শাহাদাত স্বাধীন
বিগত সাত দশক ধরে ট্রান্সআটলান্টিক জোটে সম্পর্কের যে গভীরতা তাতে শীতলতা চলছে কয়েকবছর ধরে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন আর শর্তহীনভাবে রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সামরিক খাতে মার্কিন আধিপত্য মানতে নারাজ। বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচিত হয়ে ইউরোপ নিয়ে মার্কিনিদের আস্থার সংকট নিয়ে খোলাখুলিভাবে কথা বলেছেন। অন্যদিকে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরিতে এখন আর রাখঢাক রাখছে না।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইউরোপীয় ইউনিয়ন এমনকি যে ন্যাটো জোট গঠনকে কেন্দ্র করে আটলান্টিকের দুই পারে আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয় সে ন্যাটো সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করতে ছাড়েননি। মি. ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে একটি ক্ষয়িঞ্চু জোট এবং সময়ের আবর্তে তা ভেঙে যাবে বলে মন্তব্য করেন। তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নকে বাণিজ্য শত্রু এবং ন্যাটো সামরিক জোটকে পুরোনো ও অচল বলে দাবি করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ব্রেক্সিটকে সমর্থন করে আরো অনেক দেশ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেন। তার মন্তব্যের ধরন দেখে এটা পরিষ্কার তিনি চান ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভেঙে যাক। ইউনাইটেড ইউরোপকে আগের মতো মার্কিনিরা সামরিক, রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করার যে বাস্তবতা নেই তা হোয়াইট হাউজের উপলব্ধিতে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এসব মন্তব্য ও তাচ্ছিল্যের জবাবে ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড টুস্ক বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বন্ধু থাকলে ইউরোপের আর শত্রুর দরকার হবে না।
তবে কয়েকবছর ধরে চলে আসা অস্থিতিশীল সম্পর্কের আগুনে ঘি ঢেলেছে কোভিড-১৯ পরিস্থিতি। এই মানবিক বিপর্যয়ে যুক্তরাষ্ট্র যখন একলা চলো নীতিতে নিজ সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে তখন মেডিক্যাল সরঞ্জাম ও ডাক্তারবাহী চাইনিজ বিমান ইউরোপের ভূমিতে ল্যান্ড করেছে। সংকট নেতা তৈরি করে। কোভিড-১৯ সংকটে ইউরোপের নেতা বা বন্ধু কোনোটায় হতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র।
এর আগে থেকে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট জার্মানিকে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক প্রতিপক্ষ ও ফ্রান্সকে সামরিক বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। জার্মানিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের শত্রুরাষ্ট্র রাশিয়া থেকে গ্যাস কেনার জন্য বাল্টিক সাগরের নিচ দিয়ে পাইপলাইন নির্মাণ করছে। অন্যদিকে মার্কিনিদের বর্তমান মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ানো চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনেশিয়েটিভ (বিআরই) ইউরোপের মাটি ছুঁয়েছে। প্রথম জি-৭ দেশ হিসেবে ইতালি ও ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দায় বিপর্যস্ত অর্থনীতির দেশ গ্রিস বিআরইয়ে যুক্ত হওয়ার চুক্তি করেছে। অন্যদিকে বিআরইয়ের মার্কিন বিকল্প ‘ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি’তে খুব একটা সাড়া পায়নি হোয়াইট হাউজ। বিআরইয়ের বিকল্প হিসেবে বিআরই বিরোধী ইউরোপীয়নরা বেছে নিয়েছে জাপানকে। বিআরইয়ের বিকল্প হিসেবে অবকাঠামো, পরিবহন ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে সহায়তার জন্য জাপানের সঙ্গে চুক্তিতে উপনীত হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
ট্রান্স আটলান্টিক সামরিক জোট ন্যাটোও কার্যকর নয় আগের মতো। যে ন্যাটো জোট গঠন করা হয়েছিল রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসন থেকে ইউরোপকে রক্ষা করার জন্য সে ন্যাটোর অন্যতম সদস্য তুরস্ক রাশিয়া থেকে এস-৪০০ ক্ষেপনাস্ত্র প্রতিরক্ষা ক্রয় করেছে। ন্যাটোর জোটের সদস্য ফ্রান্স ও গ্রিসের বিরুদ্ধে অস্ত্র তাক করছে তুরস্ক। দীর্ঘদিন ধরে ন্যাটোর সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে জার্মানি ও ফ্রান্সের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মতনৈক্য তৈরি হয়েছে। এছাড়া জার্মানিসহ অনেক ইউরোপীয় দেশ রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরি করছে। ইউরোপের মার্কিন অসন্তুষ্টির আরো কারণ আছে। বিগত কয়েকবছর ধরে ট্রাম্পের নানা সিদ্ধান্ত নিয়ে অস্বস্তিতে ছিল ইউরোপের দেশগুলো। প্যারিস জলবায়ু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বের হয়ে যাওয়া, ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি না মানা, ফাইভ জি প্রযুক্তি নিয়ে মার্কিন সিদ্ধান্তকে বাড়াবাড়ি হিসেবে নিয়েছে ইউরোপীয়ানরা।
এই মুহূর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একেবারে বিভেদের দেওয়াল তুলতে চাইবে না ইউরোপ। ইউরোপীয়ানরা আসন্ন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জো বাইডেনকে বিজয়ী হিসেবে প্রত্যাশা করবে। কারণ তিনি ট্রান্সআটলান্টিক জোটের পক্ষের লোক। তবে ন্যাটোর জোটের সদস্যদের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনেক দেশের পরাশক্তির হওয়ার বাসনা, ইউরোপে চীনের বাণিজ্য বিস্তারের পরিকল্পনার ফলে ইউরোপে সামষ্টিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বিস্তারের বাস্তবতা কমে এসেছে। ফলে CENTO SEATO সামরিক জোটের ন্যাটো জোটও হয়তো সময়ের ব্যবধানে বিলীন হয়ে যেতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপে একক দেশ হয়ে বন্ধু তৈরির মিশনে নামতে পারে। আর ইউরোপীয়নরা রাশিয়ার গ্যাস, চীনের বিনিয়োগ, মার্কিন বন্ধুত্ব, নিজেদের অধিকতর রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করে একক সুপার পাওয়ারের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর উদ্যোগ নিবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়