মানুষের মুখ
এবার গ্রীষ্মে সব কিছুতেই উল্টো-পাল্টা হাওয়া
চেরি পিকিং করতে গিয়ে নিষেধ শুনি কড়া
বলছে না কেউ টসটসে লাল ফল যাবে না ধরা
গাছ থেকে লাল চেরি পেড়ে যাচ্ছে না আর খাওয়া।
ঘটনা কি? গাছতলাতে বসেই চেরি খাবো।
কেন এমন নিষেধ বাবু, বদলালো পৃথিবী?
না হয় দুটো পয়সা আরো বাড়িয়ে তুই নিবি
খাচ্ছি পেড়ে, আবার কবে এমন সুযোগ পাবো?
মুখোশ পরা মানুষ তুমি ফল খাবো কোন মুখে?
মুখ দিয়ে কি আগুন ঝরে বাগান পুড়ে যাবে?
এই মুখে সব খাচ্ছে মানুষ বন থেকে সমুদ্র
মুখটাকে তাই দিলো বেঁধে প্রাণঘাতি অসুখে
গোপনাঙ্গের মতো এবার মুখটাকে সামলাবে
মানুষের মুখ যে বেঁধে দেয় ভাবছো কি, সে ক্ষুদ্র?
রিক্সাশ্রমিক
রিক্সাশ্রমিক প্যাডেল মেরে স্বপ্ন বোনে আজও
প্রকাণ্ড এক পথের ওপর বিকেলটাকে দ্রুত
দেয় জুড়ে সে রাতের সঙ্গে সন্ধ্যা-সুইয়ে সুতো
মধ্যরাতের এই শহরে সে যে বরকন্দাজও।
সিটের ওপর উপন্যাসের গ্রন্থ খুলে রাখে
পরকিয়া, খুনসুটি-প্রেম, বৃষ্টিতে যায় ভিজে
কি করে পাঠ করবে এসব নিরক্ষর সে নিজে
গল্প যদি যায় ভিজে তাই গ্রন্থটিকে ঢাকে।
রিক্সাশ্রমিক দিনের শেষে নিজের ঘরে ফেরে
সারাদিনের গল্পগুলো গামছাতে নেয় বেঁধে
বইয়ের ছেঁড়া একটি পাতা তারও আছে ঘরে
ক্লান্তি মুছে সেই পাতাটি দেখবে নেড়ে-চেড়ে
সেখানে প্রেম-সোহাগ ঠেলে অক্ষর ওঠে কেঁদে
উপন্যাসের এই পাতাটি নাজুক ও নড়বড়ে।
পথ
হলুদ লেবু টিপে টিপে বের করেছি সকাল
সবুজ চায়ে চুমুক দিয়ে আয়ুর ঘড়ি দেখি
পথ খুলে দেয় রাতের খোপা পা রাখি সেই পথে
পথের ওপর পথ ভেঙে যায় লক্ষ চুলের দোলা!
কোন পথে পা রাখবো খুঁজি, রাস্তা কোথায় খোলা?
পথকে টেনে সমুদ্রে নেই, একটিকে পর্বতে।
ছুটছি স্বাধীন নেই পরোয়া বললো তাতে কে কি
পথে পথে সবুজ বাতি কতো হাজার যে লাল।
দূরের বাতাস হঠাৎ বলে ফেরার সময় হলো
সবকিছু গোছগাছ করে নিই উল্টো পথের ডাকে
চিরকালের বোহেমিয়ান ঘর কি তাকে টানে?
পেছনে যায় যে পথ ছুটে সে কি হয় উজ্জ্বলও
অন্ধকারের স্লেটে সে কি আলোর ছবি আঁকে?
পথের তো নেই পেছন কোনো তাই আলো সবখানে।
শিশি
উল্টে গেল যখন বোতল তখনই টের পেল
সুগন্ধি কি আটকানো যায় পেরেছে কেউ আগে?
সবাই ছিল গভীর ঘুমে তীব্র ঘ্রাণে জাগে
গুনে দেখো কেউ কি বাকি, সবাই উঠে গেল?
এ-ওর চোখে তাকাচ্ছিল উৎসটা কি জানো?
কে ছড়াল, কোথায় ছিল, এমন ঘ্রাণের শিশি?
দিনের সাথে আলিঙ্গনে লিপ্ত হল নিশি
মানুষ, পশু কাউকে তো আর যাচ্ছে না আটকানো।
গঞ্জে-মাঠে, নগর-হাটে কিংবা ফ্লাটে ফ্লাটে
সবাই এখন বিনোদিনী, কৃষ্ণ প্রতি ঘরে
গুম, অপরাধ, দূর্নীতি নেই, ঘুষ, খুনও বিস্মৃত
এই শহরের মানুষ এখন গোলাপ নিয়ে হাঁটে
আসমানি রোগ-বালাই হাওয়া, পুষ্পবৃষ্টি ঝরে
একটি শিশি ভাঙল বলেই সবাই আনন্দিত!
