একটি আন্তর্জাতিক সনদ বাস্তবায়নে বাধা ও বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট

মাহের ইসলাম

ইতিহাসে নিশ্চয় আদি আর নব্য বলে কিছু থাকার সুযোগ নেই। কারণ, ইতিহাস বদল হওয়া বা নতুন সংস্করণে রূপান্তরের অবকাশ অসম্ভব। কিন্তু ইদানীং কিছু কিছু কাণ্ডকারখানা দেখে এমন প্রশ্ন থেকে বিরত থাকার উপায় বের করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বস্তুত শতবর্ষের পুরোনো ইতিহাস বদলানোর কোনো সুযোগ না থাকলেও, কিছু উত্সাহী ব্যক্তিকে প্রাণান্তকর প্রচেষ্টায় নিরন্তর নিয়োজিত দেখা যাচ্ছে, আদি ইতিহাসের একটি নব্য সংস্করণ প্রকাশ করতে। যেখানে ইতিহাসের পরিবর্তন ঘটানোর প্রয়াস রয়েছে, অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে। দীর্ঘ প্রায় দুই শতক ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত অবাঙালিদের পরিচয় বদলানোর অপপ্রচেষ্টাকে উদ্দেশ্য করেই এই কথাগুলোর অবতারণা।

পার্বত্য অঞ্চলের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলসমূহের নিজেদের মধ্যকার বিবাদের বিষয়ে প্রায় সবাই কমবেশি অবগত। বিবাদের মাত্রা এতটাই চরম পর্যায়ের যে, হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নেহায়েতই কম নয়। ঘৃণার পারদ কোন উচ্চতায় পৌঁছলে, মানুষ শবযাত্রীদেরও হত্যা করতে পারে সেটা সহজেই অনুমেয়। তবে অবাক করার বিষয় হচ্ছে, নিজেদের অন্তঃকলহের এহেন ভয়াবহতা সত্ত্বেও তিনটি বিষয়ে সব আঞ্চলিক দলের দৃষ্টিভঙ্গি একই রয়েছে। সেই তিনটি বিষয় হলো: ১. পার্বত্য অঞ্চলে ভূমির মালিকানা, ২. আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি, ৩. বাঙালিদেরকে পার্বত্য অঞ্চলের বাইরে প্রত্যাবাসন।

এই তিনটি বিষয়ের মধ্যে ‘আদিবাসী’ ইস্যুটি সর্বাধিক গুরুতর বলে বিবেচিত। যা কিনা আপাতদৃষ্টিতে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ হতে ‘আদিবাসী’ হতে চাওয়ার মতো একটা সাদামাটা স্ট্যাটাস পরিবর্তন বলে মনে হতে পারে অনেকের কাছেই। যদিও এটি পার্বত্যাঞ্চলের সমস্যাসমূহের মধ্যে অতি সাম্প্রতিক সংযোজন। মূলত ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ‘আদিবাসী জনগণের অধিকার বিষয়ে জাতিসংঘের ঘোষণাপত্র ২০০৭’ গৃহীত হওয়ার পর থেকেই পার্বত্যাঞ্চলের নেতৃবৃন্দ এবং দেশের কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তি এই বিষয় নিয়ে অস্বাভাবিক রকমের সরব হয়ে ওঠেন। এই ঘোষণাপত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইএলও কনভেনশন ১৬৯-এর যোগসূত্র অবিচ্ছেদ্য।

দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের সশস্ত্র বিদ্রোহের সমাপ্তিতে যে ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তি করা হয়েছিল, সেখানে পাহাড়ের অবাঙালিরা নিজেদেরকে ‘উপজাতি’ হিসেবেই পরিচিত করেছিলেন। আরো পেছনে তাকালে দেখা যায়, যুগে যুগে বিভিন্ন নামে অভিহিত হলেও, ইতিহাসের কোনো সময়েই , কোনো ব্যক্তিই এদেরকে কখনোই ‘আদিবাসী’ (Indigenous) বা ‘আদিম অদিবাসী’ (Aborigines) বা ‘ভূমিপুত্র’ (Son of the Soil) হিসেবে দাবি করেননি। বিভিন্ন সময়ে, পাহাড়ের উপজাতিদের যে পরিচিতি পাওয়া যায়, তার কয়েকটি উদাহরণ দেয়া হলো:

