গতকাল বৃহস্পতিবার পবিত্র হজ পালন করেছেন দশ সহস্রাধিক ধর্মপ্রাণ মুসলমান। তাদের মধ্যে মাত্র পাঁচ জন ছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশি। কোভিড-১৯ মহামারির এই সময়ে সৌদি আরবে এবার সীমিত পরিসরে হজ পালিত হলো স্বাস্থ্যবিধির কড়াকড়িতে নজিরবিহীন এক পরিবেশে। হজে অংশগ্রহণকারীদের ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়াননি’মাতা লাকা ওয়ালমুলক লা শারিকা লাক’- মধুর এই শব্দে মুখরিত হয় চারদিক। ভেজা নয়নে মহান আল্লাহর কাছে গোটাজীবনের পাপমুক্তির প্রার্থনা ও আত্মশুদ্ধির অঙ্গীকার করেছেন মুসল্লিরা। দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ, রহমতপ্রাপ্তি, করোনামুক্ত বিশ্ব ও নিজের গুণাহ মাফের জন্য মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে ফরিয়াদ জানান তারা।
দুপুরে সূর্য পশ্চিমাকাশে হেলে পড়ার পর বাংলাদেশ সময় ৩টা ২৫ মিনিটে আরাফাতের ময়দানে মসজিদে নামিরা থেকে খুতবা দেওয়া হয়। শেষ হয় ৩টা ৫৭ মিনিটে। খুতবা প্রদান করেন শায়খ আব্দুল্লাহ ইবনে সুলাইমান আল-মানিয়া। খুতবায় তিনি প্রাণঘাতী বৈশ্বিক মহামারি করোনা থেকে মুক্তি, গোনাহ মাফ, আল্লাহর রহমত কামনাসহ সমসাময়িক প্রসঙ্গ নিয়ে বিশ্ববাসীর প্রতি নানা নির্দেশনামূলক বক্তব্য তুলে ধরেন।
খুতবায়, মানুষের অধিকার বিশেষ নারীর অধিকার ও উত্তরাধিকার সম্পত্তি বন্টনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। সেই সঙ্গে ওয়াদাপালন, মাতাপিতার সেবা, সত্কাজের আদেশ, অসত্কাজের নিষেধ, মানবসেবা, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় নাগরিকদের সচেতন হওয়ার কথা বলেন। শায়খ মানিয়া খুতবায় কোরআনে কারিমের বিভিন্ন আয়াত ও হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে মানুষকে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ অনুসারী হওয়ার আহ্বান জানান। আরাফাতের ময়দানে করণীয়সহ হজের পরবর্তী বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেন। নামাজ, পবিত্রতা অর্জন, রোগীর সেবা, মহামারি উপদ্রুত এলাকায় প্রবেশ না করা এবং ঐসব এলাকা থেকে অন্যত্র না যাওয়ার কথা বলেন।
তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, খুব দ্রুত বৈশ্বিক এই মহামারি কেটে যাবে। আবার আগের মতো হজ ও উমরা যাত্রীদের আগমনে মুখরিত হবে পবিত্র এই ভূমি।
এ বছর পবিত্র হজের আরবি খুতবা অন্যান্য ভাষার পাশাপাশি বাংলা ভাষায়ও অনুবাদ করে সম্প্রচার করা হয়। বাংলা ছাড়া বাকি নয়টি ভাষা হলো- ইংরেজি, মালয়, উর্দু, ফার্সি, ফ্রেঞ্চ, মান্দারিন, তুর্কি, রুশ ও হাবশি।
খুতবা শেষে জোহরের নামাজের আজান দেন মসজিদের হারামের মুয়াজ্জিন শায়খ ইমাদ বিন আলি ইসমাইল। এর পর খতিব উপস্থিত হাজিদের নিয়ে দুই ইকামতে জোহর ও আসরের নামাজ আদায় করেন।
আরাফাত ময়দানে অবস্থান শেষে হাজিদের গন্তব্য মুযদালিফা। সেখানে গিয়ে মাগরিব ও এশার নামাজ এশার ওয়াক্তে একত্রে পড়বেন এবং সমস্ত রাত অবস্থান করবেন।
মিনায় জামরাতে শয়তানকে নিক্ষেপ করার জন্য ৭০টি কংকর এখান থেকে সংগ্রহ করবেন। আজ মুযদালিফায় ফজরের নামাজ পড়ে মিনার উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। ১০ জিলহজ মিনায় পৌঁছার পর হাজিদের পর্যায়ক্রমে চারটি কাজ সম্পন্ন করতে হয়। প্রথমে মিনাকে ডান দিকে রেখে হাজিরা দাঁড়িয়ে শয়তানকে (জামারা) পাথর নিক্ষেপ করবেন। দ্বিতীয় কাজ আল্লাহর উদ্দেশ্যে পশু কোরবানি করা। অনেকেই মিনায় না পারলে মক্কায় ফিরে গিয়ে পশু কোরবানি দেন। তৃতীয় পর্বে মাথা ন্যাড়া করা। চতুর্থ কাজ তাওয়াফে জিয়ারত। হাজিরা মক্কায় ফিরে কাবা শরীফ ‘তাওয়াফ’ ও ‘সাঈ’ (কাবার চারদিকে সাতবার ঘোরা ও সাফা-মারওয়া পাহাড়ে সাতবার দৌড়ানো) করে আবার মিনায় ফিরে যাবেন। মিনায় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ শেষ হলে হাজিরা মক্কায় চলে যান। আর মক্কায় পৌঁছে কাবা শরীফ তাওয়াফ করবেন তারা। এর মধ্য দিয়েই সম্পন্ন করবেন পবিত্র হজব্রত পালন। অতঃপর হাজিদের যেতে হবে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে।
পবিত্র কাবায় চড়ানো হলো স্বর্ণখচিত নতুন গিলাফ
অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে বুধবার রাতে পবিত্র কাবার গিলাফ পরিবর্তনের কাজ সম্পন্ন করেছে কাবা পরিচর্যা ও পরিচালনা কর্তৃপক্ষ। সৌদি আরবভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সাবাক নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন গিলাফ চড়ানোর কাজ শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃষ্টি আসে। তবুও কাজ বন্ধ হয়নি। কাবা শরিফের নতুন এই গিলাফে ৬৭০ কেজি খাঁটি রেশম, ১২০ কেজি খাঁটি স্বর্ণ এবং ১০০ কেজি রূপার সুতা ব্যবহার করা হয়েছে। স্বর্ণের সুতা দিয়ে গিলাফের বিভিন্ন অংশে কোরআনের আয়াত লেখা হয়েছে।