পৃথিবী বদলে গেছে

মজিবর রহমান চৌধুরী মুকুল

 

করোনা পরিস্থিতির কারণে পৃথিবী অনেকটাই বদলে গেছে। অবশ্য প্রকৃতি বদলায় নাই; বদলেছে মানুষের জীবনাচরণ। মানুষ সহজে কেউ কারো কাছে ঘেঁষে না। হাত মিলায় না। আপনজনকে অনেকদিন পর দেখেও দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে না। আগে মানুষ টিভিসেটের সামনে বসে খবর, টকশো, নাটক ইত্যাদি দেখত। এখন শুনতে চায় করোনাসংক্রান্ত আপডেট। কখন শুনবে, আজ কারো মৃত্যু হয়নি। অমুক ওষুধে ভীষণ কাজ হচ্ছে। কিন্তু না, সুসংবাদ নেই। শুধু করোনা ও আক্রমণের খবর আর সাবধানতা অবলম্বনের পরামর্শ। আজ কোনোকিছু ছুঁতেও ভয় লাগে।

করোনা-রোগীদের প্রধান সমস্যা দেখা দেয় অক্সিজেনের। অক্সিজেনের মধ্যে ডুবেও আমরা অক্সিজেন পাই না। যেমনটা ST. Coleridge তাঁর কবিতায় লিখেছিলেন—

Water, Water, Water everywhere water.

But there is no water to drink.

তিনি সমুদ্রের পানির কথা বলেছিলেন, যেখানে প্রচুর পানি থাকা সত্ত্বেও পানের উপযোগী পানি একফোঁটাও নেই। তেমনি প্রকৃতিতে অক্সিজেন অনেক, কিন্তু অক্সিজেন নিতে পারে না। বাতাসে ভেসে বেড়ানো করোনা ভাইরাস কী সুন্দর দালানকোঠা, গাছপালা না ভেঙেই মানুষের সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছে! করোনা অবশ্য কিছু কিছু মানুষের মনে অনেকখানি পরিবর্তন এনে দিয়েছে। অনেককে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো শিখিয়েছে। করোনাকালীন কিছু মানবিকতার গল্প শুনে যেমন মন ছুঁয়ে যায়, তেমনি নেতিবাচক ঘটনার খবর শুনে হূদয় বড়ই ব্যথিত হয়। যখন মার্কিন শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়িডের ঘাড় পা দিয়ে চেপে ধরেছিল আর ফ্লয়িডের দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল তখন ফ্লয়িড বলেছিলেন, I can’t breathe অর্থাত্ আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না। করোনা-রোগীরা যাঁরা জটিল পর্যায়ে পৌঁছান, তাঁরাও ঠিক ডাক্তারকে ঐ কথাই বলেন—আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না।

করোনার কারণে বিশ্বে আজ মানুষের মন-মানসিকতার কিছুটা পরিবর্তন হলেও কৃষ্ণাঙ্গ-শ্বেতাঙ্গদের দ্বন্দ্বের শেকল আজো ছিঁড়ছে না। শ্বেতাঙ্গ বলতে আমরা সাধারণত ইউরোপিয়ানদের বুঝে থাকি। যারা জ্ঞান-বিজ্ঞানে অগ্রসর। কৃষ্ণাঙ্গদের আবাস আফ্রিকা মহাদেশ, যা একদা অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ নামে পরিচিত ছিল। কৃষ্ণাঙ্গরা ছিল শিক্ষা-দীক্ষায়, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পশ্চাত্পদ। রবীন্দ্রনাথের ‘আফ্রিকা’ কবিতায় তাঁরই বর্ণনা—

‘হায় ছায়াবৃতা, 

কালো ঘোমটার নিচে

অপরিচিত ছিল তোমার মানবরূপ’

এরপর শ্বেতাঙ্গরা সমুদ্রপথ আবিষ্কার করে এলো আফ্রিকায়। অত্যাচার-নিপীড়নের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেছিল অমানবিকতাকে। ঐ আফ্রিকা কবিতায়ই বলা আছে—

‘নগ্ন করল আপন নির্লজ্জ অমানুষতা।

তোমরা ভাষাহীন ক্রন্দনে বাষ্পাকুল অরণ্যপথে

পঙ্কিল হলো ধুলি তোমার রক্তের অশ্রুতে মিশে,

দস্যু-পায়ের কাঁটা-মারা জুতোর তলায়,

বীভত্স কাদার পিণ্ড

চির চিহ্ন দিয়ে গেল তোমার অপমানিত ইতিহাসে’  

শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গদের শ্বাশ্বত স্নায়ুযুদ্ধকে উপেক্ষা করে শ্বেতাঙ্গ সুজান আর কৃষ্ণাঙ্গ পোর্টারের যখন বিয়ে হয়েছিল, তখন ধরিত্রীতে শান্তির সুবাতাস বয়ে গিয়েছিল এবং তাঁরা পালটিয়ে দিয়েছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ-শ্বেতাঙ্গ বিরোধের ইতিহাস। বিয়ের পরে সুজান ও পোর্টার বলেছিলেন, A lot of heavens will come down and Africa will be saved অর্থাত্ অনেক স্বর্গ নেমে আসবে আর আফ্রিকা হবে নিরাপদ।

আমাদের এই পৃথিবী করোনামুক্ত, কৃষ্ণাঙ্গ-শ্বেতাঙ্গ বিরোধমুক্তসহ সমস্ত বিরোধমুক্ত হয়ে এক নিরাপদ আবাসভূমিতে পরিণত হোক।

নীলফামারী