্রয়স্থল’। (মুসলিম-৪৮২৫)

ইসলাম পশু-পাখি পরিবহনের সময় মাঝে মাঝে বিরতি দিয়ে তাদের বিশ্রামের ব্যবস্থা করে তাদের শারীরিক সুস্থতার প্রতি নির্দেশনা দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে আরেকটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা) বলেন, আমরা দুপুরের সময় যখন কোনো মঞ্জিলে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য ঘোড়া বা উটের পৃষ্ঠ হতে নামতাম, তখন এর পিঠ থেকে মালপত্র ও গদি অপসারণ করে ভারবাহী পশুকে আরামদানের পূর্বে নিজেরা কোনো নামাজ পড়তাম না।’ (সুনানে আবু দাউদ-২৫৪৩)

পশু-পাখি জবেহ করার সময়ও তাদের প্রতি অমানবিক আচরণের কারণে তাদের মৃত্যুযন্ত্রণা বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। এক পশুর সম্মুখে অন্য পশু জবাই করে শারীরিক মৃত্যুর পূর্বেই মানসিক মৃত্যু ঘাটানো হয়। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পশু-পাখি জবাই, অদক্ষ কসাইয়ের মাধ্যমে জবাই, ধারহীন অস্ত্র দ্বারা জবাই, খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জবাই ইত্যাদি কারণে মানুষের জন্য জীবন দেওয়া প্রাণীটির মৃত্যুযন্ত্রণা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। ইসলামের নির্দেশ হলো :পশু জবেহ করতে হলে অবশ্যই তাকে যতটা কম সম্ভব কষ্ট দিয়ে পূত-পবিত্রতার সঙ্গে জবেহ করা এবং জবাইয়ের সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করতে হবে।

lলেখক :সিনিয়র লেকচারার, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, উত্তরা ইউনিভার্সিটি ও পিএইচডি গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়