বন্যা ও সহমর্মিতা

নদীবিধৌত ভাটির দেশে বন্যা স্বাভাবিক। করোনাকালে বন্যা নতুন বিপর্যয়ের জানান দিচ্ছে। মিশছে বন্যার ঘোলা জলে দুর্গত মানুষের চোখের নোনা জল, ডুবেছে মানুষ ও মানবতা।

‘ভূমিতে ও পানিতে সব জায়গায়,

লোকজন কুকাজে অশান্তি ছড়ায়

যেরূপ কাজ ওরা থাকে করিতে,

আল্লাহ চান তার শাস্তি দিতে...’

(কাব্যানুবাদ রূপ :৪১)।

পবিত্র কোরআন ও প্রাচীন সুত্রে ‘সাবা জাতি’ ও ‘নূহের বন্যা’র বর্ণনা রয়েছে। দক্ষিণ আরবের সমৃদ্ধ জনগোষ্ঠী ‘সাবা’। সুরা ‘সাবা’য় এদের অবাধ্যতা ও পরিণতির খোঁজ মেলে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সাবা অধিবাসীদের জন্য তাদের বাসভূমিতে ছিল এক নিদর্শন। দুটি উদ্যান—একটি ডানে, অন্যটি বাম দিকে... তারপর তারা অবাধ্যতা করল, ফলে আমি তাদের ওপর প্রেরণ করলাম প্রবল বন্যা। আর তাদের উদ্যানদ্বয়কে পরিবর্তন করে দিলাম এমন দুই উদ্যানে, যাতে উদ্গত হয় বিস্বাদ ফলমূল, ঝাউগাছ এবং সামান্য কুলবৃক্ষ’ (সাবা :১৫, ১৬)। নদীশাসন, নগরায়ণ, বিপণিবিতান, পর্যটন ইত্যাদিতে ওরা চরম উন্নতি করে এবং সেচের সুবিধা ও উন্নত চাষাবাদ, নগর সুরক্ষার জন্য নির্মাণ করেছিল শক্তিশালী বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ। তবু ওদের পেয়ে বসে অনাচার ও অবাধ্যতার অসুখ। মহান আল্লাহ্ সাবা জাতির হেদায়েতের জন্য ১৩ জন নবি পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সব ছিল বিফল, ব্যর্থ প্রয়াস। এ জন্য আল্লাহ্ পাঠিয়ে দিলেন ‘ইঁদুরবাহিনী’। ইঁদুর আল্লাহর হুকুমে বাঁধ কেটে দিলে জোয়ারের পানিতে ওদের সব সাফল্য ও দম্ভ তলিয়ে গেল।

একজন বিশিষ্ট নবি নূহ (আ)। পবিত্র কোরআনে তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে ৪৯ বার এবং একটি সুরার নাম ‘নূহ’। প্রায় হাজার বছর আয়ুষ্কালে তিনি মানুষের হেদায়েতে সচেষ্ট থাকলেও তা ছিল প্রায় নস্ফিল। মাত্র ৪০ জোড়া  ‘সামানিন’ (৮০ জন ) নরনারী তার চেষ্টায় ইসলামের সুশীতল ছায়ায় সমবেত হন। অন্যরা সবাই নূহ (আ)কে অতিষ্ঠ করে ছাড়লে মহান আল্লাহ ঐ অবাধ্য সম্প্রদায়কে বন্যার কড়াল গ্রাসে নিঃশেষ করে দেন। মহান আল্লাহ নূহ (আ)কে বন্যার পূর্বাভাস দিলে তিনি দীর্ঘ শ্রম ও সময়ে বিশাল নৌকা তৈরি করলেন। মহান আল্লাহ্ বলেন, ‘তারপর মহাপ্লাবন ওদের গ্রাস করে। কারণ ওরা ছিল সীমা লঙ্ঘনকারী। তারপর আমি তাকে ও যারা জাহাজে উঠেছিল তাদের রক্ষা করলাম’ (আনকাবুত :১৩, ১৪)। প্রবল বর্ষণ ও পানির তোড়ে পাহাড়, নদী, জনপদ একাকার হয়ে গেল। কারো আর এই মহাপ্লাবন থেকে নিষ্কৃতির উপায় থাকল না। মহান আল্লাহর ইচ্ছায় ঐ ভাগ্যবান ‘৪০ জুটি’ এবং রক্ষা পেল শুধু নূহের নৌকায় স্থান পাওয়া প্রাণি-উদ্ভিদকুল। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি প্রবল বৃষ্টি বর্ষণ করে খুলে দিলাম আকাশের দরজা এবং মাটি থেকে ফোটালাম ফোয়ারা। তারপর আকাশ ও পৃথিবীর পানি পরিকল্পিতভাবে একাকার হয়ে গেল। তখন আমি নূহ (আ)কে চড়ালাম এক জাহাজে...’ (কামার :১১-১৩৪)। বর্ণিত আছে, ২ রজব থেকে ১০ মহররম পর্যন্ত ছয় মাস আট দিনের বন্যার বিপর্যয়ের পর শেষে পাহাড়ের চূড়া ভাসতে লাগল, আস্তে আস্তে নূহের নৌকা ‘জুদি’ পাহাড়ে ভিড়ল। এই বন্যার বিপুলতা প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি ওদের ঢেউ-তাড়ানো আবর্জনার মতো করে দিলাম’ (মুমিন :৪১)।

বন্যার্ত, বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের আদর্শ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা আল্লাহর প্রেমে উজ্জীবিত হয়ে দরিদ্র, ইয়াতিম ও বন্দিদের খাদ্য দান করে’ (দাহার :০৮)। আর্তমানবতার সেবায় উত্সাহ দিয়ে প্রিয় নবি (স) বলেন, ‘মানুষের মধ্যে সে-ই উত্তম, যার দ্বারা মানবতার কল্যাণ সাধিত হয়।’ পরিশেষে আহ্বান, আসুন যার যেটুকু সামর্থ্য আছে, তাই নিয়ে বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়াই এবং মানবিক দায়িত্ব পালন করি।

lলেখক :সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, কাপাসিয়া, গাজীপুর