করোনার কারণে সমগ্র বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থায় ভয়াবহ জট সৃষ্টি হইয়াছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাটাকেও সেই জট প্যাঁচাইয়া ধরিয়াছে। করোনার কারণে গত ১৭ মার্চ হইতে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রহিয়াছে। কয়েক দফায় ছুটি বাড়াইয়া তাহা ৩১ আগস্ট পর্যন্ত করা হইয়াছে। মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষা লওয়া সম্ভব হইলেও উচ্চমাধ্যমিকের প্রায় ১৩ লাখ পরীক্ষার্থী পড়িয়াছে গভীর অনিশ্চয়তায়। গত এপ্রিলে এই পরীক্ষা হইবার কথা ছিল। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র বলিতেছে, করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসিবার পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলিলেও অন্তত ১৫ হইতে ২০ দিন সময় লাগিবে এই পরীক্ষা শুরু করিতে।
বিশ্বের কোথাও কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলিয়াছিল করোনা পরিস্থিতির মধ্যেই। বিশেষ করিয়া আমেরিকার যেই সকল স্টেটে সীমিত পরিসরে স্কুল খুলিয়াছিল, সকল ধরনের সতর্কতা ও ব্যবস্থা লওয়া সত্ত্বে সেইখানে কিছু শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে করোনার সংক্রমণ রুখিতে পারে নাই। ইউনিসেফের দেওয়া একটি তথ্য হইতে জানা যায়, বিদ্যমান করোনা পরিস্থিতির কারণে ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, চীন, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ ৮৪টি দেশ পাবলিক বা এই ধরনের পরীক্ষা বাতিল কিংবা স্থগিত করিয়াছে। বাংলাদেশে এখন অবধি আড়াই লক্ষাধিক মানুষ করোনায় আক্রান্ত হইয়াছে। প্রকৃত সংখ্যা যে আরো অনেক বেশি, তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। সুতরাং বাস্তবিক অর্থে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলিবার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয় নাই। প্রকৃত অর্থে, করোনার সংক্রমণ হ্রাসের কোনো আপাতত আলামত দেখা যাইতেছে না। বরং আসন্ন শীতে এই সংক্রমণের মাত্রা আরো বাড়িতে পারে বলিয়া আশঙ্কা করিতেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এই পরিস্থিতিতে আমরা যদি সবচাইতে নেতিবাচক সম্ভাব্য পরিস্থিতি চিন্তা করি, তাহা হইলে এই বত্সর কোনো ধরনের পরীক্ষা লওয়া সম্ভব না-ও হইতে পারে। সেই ক্ষেত্রে উপায় কী? এই ব্যাপারে বাংলাদেশ পরীক্ষা উন্নয়ন ইউনিট (বেডু) জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষাসংক্রান্ত প্রস্তাব ঈদের পূর্বে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়াছে বলিয়া জানা গিয়াছে। তাহাতে ছয়টি প্রস্তাব রহিয়াছে। অনেক ‘যদি’র উপর ভর করিয়া এই প্রস্তাবগুলি আসিয়াছে। তাহা ছাড়া উপায়ও নাই। বেডু প্রস্তাবের বিভিন্ন অংশে শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি সংকোচন করিয়া কিংবা বহু নির্বাচনি প্রশ্নের মাধ্যমে প্রতিটি বিষয়ে ৫০ নম্বরের পরীক্ষা লওয়ার কথাও বলা আছে। ইহার মধ্যে একটি প্রস্তাবে পরীক্ষার মোট বিষয়ের সংখ্যা কমাইবার কথা বলা হইয়াছে।
এই ব্যাপারে আমরা স্মরণ করিতে পারি স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের পাবলিক পরীক্ষার কথা। এইবারের করোনা পরিস্থিতির মতো সেই সময়ও মহান মুক্তিযুদ্ধের কারণে ১৯৭১ সালে কোনো পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হইতে পারে নাই। সেই সময় ১৯৭২ সালের পাবলিক পরীক্ষায় কিছু সিদ্ধান্ত সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক ফল দিয়াছিল। তাহার মধ্যে ছিল এক বত্সরের অটো প্রমোশন, ৩০০ নম্বরের একটা সংক্ষিপ্ত পরীক্ষা লইয়া ম্যাট্রিকুলেশন সার্টিফিকেট দেওয়া হইয়াছিল। সেই বত্সর চারটি পরীক্ষায়ই অবাধ ও সীমাহীন উন্মুক্ত পরীক্ষা হইয়াছিল, যাহার কারণে মেধার স্বাভাবিক মূল্যায়নও ওলটপালট হইয়া গিয়াছিল। সুতরাং পূর্বের এই অভিজ্ঞতা হইতে আমাদের শিক্ষা লওয়া প্রয়োজন।