সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলায় টেকনাফ থানার প্রত্যাহারকৃত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, পরিদর্শক লিয়াকত আলী ও উপপরিদর্শক নন্দলাল রক্ষিতকে সাত দিন করে র্যাবের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। বাকি চার পুলিশ সদস্যকে কারা ফটকে জিজ্ঞাসাবাদ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গতকাল জ্যেষ্ঠ হাকিম হেলাল উদ্দিনের আদালত এ আদেশ দেয়। গতকাল চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) হেডকোয়ার্টার এলাকা থেকে ওসি প্রদীপকে গ্রেফতারের পর কক্সবাজার আদালতে আনা হয়। এর আগে জেলা পুলিশ লাইনস থেকে আদালতে আনা হয় মামলায় অপর অভিযুক্তদের মধ্যে ছয় জনকেও। আদালত অভিযুক্ত সবাইকে প্রথম শুনানিতে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ এবং পরবর্তী শুনানিতে রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর করে। পলাতক দুই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
কারাগারে যাওয়া আসামিরা হলেন পরিদর্শক লিয়াকত আলী, পরিদর্শক প্রদীপ কুমার দাশ, এসআই দুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং এএসআই লিটন মিয়া।
এর আগে অভিযুক্ত বাকি দুই আসামি এসআই টুটুল ও কনস্টেবল মো. মোস্তফা পলাতক বলে জানান কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পিপি ফরিদুল আলম।
গতকাল বিকাল সোয়া ৪টার দিকে কয়েকটি গাড়িতে করে কঠোর নিরাপত্তায় কক্সবাজার জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের নিচে অবস্থিত আদালত এলাকায় আনা হয় মামলার প্রধান আসামি পরিদর্শক লিয়াকতসহ ছয় আসামিকে। চট্টগ্রাম থেকে ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে আদালতে আনা পর্যন্ত তাদের রাখা হয় আদালত হাজতখানায়। এসময় পুরো আদালত এলাকা পুলিশ ঘিরে রাখায় সাধারণ মানুষ দূরে থাক, সাংবাদিকরা অভিযুক্তদের রাখার স্থান কিংবা গাড়ি থেকে নামানোর কাছাকাছি পর্যন্ত যেতে পারেননি। এরপর বিকাল ৫টার দিকে কক্সবাজার আদালত এলাকায় এসে পৌঁছায় ওসি প্রদীপকে বহনকারী সিএমপির গাড়ি। তার সঙ্গে ছিল কয়েকটি গাড়ির বহর। ওসিকে কর্ডন করে কঠোর নিরাপত্তায় নামিয়ে দ্রুত হাজতখানায় নেওয়া হয়।
বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে অভিযুক্তদের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতের বিচারক হেলাল উদ্দিনের আদালতে হাজির করা হয়। অভিযুক্তদের পক্ষে আইনজীবী মোহাম্মদ জাকারিয়া ও রাখাল মিত্র জামিন আবেদন উপস্থাপন করেন। এর বিরোধিতা করেন রাষ্ট্রপক্ষে কোর্ট ইন্সপেক্টর প্রদীপ ও পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ফরিদুল আলম। দীর্ঘ শুনানিশেষে তাদের জামিন নামঞ্জুর করে অভিযুক্তদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশনা দেন হাকিম হেলাল উদ্দিন।
পরে মামলার তদন্তকারী সংস্থা র্যাব-১৫ এর কর্মকর্তারা এসে আসামিদের বিরুদ্ধে রিমান্ড আবেদন করেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বিচারক আবারও এজলাশে এসে রিমান্ড শুনানি শুরু করেন। এরপর আসামিদের কারাগারে নেওয়ার প্রস্তুতি চলে।
এসময় কক্সবাজার আদালত চত্বরে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থার উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
আসামিদের আদালতে আনার খবরে অসংখ্য মানুষ ভিড় করেছে আদালত চত্বরে।
এর আগে আদালতের নির্দেশে বুধবার রাত ১০টায় টেকনাফ থানায় মেজর (অব.) সিনহার বোনের করা হত্যা মামলাটি নথিভুক্ত হয়। ঐ দিন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৩, টেকনাফের বুধবার দায়িত্বপালন করা বিচারক তামান্না ফারহার আদালতে অভিযোগ দায়ের করেন সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস। পরে আদালত ৩০২/২০১ ও ৩৪ ধারায় করা ফৌজদারি দরখাস্তটি টেকনাফ থানাকে মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করার নির্দেশ দেন। এছাড়া বাদীর আবেদনের প্রেক্ষিতে মামলাটির তদন্তভার কক্সবাজারস্থ র্যাব-১৫ এর অধিনায়ককে দিতে সুপারিশ করা হয়।
