সাম্প্রতিক

করোনায় মায়ের মৃত্যু ও হাসপাতালের অভিজ্ঞতা

সশস্ত্র বাহিনীতে করোনা চিকিত্সায় যখন আমার দায়িত্ব শুরু হলো কোয়ারেন্টাইনের অংশ হিসেবে, আমার মায়ের বাড়িতে যাওয়া তখন থেকে বন্ধ। একই নগরীতে থাকি। মোবাইল ফোনে কথা হয়। তখনো করোনা ঢাকায় রুদ্ররূপ প্রকাশ করেনি। মা শুধু আমাকে নিজের নিরাপত্তার কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন। ‘চিকিত্সক হিসেবে এই ভয়াল রোগের থাবা থেকে মানুষকে বাঁচাতে লড়ার সৌভাগ্য তার সন্তান পেয়েছে’—এই আত্মতৃপ্তি মায়ের ছিল। আমি যেন বিভ্রান্ত না হই, তাই নিজের অসুস্থতার কথা খুব একটা বলতেন না। বরং আমিই তাকে স্মরণ করিয়ে দিলাম তার বয়স, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগের কথা। মা মৃদু হাসেন। উলটো আমাকে নির্ভাবনার কথা শোনান।

সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের আইসিইউতে মায়ের লাইফ সাপোর্টে থাকা পাঁচ দিন ছুঁয়েছে। তার কষ্ট হচ্ছে। কর্তব্যরত চিকিত্সক আমার দিকে প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকালেন। আমি সম্মতিসূচক মাথা নাড়ি। মা ডেডবডি ‘হয়ে গেলেন। করোনাযুদ্ধে ক্লান্ত বাবা রিলিজ হয়ে বাসায় ফিরলেন। সে সময় বোনটারও করোনার চিকিত্সা চলছে। আমার পাশে আমার একমাত্র ভাই, মামা। কাকে আমি সবার আগে বলব ‘মরিলে কান্দিস আমার দায় রে, জাদুধন!’

হয়তো নিষ্ঠুর পৃথিবী আমাকে আরো অনেক কঠিন দিনের মুখোমুখি করাবে। সেটিই জীবন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাটি কামড়ে লড়াই করাটা মা-ই শিখিয়েছেন। আমি আমার ১০ বছরের শিশুসন্তানের দিকে তাকাই। কী নির্ভরতায় তার মায়ের পাশে ঘুমাচ্ছে! কিন্তু আমার মাকে কখনোই আর ফেরত পাব না। মায়ের ডেথ সার্টিফিকেটটা যখন আমাকে তুলে দেওয়া হলো তখনো মনে হচ্ছিল এটি অন্য কারো। ভুল করে আমার কাছে চলে এসেছে। জীবন এত ছোট ক্যানে, মা? এর আগে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট চিকিত্সকরা যেদিন মায়ের সম্ভাব্য পরিণতির কথা জানিয়ে দিলেন সেদিন আমার যুদ্ধ নতুন করে শুরু হলো। যে করেই হোক, মাকে বাঁচাতে হবে। আইসিইউতে আমি মায়ের পাশে দাঁড়াই। টুকটাক কথা বলি। নিয়মিত ওষুধপথ্য খাচ্ছেন কি না জিগ্যেস করি। মা আমাকে মনে করিয়ে দেন, আমি সুপারম্যান নই। এই ছোঁয়াচে ভয়াল ব্যাধি আমারও হতে পারে। আমি কী করে চলে যাই? মা, আমি যে তোমারই স্তন্য পান করা অর্বাচীন এক সন্তান!

‘আজ কেমন আছ, মা?’ প্রশ্নের উত্তর কৌশলে এড়িয়ে করোনা আক্রান্ত আমার বাবা আর বোনের আরোগ্য সম্ভাবনার কথা তিনি উত্কণ্ঠার সঙ্গে জানতে চান। মায়ের রোগাক্লান্ত মুখচ্ছবিতে করোনাবিধ্বস্ত এক পরিবারের দুমড়েমুচড়ে ফেলা মানচিত্র দেখতে পাই। বিরলপ্রজ ওষুধ দরকার। আমি উন্মত্তের মতো মধ্যরাতে সারা ঢাকা চষে ফিরি। প্লাজমা দরকার, আমি উন্মাদ হয়ে যাই। যে করেই হোক, প্লাজমা জোগাড় করতেই হবে। নিজে চিকিত্সক হিসেবে সবকিছু বুঝলেও মায়ের চিকিত্সকদের রাতবিরেতে বারবার অধীর হয়ে ফোন করি। যখন মায়ের লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলা হলো তখন আমি মায়ের পাশে। গ্রাফগুলি আর উঠছে না, নামছে না। ফ্ল্যাট...। Our sweetest songs are those that tell of saddest thaught। আমি গ্রাফে মধুরতম সংগীতের স্বরলিপির আঁকিবুঁকি দেখতে পাই। মাকে মরচুয়ারিতে রাখা হলো। মা তো কখনো একা ঘরে থাকেননি। মাকে সিএমএইচ মসজিদে জানাজা পরানো হলো। এই তো অল্প কদিন আগেই মায়ের সঙ্গে সারা দিন কাটালাম। এক বিছানায় ঘুমালাম। তার শরীরে কেমন মা মা গন্ধ। তিনি খাটিয়াতে শুয়ে আছেন। আমি দূর থেকেও সেই মা মা সুবাসিত গন্ধ আবার পেলাম। মাকে বনানীতে সামরিক কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হলো। আমার শরীরে তখন হাজার হাতির শক্তি। মাটির জমিনে মাকে নিজ হাতে শুইয়ে দিলাম। কবর মাটি দিয়ে ঢেকে দিচ্ছি। কে বলেছে এটা কবর? এখানে মা ঘুমাবেন। ওরা কারা? যারা মায়ের লাশ রাস্তায় ফেলে পালিয়ে যায়? শিশুকালে মা গল্প বলে আমায় ঘুম পাড়াতেন। আজ আমি মাকে যুদ্ধজয়ের গল্প বলব। মা, তুমি জীবনের অনেক সময়ই জায়নামাজে কাটিয়েছ। জানো মা, মহামারির মৃত্যু সে তো শহিদের মৃত্যু। আমি সেই শহিদজননীর নাড়িছেঁড়া ধন। আমার কীসের ভয়?

n লেখক :ক্লাসিফাইড স্পেশালিস্ট ফার্মাকোলজি, আর্মড ফোর্সেস মেডিক্যাল কলেজ