কোনো আলোকরেখা কি নাই?

একটি ভ্যাকসিনের জন্য সমগ্র পৃথিবী লড়িতেছে। বিভিন্ন দেশের প্রায় ১০০টি টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলিতেছে। আজ অক্সফোর্ড তো আগামীকাল যুক্তরাষ্ট্র কিংবা রাশিয়া অথবা জার্মানি আশার বাণী শুনাইতেছে সম্ভাব্য টিকার ব্যাপারে। মানুষ আশায় বুক বাঁধিতেছে। কাহারো মতে, অক্টোবরেই টিকা আসিবে, কেহ বলিতেছে ডিসেম্বর পার হইয়া যাইবে। কাহারো ধারণা, ২০২১-এর পূর্বে টিকা আসিবে না। বিল গেটস বলিতেছেন, কমপক্ষে আরো এক বত্সর লাগিবে। ঠিক আছে, লাগুক সময়, তবুও টিকা আসুক। দেখা দিক আলোর উজ্জ্বল রেখা; কিন্তু গত সোমবার ভার্চুয়াল মিটিংয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) যাহা শুনাইয়াছে তাহাতে টিকার দর্পণে চিড় ধরাটা অস্বাভাবিক নহে। হু স্পষ্ট করিয়া বলিয়াছে—হয়তো কখনই একেবারে পারফেক্ট টিকা হিসাবে কোনো ‘সিলভার বুলেট’ আসিবে না। তাই দীর্ঘস্থায়ী স্বাভাবিক জীবন পাওয়াও কঠিন। ‘হু’-এর ডিরেক্টর জেনারেল ট্রেড্রস আধানম ঘেব্রেসাস আরো তাত্পর্যপূর্ণ একটি কথা উচ্চারণ করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, হয়তো এমন কোনো ভ্যাকসিন আসিবে না, যাহা আমাদের শরীরে কাজ করে। এমনকি ভ্যাকসিন যদি আসেও, হয়তো তাহা কয়েক মাসের অধিক কোভিড হইতে আমাদের সুরক্ষা প্রদান করিবে না।

ইতিমধ্যে গত মে মাসে হু এক দফা সতর্ক করিয়া বলিয়াছে, পৃথিবী হইতে করোনা ভাইরাস হয়তো কখনোই নির্মূল হইবে না। হু-এর রোগতত্ত্ববিদ মারিয়া ভ্যান কারখোভ বলিয়াছেন—এই মহামারি পরিস্থিতি হইতে বাহির হইতে আমাদের সময় লাগিবে। এই জন্য আমাদের মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়া উচিত। ইতিমধ্যে ইউএনডিপি বলিয়াছে, কোভিড-১৯ একই সঙ্গে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও আয়ের উপর যেইভাবে আঘাত করিতেছে, তাহা একবিংশ শতকে পৃথিবীর উপর সবচাইতে বড় বিপর্যয়। ইউএনডিপি মনে করিতেছে, কোভিড-জনিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের কেবল প্রাথমিক রূপ এই পৃথিবী এখন প্রত্যক্ষ করিতেছে মাত্র। এই ব্যাপারে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বলিতেছে, পরবর্তী মাসগুলিতে বিশ্বের সকল শ্রমজীবীর মধ্যে অর্ধেক মানুষ চাকুরি হারাইতে পারে। করোনা পরিস্থিতিতে মনে হইতে পারে, হু একেক সময় একেক কথা বলিতেছে এবং তাহারা বিশ্ববাসীকে ভয় দেখানো ছাড়া কোনো আশার কথা শুনাইতে পারে না। কিন্তু ইহা তো সমগ্র বিশ্বের গবেষকরাই বলিতেছে, করোনার মতো নূতন ও জটিল ভাইরাসের রহস্য এখনো এই বিশ্বের নিকট পুরাপুরি স্পষ্ট নহে। সুতরাং যখন যেই রকম গবেষণালব্ধ তথ্য পাওয়া যাইতেছে, ততটুকু বলাটাই স্বাভাবিক। পরবর্তী হালনাগাদে কিছু পরিবর্তনও অস্বাভাবিক নহে। সাদাকে সাদা কিংবা কালোকে কালো বলায় যদি ‘ভয়’ তৈরি হয়, তাহা হইলে সেই ভাষ্য হইতে পিছাইয়া যাওয়াটাও তো স্বাভাবিক নহে। অন্ধ হইলে তো প্রলয় বন্ধ হইবে না। মিথ্যা আশার ললিত বাণী তো ‘হাওয়া’ হইতে সমাধান আনিয়া দিবে না। সুতরাং স্পষ্ট করিয়া বলা যায়, করোনাকে পাশ কাটাইয়া উটের মতো বালুর ভিতরে মুখ লুকাইয়া রাখিলে আখেরে লাভ হইবে না। বরং ইহা অনুধাবন করাটা জরুরি যে, করোনা হইতে বাহির হইয়া আসিবার পথ অনেক লম্বা এবং এই জন্য টিকসই পদক্ষেপ দরকার।