সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার খবরে নজর পড়ল, ভিড় এড়িয়ে বকরি ঈদের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। বাড়িতে বসে, অনলাইনে কোরবানির পশু কেনাবেচা চলছে। আফ্রিকা, মধ্যপশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একই চিত্র। ভারতের সতর্কতা অপেক্ষাকৃত বেশি। সাধারণ মানুষ আর সামাজিক নেতৃত্ব বিশেষ ভাবে সচেতন। ফোনে বাংলাদেশে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বললাম। অনেকেই জানালেন, বকরি ঈদে এবার বাড়তি আড়ম্বর হবে না। সচেতনতার পূর্বাভাস লক্ষ করছি। নিঃসন্দেহে শুভ লক্ষণ।
ভয় নয়, গুজব নয়, সতর্কতাই তাদের সুদৃঢ় সংকল্পের অবলম্বন। যেখানে যাচ্ছি, সেখানেই প্রায় একই উচ্চারণ—ঈদে এবার বাড়তি আড়ম্ব্বর নয়। কোরবানি দিতে হয়, দেব। কোরবানির মাংস প্রতিবেশীকে এবার আরো বেশি করে বিলিয়ে দেব। এটাই এবারের ঈদে উপরওয়ালার অদৃশ্য নির্দেশ। সংকটে মানুষের পাশে থেক, মানুষকে দেখ, অভুক্তকে খাবার দাও, সম্বলহীনকে পরনের পোশাক বিলাও—এরকম আদেশ আর প্রত্যাদেশকে গুরুত্ব দিতে আমরা অভ্যস্ত। এবছর একটু অতিরিক্ত।
মঙ্গলবার টানা ১৫ ঘণ্টা সফরের এই প্রাপ্তি, এই দায়বদ্ধতার বার্তা আমাকে ঘুমোতে দেয়নি। ঘুম এলো ভোরে। তার আগে, ঈদ, কোরবানির উত্স, সেমিটিক উত্সব, কৃষিজীবী মানুষের বহুমুখী উত্সবের উত্স, পারিবারিক আর সামাজিক গড়নে পালা-পার্বণের বিশ্বায়িত বিস্তার নিয়ে মর্গান, ফ্রেজার, ম্যাকস ওয়েবার, কৌসম্বির ভাবনাচিন্তার সঙ্গে খানিকটা পরিচিতি আবার খতিয়ে দেখার আগ্রহ জাগল।
দক্ষিণ-পূর্ব আর পশ্চিম এশিয়া, আফ্রিকার নানা প্রান্তেও বহু প্রস্তরবেদি আবিষ্কৃত হয়েছে, এসব বেদিতে কৃষিজীবী মানুষ একসময় তার উত্পাদিত প্রথম ফসল, পরে নরমাথা, তারপর নরবলির উচ্ছেদ ঘটিয়ে পশুকে পারিবারিক অথবা গোষ্ঠীভূত আরাধ্যের উদ্দেশে উত্সর্গ করত। সামাজিক নৃবিজ্ঞানীদের ধারণা, এসব কালোপাথরে নরবলি দেবার প্রথা আদিম সমাজে (প্রিমিটিভ সোসাইটি) বহুল প্রচলিত ছিল। পশ্চিম এশিয়াও ব্যতিক্রম নয়। পরে মানুষের বদলে পশুবলি চালু হয়। ইসলাম সরাসরি, স্পষ্টভাষায় নরবলির নিন্দা করেছে। নাকচ করেছে বাইবেলও। বাইবেল ও কোরআনে, মহাপুরুষ ইব্রাহিমের সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ ঈশ্বরের নামে বলি দেবার যে প্রতীকধর্মী গল্প প্রচলিত আছে, তাতেও প্রমাণিত হয়, নরবলির জঘন্য প্রথাকে সেমিটিকদের বিবর্তিত বিশ্বাস বরদাস্ত করেনি। ইসলাম ব্যক্তিগত সম্পদ কিংবা কোরবানির একাংশ বিলিয়ে দেবার নির্দেশ দিয়ে বোঝাতে