বাংলাভাষার আধুনিক যুগের সৃষ্টিশীল ও মননশীল মানুষদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথকে বলা যায় ‘দানবীয় প্রতিভা’। তা না হলে একজন মানুষের মধ্যে এতগুলো গুণ কী করে সমাহূত হতে পারল? অথচ এই ‘দানবীয় প্রতিভা’র কতটুকু খোঁজ আমরা রাখি বা রাখতে চাই? স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তকের সূত্রে কয়েকটি কবিতার বাইরে কয়জন আমরা রবীন্দ্রনাথের লেখাপত্র পড়ি। বড়োজোর গোটা কয়েক রবীন্দ্রসংগীত শোনা পর্যন্তই আমাদের রবীন্দ্রভক্তির দৌড়! অনেকে তাঁর লেখা বই হয়তো কিনে ড্রয়িংরুমে সাজিয়েই রাখেন কেবল, পড়া আর হয়ে ওঠে না তাঁদের! এর কারণ হয়তো তাঁর বিষয়ে আমাদের সাধারণ বিস্ময় ও ভক্তিই খানিকটা দায়ী! কারণ ভক্তির জন্য অনুসন্ধানের প্রয়োজন পড়ে না, দরকার হয় কেবল আত্মনিবেদনের।
এ কথা ঠিক, এত বেশি কবিতা তিনি লিখেছেন যে বাংলাভাষায় তাঁর সমান বা কাছাকাছি সংখ্যক কবিতার লেখক আর কেউ আছেন কি না সন্দেহ। তাঁর রচিত গল্প-উপন্যাসের পরিমাণের কথা ভাবলেও অবাক হতে হয়! আমরা অবাক হই নাট্যকার রবীন্দ্রনাথের বৈচিত্র্য দেখলেও। প্রবন্ধকার ও গবেষক রবীন্দ্রনাথের খোঁজ তো করাই হয়ে ওঠে না! বাংলার সমবায় এবং কৃষি নিয়ে তিনি যা ভেবেছেন এবং সে ভাবনা বাস্তবায়নের প্রয়াস পেয়েছেন সে-কথা মনে করার প্রাসঙ্গিকতাই নেই আমাদের জীবনযাত্রায়। সারা জীবন ধরে তিনি অনেকগুলো পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। এর জন্য যতটা সময় ব্যয় করতে হলো তার পরেও কীভাবে এতটা বিপুল সাহিত্য সৃষ্টির অবকাশ পাওয়া সম্ভব সেটা চিন্তা করেও কুল-কিনারা পাই না আমরা।
বুড়ো বয়সে ধরলেন ছবি আঁকা। কেবল শখের আঁকা নয়; সৃষ্টির সংখ্যায়, নতুনত্বে, আধুনিকতায় ও আত্মচারিত্র্যে চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথ এতটাই উচ্চে পৌঁছে গিয়েছিলেন যে বাঙালি সেটা ঠিকমতো বুঝেও উঠতে পারেনি দীর্ঘকাল! সবারই জানা আছে, রবীন্দ্রনাথের নিজের আস্থা ছিল স্বসৃষ্ট গানের ওপর। তিনি মনে করতেন অন্যান্য সৃষ্টিকর্ম উপেক্ষিত হলেও তাঁর গান বাঙালি উপেক্ষা করতে পারবে না কখনো! এখনো তো কর্মী রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গ তোলারই সুযোগ হলো না। ভাবতে অবাক লাগে শান্তিনিকেতন তথা বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার জন্য যে বিপুল কর্মযজ্ঞ তাঁকে চালাতে হয়েছে তার পরে এত সৃষ্টিশীলতার সময় তিনি পেলেন কী করে! কেবল কর্মসূত্রেই নয়, অন্যান্য মানুষের প্রতি তাঁর সম্মানবোধ থেকে প্রায় প্রত্যেকের চিঠিরই উত্তর দিতেন। এত কিছু পেরিয়ে তাঁর বিপুল চিঠিপত্রের ভাণ্ডারের কথা তো বলবারই ফুরসত পাওয়া গেল না এতক্ষণ! বিপুল চিঠিপত্রে আমরা পাই তাঁর মমতাময়, কর্তব্যপরায়ণ, দায়িত্বশীল ও সংবেদী সত্তাকে!
