ওপাশ থেকে গোলাগুলি থেমে গিয়েছে। পালাল নাকি? আটজন মুক্তিযোদ্ধা। সেই ভোর থেকে টানা লড়ে যাছে শতাধিক পাকিস্তানি সৈন্যের বিরুদ্ধে। সকালের নাস্তা তো দূরের কথা, এক চুমুক পানিতেও ঠোঁট ভেজায়নি। সেই তখন থেকে খেতখামার-বনবাদাড়-নদীনালায়।
ঘুমটা ভেঙে যায় ভোররাতেই। গোলাগুলির আওয়াজে। ঘুমঘোরে মনে হয়েছিল, গাঁয়ে রাতে ওরা যে কুঁড়েঘরটায় আশ্রয় নিয়েছে, সেটাই বুঝি ঘেরাও হয়ে গেছে। পাকআর্মিরা তাদের উদ্দেশেই গোলাগুলি ছুড়ছে। তরাক করে লাফিয়ে ওঠে ওরা। হাতের কাছে যা পায়, তাই নিয়ে যে যার মতো প্রস্তুত হয়। পরে টের পায়, গুলির আওয়াজ আরো খানিক দূর থেকে আসছে। ওরা ঘর থেকে বেরোয়। প্রত্যেকের হাতেই হাতিয়ার।
গাঁয়ের লোকরাই খবর পৌঁছে দেয়, খানিক দূরেই ইছাপুর গ্রাম। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প। পাকবাহিনী হামলা চালিয়েছে। সেখানে লড়াই চলছে। গোলাগুলির আওয়াজ সেখান থেকেই। মুক্তিযোদ্ধাদের এই দলটা এ গাঁয়ে সদ্য এসেছে। তবু তারা সিদ্ধান্ত নেয়, তারা ইছাপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করবে। ছোট ছোট চার গ্রুপে তারা ভাগ হয়ে যাত্রা করে ইছাপুরের দিকে। কিছু ছেলেকে রেখে যাওয়া হয় এখানেই।
শাহ সাঈদ কামালের নেতৃত্বে এই দলটি ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই রওনা করে মুখে দানাপানি কিছুই মুখে না দিয়ে। পুরো এলাকা জঙ্গলাকীর্ণ। থেকে থেকে ছোটখাটো টিলা। এমন পথে যুদ্ধাভিযান কষ্টকর। তারা এর মধ্য দিয়েই এসে পৌঁছাল নদীর বাঁকে। ওপারেই ইছাপুর যাওয়ার সড়ক। গোলাগুলির আওয়াজ ভেসে আসছেই। আওয়াজটা এখন কাছাকাছি। তার মানে দুশমন কাছেধারেই। আর সড়কটাও এত কাছে যে রাইফেলের গুলির রেঞ্জের মধ্যেই পড়ে। মুক্তিযোদ্ধারা একটা ঢিবির আড়ালে অবস্থান নিয়ে শত্রুর অপেক্ষায় প্রস্তুত হয়ে রইল। খানিক বাদেই মিলল তাদের দেখা। পাকবাহিনীর পনেরো-বিশ জনের একটা দল অস্ত্র হাতে কুঁজো হয়ে সড়কের দুপাশে ঢালু জায়গা দিয়ে সার বেঁধে যাচ্ছে।
টার্গেট ঠিক করে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অধিনায়ক প্রথম গুলিবর্ষণ করলেন। এটা আক্রমণের সংকেতও। সঙ্গে সঙ্গে অন্যরাও গোলাগুলি শুরু করল।
এমন হামলার জন্য প্রস্তুত ছিল না পাকসেনারা। ভড়কে থমকে গেল। পরপরই হুড়োপাড়া করে নেমে গেল রাস্তার ঢালুতে। ক্রল করে সড়কের আরেক পাশে সরে গিয়ে অবস্থান নিয়ে তারাও পালটা গোলাগুলি শুরু করল। পাকসেনাদের কয়েকজন এর মধ্যেই হতাহত। তাদেরকে সরিয়ে নেয়া হলো। ক্রমাগত গোলাগুলিতে পর্যুদস্ত পাকসেনারা ধীরে ধীরে পিছু হটতে লাগল। তারা গ্রুপে গ্রুপে ভাগ হয়ে গ্রামের ভেতরে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে।