চেয়েছে, সামাজিক দায়বদ্ধতা তার ভেতর আর বাইরের আবশ্যিক অঙ্গীকার। এ কারণেই ঈদুল আজহার সঙ্গে যে পৌরাণিক গল্প জড়িয়ে আছে, তার মর্মার্থকে প্রাসঙ্গিক করে তুলে গোত্রজাত সাম্যের মহিমাকে ইসলাম গুরুত্ব দিয়েছে। দুই ঈদের সঙ্গে সম্পৃক্ত আচার-অনুষ্ঠান, ফিতরা, জাকাত, সঙ্ঘবদ্ধ উপাসনা, আলিঙ্গন বা কোরবানি যে নিছক অনুষ্ঠান নয়, হজরত মহম্মদের (দ.) মঙ্গলবোধের জোরালো জিজ্ঞাসার প্রায়োগিক উত্তর নতুন করে ভেবে দেখা প্রয়োজন।
আরবি বর্ষের দ্বাদশ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে ঈদ উল আজহা উদ্যাপিত হয়। তিন দিনের যে কোনো দিন পরিবার অথবা প্রতিবেশীর সাত সদস্যের নামে কোরবানি স্বীকৃত, অনুমোদিত। নির্দিষ্ট পশুকে দ্রুত সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশে বলি দেবার আদেশ রয়েছে। এ ব্যাপারে একটি জনশ্রুতি প্রচলিত। তা হচ্ছে এই যে, দ্রুতগামী ঘোড়া যেভাবে টগবগ করে পুলসিরাত পেরিয়ে যায়, সেভাবে অবিলম্বে পশুকে হত্যা করতে হবে। হইচই করা চলবে না। পুল-এ-সিরাত কী? কী তার চেহারা, প্রসঙ্গত একটু বলা দরকার। চুলের চেয়ে সূক্ষ্ম, তরবারির চেয়ে ধারালো এ সেতু শেষ বিচারের দিন প্রতিটি মানুষকে অতিক্রম করতে হবে। যারা পুণ্যবান, তারা দুরন্ত ঘোড়া অথবা বিদ্যুতের গতিতে পেরিয়ে যাবেন। পাপীরা সক্ষম হবে না, পড়ে গিয়ে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে প্রবেশ করবে। বাংলা দোভাষী পুথিতে, মধ্যযুগের ফরাসি সাহিত্যে, আরবি কথকতায় এ সেতুর বিশেষ বর্ণনা আমরা দেখি। আরবদের মধ্যে এরকম সেতু চেতনা কীভাবে জন্ম নিল, তার নির্দিষ্ট উত্তর নেই। হাদিস সংকলন ‘মিশকা’তে সেতুটির উল্লেখ আছে। ই বি টেইলার তার ‘প্রিমিটিভ কালচার’ বইটিতে, এবিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
বকরি ঈদের প্রধানতম অনুষঙ্গ হজের মতো কিছু বিষয় প্রাক-ইসলামি যুগেও ছিল। মক্কা ছিল প্রায় আন্তর্জাতিক ব্যবসাকেন্দ্র (সেন্ট্রাল প্লেস, মরকজ)। বিশেষ বিশেষ সময়ে নানাপ্রান্তের মানুষ মূলত বর্ষাশেষে জিলহজ মাসে এখানে এসে উত্সবে জড়ো হতো। রমজান মাস থেকে শুরু হয়ে যেত তার প্রস্তুতি। পরে কাবাগৃহ এবং হজের ইসলামিকরণে বহুপূজার পূর্বজ আচার-অনুচার বন্ধ হয়ে গেল; কিন্তু রয়ে গেল পূর্বের স্মৃতিচিহ্ন। ইসলামের কৃতিত্ব, হজকে (হজ শব্দের অর্থ ইচ্ছা করা, কোথাও নির্দিষ্ট উদ্দেশে যাত্রা করা—(সূত্র, লিসানুল আরব, আরব শব্দ ভান্ডার) দেব-দেবীর আরাধনার বাইরে নিয়ে এসে বৃহত্তম উপাসনাময় তীর্থযাত্রায় সাজিয়ে তোলা। দ্বিতীয়ত, আমরা হজের আনুষ্ঠানিকতাকে