হাওরের সৌন্দর্য ও সংকট

চয়ন বিকাশ ভদ্র

 

হাওর হচ্ছে এক বিস্তৃত জলমগ্ন কিংবা জলশূন্য ভূমি কিংবা নিম্ন জলাভূমি। সাগর থেকে সায়র এবং সায়র থেকে হাওর শব্দের উত্পত্তি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। হাওরগুলোকে বর্ষা মৌসুমে সাগরের মতো মনে হয় এবং অন্য কোনো মৌসুমে শুধু ফসলের মাঠ। বিস্তীর্ণ জলরাশিতে বর্ষা মৌসুমে দ্বীপের মতো দাঁড়িয়ে থাকা ঘরবাড়িগুলো যেমন চোখ জুড়ানো দৃশ্যপট তৈরি করে, তেমন শীতের কুয়াশায় আচ্ছন্ন পরিবেশে পাখপাখালির কলতান কিংবা শুষ্ক মৌসুমের পড়ন্ত বিকালের মিষ্টি রোদের ছড়াছড়ি হাওরকে সুনিপুণ চিত্রপটের রূপ দেয়। বর্ষায় হাওরে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া হিজল-করচের ডালগুলো অথৈই জলে ডানাকাটা পরীর মতো ভাসমান থাকে।    

হাওরাঞ্চলে পরিকল্পিত কোনো রাস্তা নেই। ফলে যোগাযোগ ও ফসল ওঠানোর সময় দুর্ভোগ মানুষের নিত্য সঙ্গী। রাস্তা না থাকায় উদ্ভাবিত উন্নত কৃষিপ্রযুক্তি কৃষকদের দোরগোড়ায় পৌঁছায় না। দিন দিন চাষাবাদ যান্ত্রিক হচ্ছে; কিন্তু কৃষি যন্ত্রাদির দাম বেশি হওয়ায় কৃষকরা কিনতে পারেন না—তাই ভাড়া বাবদ মধ্যস্বত্বভোগীরা অধিক মুনাফা লুটে নেয়। নতুন ধান ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কৃষকরা সংসার খরচ তথা ঋণের টাকা পরিশোধ করতে কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কম মূল্যে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হন এবং টাউট-দালালরা ওজনে বেশি মেপে কৃষককে ঠকিয়ে থাকে।           

হাওরাঞ্চল খুবই দর্গম এবং গ্রামগুলি বিচ্ছিন্ন। যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম নৌকা। বৈরী আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রায়ই শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকে। এতে অনেক শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়ে। ফসলের মৌসুমে ছাত্রছাত্রী পুরোপুরি ফসল তোলার কাজে জড়িয়ে যায়।

হাওরাঞ্চলে স্যানিটেশনব্যবস্থা খুবই নাজুক। খোলা ল্যাট্রিনসহ ঝুলন্ত ল্যাট্রিন বেশি এখানে। এমনও দেখা যায় পানির মধ্যে ঝুলন্ত ল্যাট্রিনে মলমূত্র ত্যাগ করে এবং একই ল্যাট্রিনের নিচে অজু-গোসলসহ থালা-বাসন ও প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী ধোয়ার কাজ চলে। সরকার এবং এনজিওগুলো এ ব্যাপারে যথেষ্ট তত্পর হলেও মানুষের স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাবে স্যানিটারি ল্যাট্রিন পেলেও তা ব্যবহার না করে অযত্ন-অবহেলায় ফেলে রাখে।

টাঙ্গুয়ার হাওরে শত শত হ্যাজাক লাইট জ্বালিয়ে মাছ ধরা হয়। এই হ্যাজাক লাইট হাওরের প্রতিবেশের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এতে হাওরে পরিযায়ী পাখির সংখ্যাও অনেক কমে গেছে। একসময় শীতকালে আকাশ কালো করে লাখ লাখ পাখি ওঠানামা করত। এখন হাওরে এমন দৃশ্য বিরল। বিল থেকে সেচ দেওয়া নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে এটি পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। জ্বালানি ও অন্যান্য কাজে প্রচুর গাছ কাটা হচ্ছে। অবাধে বৃক্ষ নিধনের ফলে হাওরের পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে এবং উদ্ভিদ প্রজাতি বিনষ্ট হচ্ছে।

হাওরের মানুষের জীবন অনেকটাই এই কাদা-মাটির জলাশয়ের ওপরই নির্ভরশীল। পরিবেশ ও প্রতিবেশ বিনষ্ট হলে মাতৃরূপী হাওরের মৃত্যু হবে। আর তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে হাওরের মানুষ। মুখ থুবড়ে পড়বে হাওরের অর্থনীতি। তাই হাওরবাসীকে নিজেদের প্রয়োজনেই বন্ধ করতে হবে পরিবেশ বিধ্বংসী কার্যক্রম। শুধু আইন করে হাওরের পরিবেশ রক্ষা করা যাবে না। এজন্য হাওরপারের মানুষকে সচেতন হতে হবে সবার আগে। সরকার ও সবার সম্মিলিত প্রয়াসেই বজায় থাক হাওরের পরিবেশ, সুখে থাক হাওরের জীবন।

ময়মনসিংহ