বৈরুতে ক্ষুব্ধ বাসিন্দাদের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ

লেবাননের রাজধানী বৈরুতে কিছু সরকারি কর্মকর্তার ‘গাফিলতির’ অভিযোগে দেশটির ইতিহাসের ভয়াবহতম বিস্ফোরণজনিত দুর্ঘটনা ঘটেছে—এমন অভিযোগ করে রাজপথে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। ধীরে ধীরে যখন প্রকাশ হচ্ছে যে এটি নিছক কিছু মানুষের অবহেলাজনিত দুর্ঘটনা, তখন শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ দানা বাধতে শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার রাতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলাকালে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী বাধা দেয়। ফলে দুই পক্ষ মারমুখী অবস্থান নেয়। এক পর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক সংঘর্ষ শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ব্যাপক লাটিচার্জ করে ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। বিক্ষোভকারীরা রাজপথে আগুন জ্বালিয়ে প্রতিবাদ চালিয়ে যায়।

জানা গেছে, গত মঙ্গলবার বৈরুতে ভয়াবহ দুটি বিস্ফোরণের ঘটনায় ১৪৫ জন নিহত ও প্রায় ৫ হাজার আহত হওয়ার পর ধ্বংসযজ্ঞে রূপ নেওয়া শহরটির মানুষ এখন ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে। গতকাল দেশটির রাজধানী শহরের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীরা সরকারবিরোধী স্লোগান দেয়। তাদের কে বা কারা সরকারবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত করছে কিংবা উত্সাহ দিচ্ছে সেটা জানা যায়নি। দেশটির পার্লামেন্ট ভবনের কাছে অবস্থানরত বিক্ষোভকারীদের ওপরও চড়াও হয় পুলিশ। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা হয়।

এদিকে, সরকারিভাবে এই ভয়াবহ বিস্ফোরণের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, গুদামে মজুত ২ হাজার ৭৫০ টন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট বিস্ফোরিত হয়ে মারাত্মক ঐ বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছে। ২০১৩ সাল থেকে এতগুলো রাসায়নিক অনিরাপদে সেখানে মজুত ছিল। বিস্ফোরণে এত মানুষ হতাহত হওয়া ছাড়াও তিন লক্ষাধিক লোক হয়েছে বাড়িছাড়া। শহরটিতে মজুত খাবারের ৮৫ শতাংশ ধ্বংস হয়েছে। যা নিয়ে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ,                আতঙ্ক আর হতাশা।

মঙ্গলবারের ঐ জোড়া বিস্ফোরণ পুরো রাজধানীকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। বিস্ফোরণের পর শুরু হওয়া সরকারি তদন্তের আওতায় অভিযুক্ত ১৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির সরকারি বার্তা সংস্থা। অনেককে গৃহবন্দি করা হয়েছে যাতে তারা তদন্ত চলাকালে পালিয়ে যেতে না পারে। এদিকে বিধ্বস্ত বৈরুতের জন্য মানবিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিভিন্ন দেশ ও জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থা।

বিশ্লেষকরা বলেছেন, অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট মারাত্মক দাহ্য, সামান্য আগুনের ছোঁয়া পেলেই যে কোনো সময় ঘটতে পারে বিস্ফোরণ। সব জেনেও বৈরুত বন্দরের কাছের একটি গুদামে এত দীর্ঘ সময় সেগুলো ফেলে রাখা হয়েছিল।

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায়, লেবাননের কর্মকর্তারা বিস্ফোরণের জন্য যে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটকে দুষছেন, সেটি আসলে লেবাননের নয়, রাশিয়ার মালিকানাধীন একটি পণ্যবাহী জাহাজে করে লেবাননে পৌঁছেছিল। ছয় বছরেরও বেশি সময় আগের ঐ ঘটনায় মোজাম্বিকে যাওয়ার পথে থাকা ঐ রুশ জাহাজ ফুটো হয়ে যাওয়ায় বৈরুতের বন্দরে ভিড়ে। সেটির আর গন্তব্যে ফেরা হয়নি। অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক বিরোধের কারণে যে রুশ ব্যবসায়ী জাহাজটি লিজ নিয়েছিলেন তিনি চুক্তি বাতিল করেন। এর পরই জাহাজের অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট বৈরুতের বন্দরের কাছের একটি গুদামে নেওয়া হয়। ঝুঁকিপূর্ণ এই দাহ্য পদার্থ কীভাবে সরানো হবে সে পরামর্শ চেয়ে ২০১৪ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত লেবাননের কাস্টমস কর্মকর্তারা আদালতে অন্তত ছয় বার চিঠি লিখেছেন। কিন্তু সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচারকদের জবাবের কপি তাদের হাতে এসেছে। তারা প্রতিবার জবাবে বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় বসতে হবে যে এটা নিয়ে কোনো নির্দেশনা প্রদান তাদের এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে কি না।