বৈজ্ঞানিক কল্পগল্প

ভাসমান পুকুর

অবারিত ফসলের মাঠ। মাঠের কিনার ঘেঁষে বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ। তারপর স্বচ্ছ পানির চরজাগা নদী। বাঁধের সাথে একচিলতে জমিতে জামালদের বাড়ি। এই বাড়িভিটাটুকুই তাদের সম্বল। এখানেই একঘরা ছনের বাড়ি। শুকনো কলার পাতা দিয়ে ঘেরা। এই ঘরটাই জামাল আর তার মা’র জন্য রাজপ্রাসাদ। এটাই তাদের আপন ভুবন। এখানে যে সুখ পায় আর কোথাও পায় না। জামালের জন্মের কিছুদিন পরই তার বাবা মারা যান। জামাল তখন পাথালে কোলে। তার মা ঝিয়ের কাজ করেন। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর রাতে একটু ভাত, বাসি সালুন, একটু টক ডাল নিয়ে বাসায় ফেরেন। জামাল মায়ের পথ চেয়ে বসে থাকে। কখন মা ভাত নিয়ে আসবে! খিদেয় পেট চো চো করছে। তার মা যা-ই নিয়ে আসুক, তা-ই তার কাছে শাহিভোজ। গবগব করে খায়। দুই তক্তার চৌকিতে মা’র গলা জড়িয়ে ঘুমায়। সারাদিনের জমানো কথা মা’র সাথে শেয়ার করে। মা-ই তার সব। মায়ের কাছে বাবার গল্প শুনে তার মন খারাপ হয়, চোখের পাতা ভিজে আসে। তাদের ছোট্ট উঠোনের এক কোনায় শিমুল গাছের তলায় তার বাবার কবর। তার কেন যেন মনে হয় শিমুল গাছের মধ্যে তার বাবা বেঁচে আছেন। তার বাবার অস্থি-মজ্জা শোষণ করেই তো গাছটা বড়ো হয়েছে। শিমুলের ফুলকে মনে হয় তার বাবার হাসি। এই গাছে যখন ফুল ফোটে, তার মনের ছোট্ট আঙিনাও ফুলে ফুলে ভরে যায়। জামাল মাঝে মাঝে বিড়বিড় করে শিমুল গাছের সাথে কথা কয়। তার কষ্টের কথা, আনন্দের কথা। সাত সকালে তার মা মন্ডল বাড়িতে কাজে চলে যান। সে তখন একা হয়ে যায়। যে বয়সে সবাই স্কুলে যায়, সে বয়সে সে ছন্নছাড়া ঘুরে বেড়ায়। ঘুঘুর বাসা খুঁজে বেড়ায়। ডোবায় বড়শি ফেলে টেংরা মাছ ধরে। স্কুলে যাওয়া যেন তার জন্য বিলাসিতা। বাবার খুব ইচ্ছে ছিল—ছেলে বড়ো হয়ে পুলিশ হবে। এখন সে স্বপ্ন আর কেউ দেখে না।

মাঘের শেষাশেষি। শীতের তীব্রতা কিছুটা কমে এসেছে। তারপরও ভোরে ভালোই শীত থাকে। জামালরা খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠে। তার মাকে মন্ডলবাড়ির বাসি থালাবাসন মাজতে হয়। তাই ভোরেই যেতে হয়। ওই সময় জামালও উঠে পড়ে। সকালে কাঁথা ঠান্ডা হয়ে যায়। শীত লাগে। তাই উঠে আগুন পোহায়। ঘুম থেকে উঠেই খুঁজতে থাকে—কোথায় কে আগুন পোহাচ্ছে। মানুষ মুখোমুখি গোল হয়ে বসে আগুন পোহায়। জামাল একটু ফাঁক পেলেই টুপ করে বসে যায়। ছোট হাত দুটো আগুনের ওপর মেলে ধরে। কিন্তু আজ সে আগুন পোহাবে না। তার মা বলেছেন, তার নানি আসবেন তাদের বাড়ি বেড়াতে। তার নানির জন্য বড়শি দিয়ে মাছ ধরবে। একটি বাঁকা ছিপ আর ছোট্ট একটি খালুই নিয়ে ডোবার দিকে যাচ্ছে জামাল। সামনে অবারিত প্রকৃতি। প্রকৃতিতে বসন্তের আগমনী বার্তা। বসন্তের আমেজ টের পাওয়া যায়। প্রকৃতির এই পরিবর্তন জামালকে স্পর্শ করে। নিজের মধ্যে কেমন যেন একটা পরিবর্তন টের পায়। চষা খেতের আল ধরে হাঁটছে জামাল। আর ক’দিন পর বোরো ধানে ভরে উঠবে এই মাঠ। মাঠের মাঝখানে ছোট্ট একটি ডোবা। হেলেঞ্চা আর কলমি লতায় ছাওয়া। ওখানে লতার ফাঁক দিয়ে বড়শি ফেলবে জামাল। চারদিকে গাঢ় কুয়াশা। কুয়াশা জামালের খুব পছন্দ। বড়শি ফেলে ফাতনার দিকে চেয়ে আছে সে। তাকে কেউ দেখছে না। কখন টেংরা মাছ তার টোপ গিলবে! পেটে ডিমঅলা টেংরা। রুপালি পুঁটি।

 

হঠাৎ ন্যাড়া মাথার একজন মানুষ ডোবা থেকে মাথা তুলল। জামাল ভাবল, মনা পাগলা। মনা পাগলা শীত-গ্রীষ্ম বারোমাস পানিতে ডুবে থাকে। লোকটা দাঁত কেলিয়ে হাসছে। দাঁতগুলো গাঢ় নীল। কী অদ্ভুত! চুলগুলো সবুজ। মুখ লম্বাটে। চোখ ছোট। এ তো মনা পাগলা না! জামাল ভড়কে গেল। ছিপ ফেলে দৌড় দেবে—এমন সময় লোকটা কথা বলে উঠল। বলল, ভয় পেয়ো না। জামাল চকিত চোখে অপলক তাকিয়ে আছে। লোকটা আস্তে আস্তে পাড়ে উঠে এল। সারাদেহ তামাটে। বর্মের মতো একধরনের পোশাক পরা। এতে পানি লাগে না। জামালের কাঁধে হাত রাখল লোকটা। খুব আদুরে কণ্ঠে কথা বলতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যে সে জামালের বন্ধু হয়ে গেল। জামাল জানতে চাইল, সে কে? লোকটা বলল, ‘আমার পরিচয় দিলে তুমি বুঝবে না। আমার বাড়ি এখান থেকে অনেক দূরে। তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। তোমাদের পৃথিবী থেকে বহুদূরে।’জামাল আসলেই কিছু বুঝতে পারছে না। সে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, ‘ওই যে বড়ো আমগাছ। ওই গাছের মগডালে উঠলে আমার নানুবাড়ি দেখা যায়। তোমাদের বাড়ি কি তার চেয়েও দূরে!’ লোকটা খিকখিক করে হেসে উঠল। হাসার ভঙ্গিটাও যেন কেমন! জামাল মনে মনে ভাবল, এটা জিন-টিন না তো আবার! তাদের পাশের বাড়ির সফুরার মাকে জিনে ধরেছে। সাত পাড়ার লোক এসে দেখে যাচ্ছে। তাকেও আবার জিনে ধরল না তো! এবার লোকটা বলল, ‘চলো, তোমাদের বাড়িতে একটা পুকুর তৈরি করে দিই। ওখানেই তুমি মাছ ধরতে পারবে।’জামাল অসহায়ভাবে তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমাদের তো এত জায়গা নেই! লোকটা বলল, ‘এত জায়গা লাগবে না। তোমাদের বাড়ির ওপরে পুকুর তৈরি করে দেবো।’ জামাল খুব বিস্মিত হলো। পাগল নাকি! বাড়ির ওপর আবার পুকুর হয় কীভাবে! লোকটা স্মিত মুখে বলল, ‘আমি জানি, তুমি খুব বিস্মিত হচ্ছ। কিছু বুঝছ না। তোমার মাথায় যদি ব্রেন কম্পিউটার ইন্টারফেস লাগিয়ে দিই, তুমি সব বুঝবে। এ গ্রামের সবচেয়ে বুদ্ধিমান মানুষ হয়ে যাবে তুমি। জামালের সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। সে ফ্যাকাশে মুখে বলল, ‘মাথা কি কাটতে হবে?’ লোকটি হেসে বলল, ‘তুমি টেরই পাবে না।’জামাল বলল, ‘আগে মাকে জানিয়ে নিই। মা বললে, আমি ওটা লাগাব মাথায়।’লোকটা বলল, ‘আমার যাওয়ার সময় হয়ে আসছে। চলো, তোমাকে পুকুর তৈরি করে দিই।’জামাল তাকে বাড়িতে নিয়ে এল। লোকটা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘এই মহাবিশ্ব কত বড়ো! তোমাদের বাড়ি কত ছোট! আর আমরা মানুষ আরো কত ছোট!’ একথা বলেই সে একলাফে শিমুলগাছে উঠে বসল। পকেট থেকে স্প্রের মতো কী যেন একটা বের করল। উঠোন বরাবর ওপরে বর্গাকারে স্প্রে করল। তারপর মাঝখানে স্প্রে করল। বলল, ‘এই অংশটা জিরো গ্র্যাভিটি করে দিলাম। এখানে পানি ভেসে থাকবে। তুমি এখানে মাছ পুষবে। জামাল পোকায় খাওয়া দাঁত বের করে হাসল। চোখের পলকে জায়গাটা পানিতে ভরে দিল। টেংরা, পুঁটি, শোল, শিং নানা মাছ সেখানে সাঁতার কাটছে। এক বুক বিস্ময় উপহার দিয়ে লোকটা চলে গেল। ভাসমান পুকুরের খবরটা চারদিকে চাউর হয়ে গেল। আস্তে আস্তে তাদের বাড়িতে মানুষের ভিড় লেগে গেল।