বাংলা সাহিত্যের অপরাপর সমসাময়িক ও উত্তরসূরি সৃষ্টিশীলতার তিনি ছিলেন অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। খোঁজ করতে গিয়ে আবিষ্কার করেছি অন্তত দুইশতাধিক বই-সমালোচনা লিখেছেন তিনি। যে বইয়ের জন্য ন্যূনতম যতটুকু সাড়া দেয়া দরকার ততটুকু সাড়া দেয়ার দায় তিনি বোধ করেছেন। বাংলাসাহিত্যের চর্চায় নিরত সতীর্থদের প্রতি গভীর মমতা না থাকলে এত সমালোচনামূলক রচনা হয়তো সম্ভবই হতো না তাঁর পক্ষে।
এতক্ষণ রবীন্দ্রনাথের বিপুল কর্মযজ্ঞের যে সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেয়া হলো, দুচারটি গান আর কবিতার বাইরে তার খুব কম খবরই আমরা রবীন্দ্রপ্রেমিকেরা রেখে থাকি! অথচ রবীন্দ্রনাথ সাধারণভাবে কত কিছুরই না দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন আমাদের সামনে। রবীন্দ্রজন্মের ১৬০ বছর পরে এই করোনা ভাইরাসের বিশ্বব্যাপী আক্রমণের কালে ভক্তিভরে তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উদ্যাপন করলে কেবল তাই চলবে না; তাঁর সমগ্র কর্মজীবন নিয়েই ভাবতে হবে আমাদের। বুঝতে হবে তাঁর সাহিত্য কেবল ভাবলোকের সামগ্রী ছিল না, ছিল কর্মলোকেরও বিষয়। এখন করোনা ভাইরাস আমাদের জীবনযাত্রাকে কেবল স্তব্ধ করেনি, এ নিয়ে ভাববারও অবকাশ করে দিয়েছে। করোনা যেমন আমাদের মৃত্যুর মুখোমুখি করেছে তেমনি আবার হয়তো মৃত্যুভয়ের শুশ্রূষাও করবে; জাগিয়ে তুলবে আমাদের নিশ্চেতন মানবিকতাকে! করোনাকালের স্থবিরতা তাই হয়ে উঠতে পারে আমাদের চৈতন্যকে অন্বেষণের সুযোগ! এই সময়ে তাই রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি ও কর্মের বিপুলতা উপলব্ধি করে আমাদের বিস্ময়ে ভক্ত হলে কেবল চলবে না, বরং সঞ্জীবনী নিতে হবে তাঁর মানবিকতা-অভিমুখী কর্মময় জীবনের কাছ থেকে। এই অবকাশে একটু গভীরে গিয়ে ভাবতে চেষ্টা করলে হয়তো আমরা অনুভব করতে পারব যে রবীন্দ্রনাথ জীবনভর যেমন ছিলেন কর্মময়, তেমনি ছিলেন আমাদের সত্তার মানবিক আত্মশক্তির উদ্বোধক; তিনি মানবজীবনকে এক মহাপ্রকৃতির অংশ মনে করতেন বলে ছিলেন প্রকৃতির সঙ্গে সমন্বয়বাদী। বিচিত্র সত্তায় ছড়িয়ে থাকা রবীন্দ্রনাথকে জীবনের সাধারণতায় অনুভব করতে পারলে রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে ভবিষ্যতেও অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক থাকবেন। করোনাকালের সংকট ও বিহ্বলতা থেকে মুক্তির জন্য রবীন্দ্রনাথ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীর লগ্নে এভাবেও আমাদের দিতে পারেন সবচেয়ে বড় সঞ্জীবনী। তাই তাঁর ‘দানবীয় প্রতিভা’র প্রতি ভক্তি নয়, আমাদের উচিত মানবীয় সাধারণের দিকে দৃষ্টি দেয়া! তা সম্ভব হলে হয়তো আমরা কেবল অতীতের রবীন্দ্রনাথকে নয়, পাব ভবিষ্যতের রবীন্দ্রনাথকেও!