মুনাফালোভী মাঝির কারণেই প্রাণ গেল পর্যটকদের

নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলের মধ্যে গত কয়েক বছর ধরে মদন উপজেলার উচিতপুর ট্রলার ঘাট ইতিমধ্যেই পর্যটন স্পট হিসেবে দেশব্যাপী বেশ সমাদৃত হয়ে পড়েছে। ফলে গত তিন বছর ধরে বিভিন্ন উত্সবে মানুষের উপচেপড়া ভিড় জমে এ ঘাটে। এছাড়াও বর্ষাকাল বা সাপ্তাহিক ছুটির দিনে মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে থাকে ট্রলার ঘাটটি। দেশের নানা প্রান্ত থেকে হাওরের সৌন্দর্য দেখতে পর্যটকরা আসেন এই এলাকায়। এ কারণে স্থানীয় মানুষদের সৃষ্টি হয় নানা কর্মসংস্থানের। নৌকা ব্যবসায়ীদের মধ্যে মুনাফার আশায় সৃষ্টি হয় অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাইয়ের অসম প্রতিযোগিতা। ফলে ঘটেও নানা দুর্ঘটনা। এই দুর্ঘটনার ধরাবাহিকতায় গত ৫ জুন ১৮ জনের প্রাণহানি ঘটে। ঘটনার পর থেকে নৌকাটি পুলিশের হেফাজতে থাকলেও নৌকার মালিক ও মাঝিসহ অন্যরা পলাতক রয়েছেন।

সরেজমিনে জানা গেছে, হাওর এলাকার সৌন্দর্য উপভোগ করতে জেলা ও জেলার বাইরের বিভিন্ন স্থান থেকে ভ্রমণ পিপাসুরা আসেন মদন উপজেলার উচিতপুর ট্রলার ঘাটে। নীলআকাশ আর বিশাল জলরাশির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে ঘাট থেকে রিজার্ব বা পাবলিক ট্রলার ভাড়ায় নেন।

স্থানীয় ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা জানান, গত ৫ আগস্ট ময়মনসিংহসহ নেত্রকোনার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ৪৮ জন পর্যটক উচিতপুর ট্রলার ঘাট থেকে লাহুত মিয়ার যাত্রীবাহী ইঞ্জিন চালিত ট্রলারে ওঠেন। বৈরি আবহাওয়া এবং ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী তুলেন মাঝি লাহুত মিয়ার ভাতিজা খাইরুল। কিন্তু উত্তাল হাওরের প্রচণ্ড ঢেউয়ের মধ্যেই নৌকাটি ঘাট থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূর অতিক্রম করে ফেলে। যাত্রীদের বেশিরভাগই ট্রলারটির ছাদে আনন্দ করতে থাকে। এদিকে বাতাসের মধ্যেই রাজালীকান্দা নামক স্থানে পৌঁছতেই  ঢেউয়ের তাণ্ডবে মাঝি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কাত হয়ে উলটে যায় ট্রলারটি। পরে যাত্রীরা দিগ্বেদিক ছুটাছুটি করতে থাকলে ট্রলারটি উলটে ডুবে যায়। এ সময় ৩০ জন সাঁতরে পাড়ে উঠতে পারলেও বাকিরা তলিয়ে যায়। খবর শুনে স্থানীয় ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা যৌথভাবে প্রায় ৩ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে ১৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করে। একজনের লাশ পরদিন ভেসে ওঠে। ঘটনার পর থেকে নৌকার মালিক ও মাঝির কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। এদিকে প্রশাসন এ ঘটনায় কঠোর নিয়ন্ত্রণে গেলেও নৌকার মালিক ও মাঝিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

ঘুরতে আসা পর্যটকরা জানান, কোনো নজরদারিই ছিল না এতোদিন প্রশাসনের। যে যেভাবে খুশিমতো ভাড়া ও অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে। এমনকি পর্যটকদের সঙ্গে খারাপ আচরণের অভিযোগও রয়েছে। এর কারণে মারামারির ঘটনাও ঘটেছে।

মদন থানার ওসি রমিজুল হক জানান, এ ঘটনায় এখনো কোনো অপমৃত্যু মামলা হয়নি। নৌকার মালিক ও মাঝিদের নাম ঠিকানা সংগ্রহ করা হয়েছে। এদিকে ফায়ার স্টেশনের অফিসার আহমেদুল কবির বলেন, ৩০ জন যাত্রীর জায়গায় প্রায় ৫০ জন নিয়ে যাওয়ায় এমন ঘটনা ঘটেছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বুলবুল আহমেদ জানান, ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে। দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি নৌকা চালালে লাইফ জ্যাকেটসহ নিরাপত্তার সকল সরঞ্জামাদি রাখতে হবে।