সকাল থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে। সে রকম তেড়েফুঁড়ে নয়। তবে একটানা। তাতেই শুকনো যে খাল তাতেও একগলা পানি জমে গেছে। খাল পেরোতে হয় লিকলিকে এক বাঁশের সাঁকোয়। পিছল পথ, হাঁটা দায়।
সেই বৃষ্টি মাথায় মা বেরিয়েছে উপজেলার মাঠে ত্রাণের আশায়। বিধবা মা, একমাত্র কিশোরী মেয়েকে নিয়ে তার সংসার। কিন্তু কখনো কারো কাছে হাত পাতেনি। তিন বাড়িতে ছুটা ঝিয়ের কাজ করে দিব্বি চলে গেছে দিন। কিন্তু এখন যে আর দিন কাটে না। প্রথম একবেলা পরে দুবেলা এখন আর হাঁড়ি চড়ে না চুলোয়। কলের পানিই সম্বল।
মা বেরিয়েছে সেই সাতসকালে। চেয়ারম্যানের লোকেরা দু’দিন আগে একটা সিলমারা কাগজ দিয়ে গিয়েছিল। কাগজটা হতে নিয়ে ফজরের আজানের পর সেই যে গেছে কখন ফিরবে তার ঠিক নেই। মেয়ে ছাপড়াঘরের খুঁটি ধরে বসে থাকে মায়ের অপেক্ষায়। আর কত কী ভাবনা এসে ঘিরে ধরে তাকে। ছুটে ছুটে সেও কাজ করে বেড়াত এবাড়ি ওবাড়ি। যা পেত মায়ের হাতে তুলে দিত। বেহুদা পয়সা খরচ করা মায়ের একদম পছন্দ নয়। পয়সা জমিয়ে একটা ঘর বাঁধার ইচ্ছে ছিল মায়ের। তারা অপেক্ষা করছিল এই তো আর ক’টা দিন। কিন্তু ক’টা দিন পর যে এমন লকডাউনের জালে আটকে যাবে তাদের স্বপ্ন সে ভাবনা কে কবে ভাবতে পেরেছে! পুরো এলাকায় এমন পাহারা যে তাদের চোখ এড়িয়ে কাকপক্ষীও ঘরের বাইরে যেতে পারছে না। আহা তারা আজ কতদিন ঘরবন্দি! মনোযোগ দিয়ে সে হাতের কর গুনতে থাকে। আচমকা কী একটা আওয়াজে তার মনোযোগ তছনছ হয়ে যায়। বিড়ালটা আজ কতদিন না খেয়ে আছে, শুধু হাঁড়ি খোঁজে।
তার সামনে একটা লোক এসে দাঁড়ায়। লোকটাকে চেনা চেনা লাগলেও ভালোভাবে চিনতে পারে না। মুখে কাপড় জড়ানো। ওটাকেই বোধহয় মাস্ক বলে। এখন মাস্ক না পরলে নাকি শাস্তি।
লোকটা মেয়ের হাত ধরে ঘরে নিয়ে যায়। যেতে যেতে বলে তোমার জন্য ত্রাণ নিয়ে এসেছি। লোকটি ত্রাণ দিয়ে যায় বটে, কিন্তু তার সমস্ত উপত্যকায় থোকা থোকা ফুল লাল বন্যায় ছিন্নভিন্ন করে ডুবিয়ে দিয়ে যায়।
গলা ডোবা খালের উপর দিয়ে নড়বড়ে সাঁকোটা পার হয়ে মা যখন ঘরে ফেরে তখন বেলা প্রায় পড়ে এসেছে।
—কিছুই পাইলাম না রে মা! একবুক দীর্ঘশ্বাস পড়ে।
—ত্রাণের জন্য তোমারে আর মাঠের মধ্যে দাঁড়ায়ে থাকতে হবে না মা। এখন থেকে আমরা ঘরে বসেই ত্রাণ পাব।
মা মেয়ের ভাঙাচোরা মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকে। সে চোখে কোনো ভাষা নেই।