রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) চন্দ্রিমা এলাকার আটটি সরকারি বাণিজ্যিক প্লট জালিয়াতির বিষয়ে অনুসন্ধান চলেছে টানা ছয় বছর। এর পর গত বছরের ২ অক্টোবর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সহকারী পরিচালক মো. আল-আমিন বাদী হয়ে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) সাবেক চেয়ারম্যানসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। কিন্তু বিগত প্রায় এক বছরেও শেষ হয়নি মামলাটির তদন্তকাজ।
২০০৫ সালের চাঞ্চল্যকর এই প্লট জালিয়াতি ঘটনার মামলার তদন্ত আজও শেষ না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন অভিযোগকারী সুমন চৌধুরী। তিনি বলেন, একটি প্রমাণিত দুর্নীতি মামলা তদন্তের নামে এভাবে সময় ক্ষেপণ হতে থাকলে কেউ দায়িত্ব নিয়ে অভিযোগ করতে এগিয়ে আসবে না। দুর্নীতিবাজরা বিচারের মুখোমুখি না হলে সরকারি প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতিও থামবে না।
সুমন চৌধুরী জানান, ২০০৫ সালে জালিয়াতির মাধ্যমে চন্দ্রিমা এলাকার আটটি বাণিজ্যিক প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। এতে সরকারের কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়। তিনি ২০১৪ সালে জড়িতদের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ করেন। এর পর ছয় জন কর্মকর্তা বদল শেষে ছয় বছর পর ২০১৯ সালের মাঝামাঝি সর্বশেষ অনুসন্ধান কর্মকর্তা দুদকের সাবেক উপপরিচালক আব্দুল করিম মামলার অনুমোদন চেয়ে প্রতিবেদন দেন। অনুমোদন শেষে গত বছর ২ অক্টোবর দুদক দুর্নীতির মামলাটি দায়ের করে।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০০৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর রাজশাহীর চন্দ্রিমা বাণিজ্যিক এলাকার ৫০ দশমিক ৬৭ কাঠা আয়তনের আটটি বাণিজ্যিক প্লট প্রতিযোগিতামূলক দরে বরাদ্দের জন্য একটি স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হয়। ঐ বছরের ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত আবেদন গ্রহণ করা হয়। আটটি প্লটের বিপরীতে মাত্র আটটি আবেদনই জমা পড়ে। তড়িঘড়ি করে আবেদনকারীদের প্রত্যেককে সাড়ে ছয় কাঠা করে কোটি টাকা মূল্যের বাণিজ্যিক প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। এরই মধ্যে অতি দ্রুততার সঙ্গে মাত্র ছয় দিনের মাথায় ২০০৬ সালের ২ জানুয়ারি সাধারণ সভা ডেকে প্লট বরাদ্দ অনুমোদন দেওয়া হয়।
এই অভিযোগের পর দুদকের অনুসন্ধানে উঠে আসে অভিনব উপায়ে সরকারি প্লট জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর তথ্য। উক্ত অভিযোগ ও দুদকের অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, এটি ছিল একটি পরিকল্পিত দুর্নীতি। যে পত্রিকায় প্লট বরাদ্দের বিজ্ঞপ্তিটির প্রচার দেখানো হয়েছিল সেটি ছিল একটি জাল কপি। একই দিনে প্রকাশিত পত্রিকাটির যেসব কপি বাজারে ছাড়া হয়েছিল সেইসব পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিটি ছিল না। পূর্বপরিকল্পিতভাবে বিজ্ঞপ্তিটি গোপন করা হয় যাতে প্লটগুলোর জন্য একাধিক আবেদনকারী আবেদন জমা দিতে না পারেন। যারা আবেদন করেছিলেন এবং বরাদ্দ পেয়েছেন তারাও এই দুর্নীতির সঙ্গে আগে থেকেই সম্পৃক্ত ছিলেন। এই দুর্নীতির ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেন হয়।
সূত্র মতে, ঐ সময় প্রতি কাঠা জমি ২ লাখ টাকায় বরাদ্দ দেওয়া হয় গ্রহীতাদের। যদিও ঐ সময় চন্দ্রিমা এলাকার জমির প্রতি কাঠার মূল্য ছিল ২০ লাখ টাকা। অস্বাভাবিক কম দরে গোপনে প্লটগুলো বরাদ্দের ফলে কাঠা প্রতি সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয় ১৮ লাখ টাকা। মোট ৫০ কাঠা জমিতে সরকারের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ কোটি টাকা।
দুদকের অনুসন্ধান ও মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, এই প্লট জালিয়াতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন, আরডিএর সাবেক চেয়ারম্যান তপন চন্দ্র মজুমদার, সাবেক এস্টেট অফিসার আবু বকর সিদ্দিক, হিসাবরক্ষক রোস্তুম আলী, আরডিএর উচ্চমান সহকারী পদ থেকে চাকরিচ্যুত ও বর্তমানে অন্য দুর্নীতির মামলায় কারাগারে থাকা মোস্তাক আহমেদ, প্লটগ্রহীতা এনামুল হক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শোয়েব আহমেদ সিদ্দিকী, ডা. এস এম খোদেজা নাজার বেগম, ডা. রবিউল ইসলাম স্বপন, মাহফুজুল হক ও খায়রুল আলম। এই মামলায় তাদের আসামি করা হয়েছে।
দুদকের সমন্বিত রাজশাহী জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম জানান, শিগগিরই মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হবে।