ডারউইনের ক্রমবিবর্তনবাদ ও ইসলামি চিন্তাধারা

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন বিভিন্ন স্তরে স্তরে, পর্যায়ক্রমে।’ (আল কোরআন, সুরা নুহ, ১৪)। ‘তিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন তোমাদের মাতৃগর্ভে পর্যায়ক্রমে একের পর এক ত্রিবিধ অন্ধকারে।’ (সুরা যুমার, ৬)। ‘অতঃপর আমি তাকে এক নতুন সৃষ্টিরূপে দাঁড় করেছি।’ (সুরা মুমিনূন, ১৪)। অন্যদিকে হাদিস শরিফে বলা হয়েছে, ‘৪২ দিন পর ফেরেশতা এসে ভ্রূণকে মানবীয় আকৃতি দান করেন এবং তার কান, চোখ, ত্বক, গোস্ত ও হাড় সৃষ্টি করেন’ (সহিহ মুসলিম)। এভাবে কোরআন মজিদ ও হাদিসের অসংখ্য তথ্য দ্বারা প্রমাণিত হয়, মানুষ তার নিজস্বরূপে পৃথিবীতে আসে। অথচ চার্লস ডারউইন (১৮০৯-১৮৮২) জীবের রূপান্তরের জন্য প্রাকৃতিক নির্বাচন (Natural selection) নীতির কথা উল্লেখ করেছেন। তার মতে, পৃথিবীর সকল জীব প্রাকৃতিকভাবে টিকে থাকা এবং তাদের বংশবৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে উপযুক্ত হওয়ার সমান যোগ্যতা রাখে না। যাদের যোগ্যতা বেশি তারাই প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকে। অন্যদিকে জীবের শারীরিক পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও রূপান্তরও ঘটেছে ঐ একই প্রক্রিয়ায়।

প্রাকৃতিক নির্বাচনের যে পদ্ধতির কথা বলা হয়, তাতে এ ধরনের ব্যতিক্রম শুধু অনুচিত নয় বরং অসম্ভব। বিশেষত কোনো প্রাণী-প্রজাতি কিংবা কোনো উদ্ভিদের এমন কোনো উন্নতি বা বিস্তৃতি অসম্ভব, যা দ্বারা সংশ্লিষ্ট প্রাণী বা উদ্ভিদ প্রজাতির ক্ষতি সাধন হতে পারে। একশ্রেণির ‘দেওদার’ নামক গাছে এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থের সৃষ্টি হয়। ঐসব রাসায়নিক পদার্থ এমন সব পোকামাকড় আকৃষ্ট করে, যার ফলে সংশ্লিষ্ট গাছটির ধ্বংস ত্বরান্বিত হয়। এ রাসায়নিক পদার্থের সৃষ্টিই সংশ্লিষ্ট গাছটির মৃত্যুর জন্য দায়ী। কিন্তু লক্ষণীয় যে, কোটি কোটি বছর যাবত্ এ ধারা অক্ষুণ্ন রয়েছে। একইভাবে প্রকৃতির নির্বাচন ফার ও পাইনজাতীয় গাছপালাকেও পোকামাকড়ের হাত থেকে রক্ষা করতে পারছে না।

‘অ্যান্টিলোপ’ হরিণ তার দ্রুততার জন্য অনায়াসেই শত্রুর কবল থেকে রক্ষা পেতে পারে। কিন্তু এদের মধ্যেই একশ্রেণির হরিণ আছে, যাদের নাভিতে সৃষ্টি হয় এমন এক সুগন্ধি, সেই হরিণ যতদূর যায়, ততদূর তার রেশ রেখে চলে। শিকারিরা এ কস্তুরী বা মৃগনাভির সুগন্ধি অনুসরণ করে সহজেই তাদের ঘায়েল করে থাকে। সুতরাং ডারউইনের থিওরি সত্য বলে বিশ্বাস করলে এও বিশ্বাস করতে হয় যে, এ শ্রেণির হরিণ এত দিনে নির্বংশ হয়ে গেছে। কিন্তু তা মোটেও সত্য নয়। এর আরো উদাহরণ বিদ্যমান। যেমন—একশ্রেণির প্রাণী-প্রজাতির মাথায় বিরাটাকার শিং গজিয়ে থাকে। এসব শিং নিঃসন্দেহে তাদের দ্রুতগতির পথে প্রতিবন্ধক। অথচ এ যুগেও আমরা একশ্রেণির হরিণের মাথায় এমন শাখাযুক্ত শিঙের কথা জানি, যা তাদের জঙ্গলের চলাফেরায় নিঃসন্দেহে বাধা সৃষ্টি করে থাকে।

‘কোয়েলাক্যান্থের’ (একধরনের মাছ) ওপর জীববিজ্ঞানীরা যে গবেষণা চালিয়েছেন, সেসব গবেষণার ফলাফল দেখে তারা নিজেরাই বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়েছেন। তারা দেখতে পেয়েছেন ডারউইনের থিওরির সম্পূর্ণ বিপরীত ধারায় এ শ্রেণির মাছ শুধু টিকে যায়নি বরং লক্ষ-কোটি বছর যাবত্ এ শ্রেণির মাছ তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও অটুট রেখে চলেছে। ডারউইনের থিওরি তথা ন্যাচারাল সিলেকশনের ধারা যদি সত্য হতো, তাহলে এ শ্রেণির মাছের চরিত্রগত যাবতীয় বৈশিষ্ট্য বিলুপ্ত হতো এবং তারা নিজেরাও ভিন্ন শ্রেণির মাছ কিংবা অন্য প্রাণীতে রূপান্তরিত না হয়ে পারত না। অথচ এ মাছের গঠনকাঠামো এ প্রমাণই সাব্যস্ত করেছে যে, এ শ্রেণির মাছ টিকে রয়েছে এবং লক্ষ-কোটি বছর যাবত্ এ শ্রেণির মাছের মধ্যে তেমন কোনো পরিবর্তন সাধিত হয়নি। বলা আবশ্যক যে, অনেক বিজ্ঞানী-গবেষকই তাদের গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষায় ডারউইনের তত্ত্বের বিপরীতে ভূরি ভূরি তথ্য ও প্রমাণ পেয়েছেন। ঐসব তথ্য ও প্রমাণ খুঁটিয়ে দেখতে গেলে দেখা যাবে, প্রাণিজগতের গঠনকাঠামোর পরিবর্তন কখনোই এক বা অভিন্ন নয়। তাছাড়া কোন পরিবর্তনটি যে সংশ্লিষ্ট প্রাণিজগতের জন্য ক্ষতিকর আর কোনটি যে তাদের টিকে থাকার জন্য অনুকূল তা নির্ণয় করাও এক দুঃসাধ্য ব্যাপার। 

lলেখক :রেডিও-টিভির ধর্মীয় আলোচক, উপস্থাপক, আলেম ও কলেজ প্রভাষক