হালনাগাদ থাকিবার বিষয়টি প্রতিদিনের

প্রতারকরা সাধারণত অত্যন্ত চৌকশ হইয়া থাকে। প্রতিনিয়ত নিত্যনূতন কৌশল অবলম্বন না করিলে প্রতারণার কাজ দীর্ঘদিন ধরিয়া করা সম্ভব নহে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির এই সময়ে দেখা যাইতেছে, প্রতারকরা সময়ের তুলনায় অভিনব কৌশলের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতাইয়া লইতেছেন। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করিয়া ভুয়া লটারি, বিদেশে উন্নত চাকুরি ও মূল্যবান সামগ্রী দেওয়ার প্রলোভনসহ নানা কৌশলে প্রতারণার ফাঁদ পাতিয়া চলিয়াছে সংঘবদ্ধ দেশি-বিদেশি প্রতারক চক্র। এই ধরনের প্রতারণার শিকারে পরিণত হওয়া মানুষের সংখ্যা নিতান্ত কম নহে।

গত মাসে বিবিসির একটি প্রতিবেদন হইতে জানা যায়, ফেসবুকের মাধ্যমে প্রতারণা করিয়া কয়েক কোটি টাকা হাতাইয়া লইবার অভিযোগে এক ডজন বিদেশিকে গ্রেফতার করিয়াছে বাংলাদেশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। প্রথমে এই সকল ব্যক্তি বিপরীত লিঙ্গের কোনো ব্যক্তির সহিত ফেসবুকের মাধ্যমে বন্ধুত্ব করে। ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে গিফট পার্শেল বুক করিবার এয়ারলাইন্স বুকিং ডকুমেন্টও পাঠায়। কোনো কোনো প্রতারণার ঘটনায় কয়েক মিলিয়ন ডলার মূল্যমানের সামগ্রী পাঠানোর কথা বলা হয়। ইহার পরে এই বিদেশি প্রতারকদের বাংলাদেশি সহযোগী কাউকে কাস্টমস কমিশনার পরিচয় দিয়া ঐ ব্যক্তিকে পার্শেলের শুল্ক বাবদ মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যাংকে জমা দিতে বলে। গিফট গ্রহণ করা না হইলে আইনি জটিলতারও ভয় দেখানো হয়। অতঃপর ভুক্তভোগীর নিকট হইতে কয়েক লক্ষ টাকা ভুয়া শুল্ক বাবদ আদায় করিয়া নেওয়া হয়। ইহা ছাড়াও দীর্ঘদিন ধরিয়া পোশাকশিল্পসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ের আড়ালে প্রতারকরা বাংলাদেশি ও বিদেশি নাগরিকদের যোগসাজশে বিচিত্র প্রতারণামূলক কাজ করিয়া বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে টাকা আত্মসাত্ করিয়া আসিতেছে। কিছু দিন পূর্বে গ্রেফতার হওয়া এক নাইজেরীয় প্রতারকচক্রের সদস্যদের নিকট হইতে জানা যায়, প্রথমে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির সহিত ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাহারা বন্ধুত্ব তৈরি করে। তাহাদের বা তাহার পিতার মিলিয়ন মিলিয়ন অর্থ আছে ব্যাংকে—এই টোপ দেয়। বাংলাদেশে তাহারা সেই টাকা বিনিয়োগ করিতে চাহে। তাহারা ফাঁদ পাতিয়া বাংলাদেশি বন্ধুকে বলে যে, তোমার শ্রম আর আমার টাকা। পরবর্তীকালে সেই টাকা তুলিতে গেলে বলা হয়, ইহার জন্য কিছু টাকা দিতে হইবে। এইভাবে সরল বিশ্বাসে টাকা দিয়া অনেকেই প্রতারণার শিকার হইয়াছেন।

আমরা দেখিয়াছি, যেই সকল ব্যক্তি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটনে আধুনিক প্রযুক্তির আশ্রয় লইতেছেন তাহাদের চিহ্নিত করিবার কাজটি সকল সময় সহজে করা সম্ভব হয় না। কিছু প্রতারক মোবাইল ফোন নম্বর স্পুফিং করিয়াও বিভিন্ন ব্যক্তির সহিত প্রতারণা করিয়া যাইতেছে। এই সকল অপরাধীকে দ্রুত চিহ্নিত করিতে হইলে আমাদের দেশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকেও প্রতিনিয়ত হালনাগাদ থাকিতে হইবে। প্রযুক্তিবিশ্ব প্রতিনিয়তই লাফাইয়া লাফাইয়া প্রসারিত হইতেছে। আমাদেরও তাহার সহিত তাল মিলাইয়া চলিতে হইবে। এই মুহূর্তে আপডেট থাকা মানে সমগ্র বত্সর আপডেট থাকা নহে। ইহা প্রতিক্ষণ প্রত্যেকটি ধাপে আপডেটেড থাকিবার বিষয়। ইহার ব্যত্যয়ে আমাদের দেশে অপরাধ করিয়া অনেক অপরাধীই পার পাইয়া যাইবেন—ইহা মানিয়া লওয়া যায় না।