চাঁদে-পাওয়া
চাঁদের দিকে আমিও কি দিইনি তুলে আমার
কচি দুটি শিশু-হস্ত বালকদিনে ছুঁড়ে?
গল্প-কন্ঠে ঘুম পাড়ানি, বুক পকেটে জামার
চাঁদকে রেখে স্বপ্নে আমি হেঁটে গেছি দূরে।
চাঁদের আলোয় পথ চিনেছি শহর থেকে গ্রামে
চন্দ্রধোয়া মুখ চিনেছি পড়শি মাসি-পিসির
সেসব মুখে জ্যোৎস্না-রাতে স্মৃতির আঁধার নামে
অন্ধকারের হৃদয় খুঁড়ে ঘুম ভেঙেছি নিশির।
এখন আমার হাতের মুঠোয় নরোম চাঁদের দু'ঠোঁট
ঠোকর দিয়ে কররেখা ভাঙছে সমস্ত রাত
স্বস্তি খুঁজি অন্ধকারে পরিস্থিতি গুমট
মিছিল বাজে পথে পথে দেয়ালভাঙার আঘাত।
দুইটি চাঁদের দখল নিয়ে রাত-দুপুরে পুড়ছি
চাঁদ থেকে চাঁদ ডানা ছাড়া আমিই একা উড়ছি।
পৃথিবীতে দু'ধরনের সনেট প্রচলিত। পেত্রার্কান সনেট এবং শেক্সপিয়েরিয়ান সনেট। ত্রয়োদশ শতকে ইতালির গুইডো কাভালকান্তি এবং দান্তে আলিঘিরি সনেটের কাঠামোতে প্রথম কবিতা লেখেন। পরবর্তীতে স্বদেশী সনেট রচয়িতা এবং বিশ্লেষক ফ্রাঞ্চাস্কো পেত্রার্কা এগুলো যে সনেট তা মানুষকে জানান। তাই ইতালিয় সনেটের নাম হয়ে যায় পেত্রার্কান সনেট। ইংরেজদের মধ্যে কবি ও নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়ার সনেট লিখে খ্যাতি অর্জন করেন। তাই ইংলিশ সনেট হয়ে গেছে শেক্সপিয়েরিয়ান সনেট। পেত্রার্কান বা শেক্সপিয়েরিয়ান, দু'ধরনের সনেটেই, প্রতিটি লাইনে ১০টি করে সিলেবল আছে, যা আমাদের স্বরবৃত্ত ছন্দের দশ মাত্রার অনুরূপ। প্রতিটি সনেট ১৪ লাইনে সীমিত। প্রথম আট লাইনে ভাবের বিস্তার, পরের ছয় লাইনে এর গুঢ় রহস্যের উন্মোচন বা নির্দেশ। পার্থক্য শুধু অন্ত্যমিলে। পেত্রার্কান সনেটে ABBA, CDDC, EFGEFG এবং শেক্সপিয়েরিয়ান সনেটে ABAB, CDCD, EFEFGG এভাবে অন্ত্যমিল দেয়া হয়। উনিশ শতকে আধুনিক বাংলা কবিতার স্থপতি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা ভাষায় প্রথম সনেট লেখেন। তিনি ১৪ লাইন ঠিক রেখে স্বরবৃত্ত ছন্দের পরিবর্তে অক্ষরবৃত্তে সনেট লেখেন। স্বরবৃত্তে যেহেতু ছড়া এবং গান লেখা হয় তাই আধুনিক কবিরা মনে করেন এই ছন্দে সনেটের গাম্ভীর্য ঠিক রেখে সনেট লেখা সম্ভব নয়, তাই পরবর্তিতে সুফি মোতাহার হোসেন, জীবনানন্দ দাশ, আল মাহমুদ, শামসুর রাহমানসহ প্রায় সকলেই অক্ষরবৃত্তে সনেট লিখেছেন। কেউ কেউ ১৪ থেকে বাড়িয়ে ১৮, ২২ মাত্রায় লিখেছেন, জীবনানন্দ দাশ ২৬ মাত্রায়ও লিখেছেন। অনেকেই অন্ত্যমিলে নানান রকম পরিবর্তন এনেছেন। হাতে গোনা কিছু সনেট মাত্রাবৃত্তে লেখা হয়েছে, স্বরবৃত্তে একেবারেই হয়নি। অথচ সনেটের উৎপত্তি স্বরবৃত্তেই। সম্প্রতি আমি স্বরবৃত্ত ছন্দে কিছু সনেট লেখার চেষ্টা করেছি। দশ মাত্রার (সিলেবল) পরিবর্তে ১৪ মাত্রায় (৪+৪+৪+২) লিখেছি। বাংলা কবিতার পাঠকদের জন্য পাঁচটি স্বরবৃত্তের সনেট এখানে উপস্থাপন করা হলো।
লেখা পাঠানোর ঠিকানা: ittefaqsamayiki16@gmail.com