এমন করে বেলা গড়িয়ে এগারোটা বেজে গেছে। মুক্তিযোদ্ধারাও তাদের অবস্থান পালটে নিয়েছে। এই যোদ্ধাদের পরনে কোনো সামরিক উর্দি নেই। কারো পরনে লুঙ্গি, গেঞ্জি, হাফপ্যান্ট। গামছায় বাঁধা গোলাগুলি। কমে আসছে গুলি। তাই হিসাব করে অস্ত্রের ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতেই নাস্তানাবুদ প্রতিপক্ষ। এদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের পেটে ভোর থেকেই কোনো খাবার বা পানি পড়েনি।
এভাবেই দুপুর দুইটা পেরিয়ে গেল। ওদিক থেকে সাড়াশব্দ কম। এক-আধবার গুলি ছুটে আসছে। ওরাও হয়তো একটু বিরতি নিয়ে শক্তি সঞ্চয় করতে চাইছে। মুক্তিযোদ্ধারাও ক্লান্ত। সেই ভোর থেকে ছুটছে। শত্রুকে তাড়া করে ফিরছে। একজন আনাড়ি যোদ্ধা এক বিশাল পেশাদার প্রশিক্ষিত বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করে দিচ্ছে সামান্য ক’টা অস্ত্রে। এবার ক্লান্তি এসে যেন ভর করতে চাইছে তাদের ওপরও। এছাড়াও প্রবল ক্ষুধাও পেটে মোচড় দিয়ে যাচ্ছে।
বড়সড় একটা গাছের আড়ালে ছায়ায় বিশ্রাম নিতে বসল ওরা। খাবার নেই, শীতের আমেজে এতটুকু ঠান্ডা বাতাসেই শান্তি।
এ সময়েই দেখা গেল বয়স্কা মহিলাকে। ছুটতে ছুটতে আসছে। তাদেরই দিকে। তাঁকে দেখে ছেলেরা নড়েচড়ে বসল। একটু সতর্কও হলো। কেউ কেউ অস্ত্র হাতে উঠেও দাঁড়াল। আশেপাশে তো তেমন কোনো বাড়িঘর নজরে পড়ছে না। বনজঙ্গলের ফাঁকে ফাঁকে একআধটা বাড়ি যাও চোখে পড়ছে, সেগুলোও গোলাগুলির তোড়ে ফাঁকা। সবাই ঘরবাড়ি ফেলে নিরাপদ দূরত্বে সরে গিয়েছে। ভদ্রমহিলা কাছাকাছি আসছেন আর হাঁফাতে হাঁফাতে চিত্কার করে বলছেন : বাজানরা, তোরা একটু খাইয়া ল। খাইয়া যুদ্ধ কর।
মুক্তিযোদ্ধা সবাই অবাক হয়ে তাকাল মহিলার দিকে। ছুটে আসার জন্য হাঁফাচ্ছেন। তবু যেন তাঁর মুখে ক্লান্তির ছাপ নেই। চোখে রয়েছে এক ধরনের ব্যাকুলতা।
তিনি তাঁর পরনের শাড়ির আঁচল সরালেন। সেখান থেকে বেরিয়ে এলো দুটি গামলা। এক গামলায় ভাত। আরেক গামলায় মুরগির গোশতের তরকারি। তিনি নিজেই ভাতের গামলায় তরকারি ঢেলে নিজ হাতে মাখালেন। খাওয়ার জন্য এগিয়ে দিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের দিকে। ক্ষুধার্ত ওরাও সাগ্রহে সাদরে গ্রহণ করল সে খাদ্য। গোগ্রাসে খেতে শুরু করল।
মহিলার চোখ পানিতে ভিজে আসছে। চোখেমুখে ফুটে উঠছে মায়ের মমতা।