সিনহার বোনের দায়ের করা মামলায় বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইন্সপেক্টর লিয়াকতকে প্রধান আসামি ও টেকনাফ থানার প্রত্যাহারকৃত ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে দ্বিতীয় আসামি করার পাশাপাশি অভিযুক্ত হয়েছেন বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের উপপরিদর্শক (এসআই) নন্দ দুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) লিটন মিয়া, উপপরিদর্শক (এসআই) টুটুল ও কনস্টেবল মোহাম্মদ মোস্তফা।
গত ৩১ জুলাই রাত পৌনে ১০টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্র ও মাদক উদ্ধারের কথা জানিয়ে সে সময় পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, সিনহা তার পরিচয় দিয়ে ‘তল্লাশিতে বাধা দেন’। পরে ‘পিস্তল বের করলে’ চেকপোস্টে দায়িত্বরত পুলিশ তাকে গুলি করে। এ ঘটনায় পুলিশ মামলাও করে।
তবে পুলিশের এই ভাষ্য নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও প্রশাসনের প্রতিনিধি নিয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এদিকে সিনহাকে হত্যা করা হয়েছে দাবি করে বুধবারই কক্সবাজারের আদালতে মামলা করেন তার বোন শারমিন। এজাহারে তিনি অভিযোগ করেন, ওসি প্রদীপের ফোনে পাওয়া নির্দেশে বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের এসআই লিয়াকত আলী গুলি করেছিলেন সিনহাকে। আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় ‘ইচ্ছাকৃত নরহত্যা’, ২০১ ধারায় আলামত নষ্ট ও মিথ্যা সাক্ষ্য তৈরি এবং ৩৪ ধারায় পরস্পর ‘সাধারণ অভিপ্রায়ে’ অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে ৩০২ ধারার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। ঘটনার সময় সিনহার সঙ্গে থাকা সাহেদুল ইসলাম সিফাতকে মামলার প্রধান সাক্ষী করা হয়েছে। এছাড়া আট জন স্থানীয় বাসিন্দা এবং আইয়ুব আলী নামে এক জন সার্জেন্টকে সাক্ষী করা হয়েছে এ মামলায়।
এ ঘটনায় বুধবার দুপুরে সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ ও পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ কক্সবাজারে যান। তারা কক্সবাজার সৈকতে অবস্থিত সেনাবাহিনীর রেস্টহাউজ জলতরঙ্গতে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন। পরে সেখানে তারা যৌথ সংবাদ সম্মেলনে সিনহার নিহত হওয়াকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে উল্লেখ করেন। তারা বলেন, সেনাবাহিনী ও পুলিশের মধ্যে দূরত্ব নেই। আর এ ঘটনায় দুই বাহিনীর মধ্যে চিড় ধরবে না।
সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ বলেন, সিনহার মৃত্যু নিয়ে বাংলাদেশের দুটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর মধ্যে যাতে কোনো ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ যে ঘটনাটি ঘটেছে, তাতে কোনো প্রতিষ্ঠান দায়ী হতে পারে না। তদন্ত কমিটি যাদের দোষী সাব্যস্ত করবে, অবশ্যই তাদের প্রায়শ্চিত্ত পেতে হবে। এ জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান তাদের সহযোগিতা করবে না।
অন্যদিকে সংবাদ সম্মেলনে আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, টেকনাফে যে ঘটনাটি ঘটেছে সেটির কারণে দুই বাহিনীর মধ্যে সম্পর্কের কোনো ব্যত্যয় ঘটবে না। আমাদের লক্ষ্য হবে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গঠিত যৌথ তদন্ত কমিটিকে প্রভাবমুক্ত পরিবেশে তদন্ত করতে সাহায্য করা। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী পরবর্তী আইনি কার্যক্রম পরিচালিত হবে এবং সেটাই গ্রহণ করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও মঙ্গলবার সিনহার মা নাসিমা আখতারকে ফোন করে সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের আশ্বাস দেন। এ ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা করে নিহত সিনহার সফরসঙ্গী সিফাত ও সুপ্রাকে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ।