করোনার এই সময়টাতে এমনি কেটে গেল ২টি ঈদ। এর মাঝেও ঈদের আনন্দ থেমে ছিল না। আর তাই স্বপ্নইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন আয়োজন করেছিল ‘লকডাউন ও অন্যরকম ঈদ’ নামে একটি ইভেন্ট, যাতে অংশগ্রহণ করে অনেকেই জানিয়েছেন
তাদের নিজেদের ঈদের অভিজ্ঞতা।আর তার মধ্য থেকে নির্বাচিত প্রথম তিনজন এর লেখা ছাপানো হচ্ছে ইভেন্টটির মিডিয়া পার্টনার ইত্তেফাক এর অনুশীলন পাতায়।
সাবরীনা মনজুর
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
কোথায় আমার নানা রঙের দিনগুলি,ফিকে হওয়া দিন গুলিতে কল্পনার ডানা মেলি!
ছন্দে আমি বরাবরই দূর্বল। কিন্তু একটা ছন্দে চলা আমার জীবনটা যে হঠাত্ করেই ছন্দহীন স্থবির অবস্থায় চলে আসবে কে জানতো! সকল কৃতজ্ঞতা মহামতি কোভিড ১৯ তথা করোনা বিবিকে। হাজার বছর ধরে উপন্যাসে যেমন ওলা বিবি,বসন্ত বিবি গ্রামের পর গ্রাম উজাড় করে ফেলতো, তেমনি এই করোনা বিবিও ভৌগোলিক সীমারেখা না মেনে স্বগৌরবে নিজের অতি ছোঁয়াচে মহিমা প্রকাশ করে চলছে।
উপন্যাসের গ্রামের মানুষ তো ওলা বিবি, বসন্ত বিবিকে সমীহ করতেন; কিন্তু আমাদের গ্রামের মানুষগুলো আবার এক কাঠি সরেস। দেখা হলেই পিচিক করে পানের পিক ফেলে বলে “আমরা পান খাই। আমগোর করোনা অইবোনা”
সবাই হয়তো ভাবছেন করোনাকালীন ইদ অভিজ্ঞতায় এত ভণিতা কেনো? ইদটা যে সবসময় বাড়ির কাছে হওয়ায় দাদু বাড়িতেই করা হয়। এবারো তার ব্যতিক্রম হতনা যদি না তারা পিচিক করে পানের পিক ফেলে ঊর্ধমুখী সংক্রমণের সময় মাস্ক গ্লাভস না পড়ে ঘুরতো।
আমরা তো আর একা ইদ করতাম না, ঢাকা থেকে আসতেন আমার দুই চাচার পরিবার, বাড়িতে থাকতেন আমার বড় ফুফু, নব্বই ছুঁই ছুঁই দাদা, বড় বোনের শ্বশুরবাড়ি একদম এপাড়া ওপাড়া হওয়ায় আমার বড় আপু,পুঁচকে ভাগ্নে, দুলাভাই এবং তার পরিবার। অতিথির পর্ব এখানেই শেষ নয়! ইদের পরদিন আমাদের বাড়িতে থাকতো বিশাল দাওয়াত। আমার ছোট ফুফু,তার ছেলে,মেয়ে,নাতি নাতনি সহ আসতেন, বড় ফুফুর নাতি নাতনিরা আসতেন, আমার মেজো বোনের শ্বশুরবাড়ির সবাই, বড় বোনের শ্বশুরবাড়ির সবাই, অনেক সময় ছোট মামা, নানী, বা খালামনি খালু এবং খালাতো ভাইয়ের পরিবার। সব অতিথির সংখ্যা মিলিয়ে অনেক সময় সেটা ষাট জনও ছাড়িয়ে যেতো। সব রান্না বান্না আম্মু, চাচী আর বড়মা করলেও, আপ্যায়ন যোগান সব কিছু চাচ্চু আর আব্বু নিজ হাতে করতো! খুবই বাড়োয়ারি ব্যাপার স্যাপার।
কিন্তু এই করোনাকালের ইদে আর সেই বিলাসিতার সুযোগ কই! লকডাউনের পর থেকে ৪-৫ মাস নিজেকে ঘরে বন্দি করে রাখলেও বড় বোনকে শ্বশুরবাড়ি থেকে, মেজো বোনকে আমেরিকা থেকে, আর বাকি কাজিন দের যার যার বাসা থেকে একই সুতোয় বেঁধে রেখেছিলো জাকারবার্গ সাহেব। মেসেঞ্জারে আমাদের একটা বেশ সরব গ্রুপ আছে। Loving Family নামে। তাই আমি আর ছোট চাচাতো বোন অহনা বুদ্ধি আঁটলাম, এবারের সীমিত আকারে বাড়োয়ারি আয়োজন নাহয় ভার্চুয়ালিই হোক! আমার আম্মুর ও একই মত, জীবনে যখন যে অবস্থায়ই থাকোনা কেনো, তার পূর্ণ উপযোগই করা উচিত। বোন যেহেতু এবার বিদেশ, সময়ের ব্যবধান ও বিস্তর! কাঙি্ক্ষত সময়ের ১০ ঘন্টা আগেই আমাদের মেসেঞ্জার গ্রুপে টুম্পা আপু খাবার দাবারের ছবি দিয়ে শুরু করলো ইদ উদযাপন। এর মধ্যে নানী এসেছেন খালামনিদের বাসায়, আমাদের দুই বাসায় যেনো লাইভ টেলিকাস্ট হচ্ছে!
আমার চাচাতো বোন অহনার আবার এর মধ্যেও খুব আক্ষেপ! বেচারির দশ খালা এবং তিন মামা হবার সুবাদে ছোট থেকেই ইদে ১৪-১৫টা জামা হতো। আর ও যখন ছোট ছিলো তখন আমার চাচী প্রতি ঘন্টায় ওর একটা করে জামা বদলে দিতেন! অহনার নতুন জামা আর বাহারি মাথা ভর্তি ক্লিপ দেখে আমরা ঘন্টার হিসাব করতাম। এখন ও বড় হয়ে ক্লাস নাইনে পড়লেও ওর ইদের জামা প্রাপ্তির খুব একটা ব্যতিক্রম হয়নি। বেচারির এবার খুব মন খারাপ হলো। এত জামা পড়ে সে কাকে দেখাবে! এদিকে আমি আবার উল্টো। আমার ইদের নতুন জামার বদলে বরং দুস্থ কারো পাতে খাবার জুটুক। তাই যে টাকাটা দিয়ে কিছু কিনতাম সেটা দান করে দিয়েছি। তাই বলে কি ইদ উদযাপন হবে না? আলবত্ হবে! আলমারি থেকে আম্মুর শাড়ি বের করলাম। আম্মুর শাড়ি আমার কাছে নতুন জামা থেকে কমই বা কিসে।
ইফতার করতে না করতেই বিটিভিতে ক্লাসিক “রমজানের ঐ রোজার শেষে” শোনার সাথে সাথেই শুরু হয়ে গেলো। সাধ করে মেহেদী দিলাম,পুঁচকে ভাগ্নেটাও বাদ যায়নি মেহেদী রাঙা বাহুল্যে। ইদে যা যা রান্না করবো তা আমি আর আম্মু মিলে রেডি করলাম। অত:পর যথারীতি ইদের দিন সকাল বেলা এলো। শুরুই হলো ভিডিও কল দিয়ে। লাভিং ফ্যামিলির ভিডিও কল। যোজন যোজন দূরে থেকেও যেনো সবাই একসাথে। চাচাতো দুই বোন যথারীতি সাজুগুজু করে, নতুন জামা পড়ে রেডি, আর এদিকে আমি বাসার জামা পরা। মনে পড়ে গেলো আবার সেই দাদুবাড়ির কথা। সকাল ১০ টার ভেতর সবাই রেডি হয়ে পাড়া বেড়াতে বের হতাম। আর এখন অনলাইন বেড়াচ্ছি। সময়ের সাথে কতকিছু বদলায়!
সত্যি কথা বলতে কী এই লকডাউনের ইদ আমাদের বাহ্যিক দূরত্ব বাড়িয়ে দিলেও আত্মিক দূরত্ব একরত্তিও বোধহয় কমাতে পারেনি। একে একে নানী, খালামনি-খালু,ছোট মামা-মামী, ফুফু, বন্ধু-বান্ধবী সবার সাথেই ভিডিও কলে কথা, আড্ডা হলো। প্রতিটা কলই ছিলো বেশ বাহুল্যবর্জিত আর নিখাদ। এবার কে কার চেয়ে কত বেশি আইটেম করতে পারে বা কার জামা কত দামী এ ধরণের অসুস্থ প্রতিযোগিতা বিত্তবানদের মধ্যেও তেমন দেখিনি। তবে এতটুকু হলফ করে বলতে পারি, এই করোনাকালীন ইদ শিখিয়ে গেলো, “দূরে থেকেও কাছে থাকা যায়”। সেটা হতে পারে অনুভূতি প্রকাশ, আন্তরিকতা কিংবা সামান্য কুশলাদি জিজ্ঞাসার মাধ্যমে।