সাধারণ মানুষের ভ্রমণ-ইচ্ছার আনুষঙ্গিক উপাদান ভেবে তার মর্মার্থকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি। কী সেটা, বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ একই ময়দানে, একই উপাসনা গৃহের সামনে এসে সমবেত হয়ে পরস্পরকে দেখছে, পর্যবেক্ষণ করছে একে অন্যের নিষ্ঠা, লক্ষ করছে পৃথক জনগোষ্ঠীর ভাষা আর তাদের আচার-আচরণ। তৃতীয়ত, কাবাগৃহের দেব-দেবীকে প্রদক্ষিণ, মারওয়া ও সাফা পর্বতের মাঝখানে প্রবাহিত ঝরনা—জমজম দর্শন, আরাফাত ময়দানে, মিনায় সবমেত হওয়া, অদৃশ্য শয়তানের উদ্দেশে পাথর নিক্ষেপ এবং চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে কালোপাথরে (হজর-এ-আসদ) প্রণিপাত করা এবং সংগঠিত, কিংবা প্রথানির্ভর সফর শেষে মাথামুণ্ডন—এরকম আরো বহু অনুষ্ঠান একসময় ইসলাম-পূর্ব আরবের সফরপর্বে পৌত্তলিকতার অন্তর্গত ছিল। গোত্রজ সাম্যকে, ধর্মীয় সাম্যের মোড়কে যে বৈষম্যহীন ব্যবস্থা (ইগেলিটারিয়ান সিস্টেম) গড়তে চেয়েছিলেন দূরদূষ্টিসম্পন্ন নবি(সঃ), তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ল হজের ভেদাভেদহীন, শ্রেণিহীন মহাসমাবেশে। মক্কায় আর্থিক আমদানিও অব্যাহত থাকল। চতুর্থত, ইসলাম আবশ্যিক হয়ে উঠল একই ধরনের আনুষ্ঠানিকতা, একই কণ্ঠের খুতবার (ভাষণ) বাধ্যতামূলক শ্রবণ। সাধারণ আরবরাও বুঝতে পারল, তাদের চিরায়ত লোকজ বিশ্বাসকে সংস্কার করেও মর্যাদা দিয়েছে ইসলামের অভিমুখ ও অলৌকিকের অন্তহীন অধীতি, যেখানে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা আর ব্যক্তিস্বরূপকে ছাপিয়ে বিশ্বরূপ বিশ্বাসিত হয়ে ওঠে। যা সব দেশের সবকালের আনুষ্ঠানিক, এমনকি সংঘবদ্ধ উপাসনা ও পর্বাচারের সচেতন, অবচেতন লক্ষ্য। যাকে, ‘মানুষের ধর্ম’ এ একমানবের সাধনা বলেছেন রবীন্দ্রনাথ। ইসলামের সংগঠিত উত্সবের, দলবদ্ধ নামাজের অভিপ্রায়ে, ইমামের খুতবা পাঠেও কি উদ্ভাসিত নয় চিরন্তন এ আকাঙ্ক্ষা? আমাদের বিশ্বাস, এটি এক অনন্ত স্রোতধারা, কবি মহম্মদ ইকবাল যে ধারার নাম দিয়েছেন জিন্দারুহ, শাশ্বত প্রবাহ। ধর্ম, দর্শন, সমাজতত্ত্ব, সামাজিক নৃতত্ত্বসহ যাবতীয় মানববিদ্যা জেনে, না জেনেও আত্মতার রহস্যের (আসরার-এ-খুদি) উন্মোচনে একই পথে ছুটছে। এ পথের শেষ কোথায়? অনন্ত জিজ্ঞাসার জবাবের খোঁজে? না অনুশাসিত, বদ্ধচিন্তার আনুগত্যে? ব্যক্তিগত পরিসরে, ধর্মের ভেতরে আর বাইরে আমরা অনেকেই এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছি, খুঁজছি ইহজাগতিকতার বহুমুখী অঙ্গনে।
n লেখক :ভারতীয় সাংবাদিক, সম্পাদক আরম্ভ পত্রিকা