১. পার্বত্যাঞ্চলে শিক্ষকতায় নিয়োজিত থেকে প্রায় চার বছর ধরে তথ্য সংগ্রহ করে  সতীশ চন্দ্র ঘোষ ১৯০৯ সালে প্রকাশ করেন ‘চাকমা জাতি (জাতীয় চিত্র ও ইতিবৃত্ত)’ বইটি । যা কিনা, চাকমা জাতির ইতিহাসের এক মহামূল্যবান আঁকড়গ্রন্থ  হিসেবে পরিগণিত। এই বইয়ে পার্বত্যাঞ্চলের উপজাতীয়দের ‘পাহাড়ি’ (hill men) হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। ২. ১৯০৬ সালে কলকাতা হতে প্রকাশিত, এস এইচ হাচিনসন-এর ‘অ্যান অ্যাকাউন্ট অব চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস’ বইয়ে, পাহাড়িদেরকে ‘ট্রাইব’ (Tribe) হিসেবে অভিহিত করেছেন। ৩. ১৯৬৯ সালে রাঙ্গামাটি হতে প্রকাশিত বিরাজ মোহন দেওয়ানের ‘চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত’ বইয়ে (দ্বিতীয় সংস্করণ, ২০০৫), পাহাড়ের অধিবাসীদের পাহাড়ি এবং উপজাতি উভয় অভিধাতেই ভূষিত করা হয়েছে। ৪. শ্রী কামিনী মোহন দেওয়ান-এর ‘পার্বত্য চট্টলের এক দীন সেবকের জীবন কাহিনী’ পুস্তকে, পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়দেরকে পাহাড়ি পরিচয়েই পরিচিত করানো হয়। ৫. বাংলা ১৩৯২ সালে কলকাতা হতে প্রকাশিত সিদ্ধার্থ চাকমার ‘প্রসঙ্গ ঃ পার্বত্য চট্টগ্রাম’ বইয়ে পাহাড়িদের উপজাতি হিসেবেই  অভিহিত করা হয়। ৬. ১৯৯৩ সালের জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা রচিত ‘ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে পার্বত্য স্থানীয় সরকার পরিষদ’ বইয়েও উপজাতি শব্দটিই ব্যবহার করা হয়েছে। “১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৩ ইং রাঙ্গামাটিতে প্রদত্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবর রহমানের একটি উক্তিকে অপব্যাখ্যা করে জনসংহতি সমিতি উপজাতীয় জনগণের সমর্থন আদায় করতে সমর্থ হয়। উপজাতীয়রা বাঙালি বলতে বাঙালি মুসলমানদের বুঝে। জনসংহতি সমিতি শেখ মুজিবের উপরোক্ত বক্তব্যকে অপব্যাখ্যা করে বলেছে যে, তিনি উপজাতীয় জনগণকে বাঙালি আখ্যা দিয়েছেন। অর্থাত্ ভবিষ্যতে উপজাতীয়দের সবাই বাঙালি বা মুসলমান হতে হবে। সবাইকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য করা হবে।” (চাকমা জ. ব., ১৯৯৩, পৃষ্ঠা. ৫২)।

দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং সার্বিক বিবেচনায় রাষ্ট্রের স্বার্থের বিপক্ষে যাচ্ছে বলেই পৃথিবীর অনেক দেশই আইএলও কনভেনশন-১৬৯ অনুমোদন করেনি। প্রতিবেশী ভারতে ৭০৫টি স্বীকৃত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী রয়েছে। ২০১১ সালের শুমারি অনুযায়ী, প্রায় ৮.৬ শতাংশ জনগোষ্ঠী, যারা ৩০টি প্রদেশে ছড়িয়ে বসবাস করে, এই নৃ-গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। এদের স্বার্থ রক্ষায় বিভিন্ন আইন এবং সাংবিধানিক রক্ষাকবচ থাকলেও ভারত নিজের দেশে ‘আদিবাসী’ কনসেপ্ট স্বীকার করে না। তাই, আইএলও কনভেনশন-১৬৯ অনুমোদন করেনি। (AIPP & ZIF, 2017)

অস্ট্রেলিয়া জাতিসংঘের ২০০৭ সালের ঘোষণাপত্রের বিপক্ষে ভোট প্রদানকারীদের মধ্যে অন্যতম। তারা এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করার পেছনে অনেকগুলো কারণ উল্লেখ করেছে। যেমন, আত্মনিয়ন্ত্রণের ভুল ব্যাখ্যা দেয়া হতে পারে, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক সম্পত্তির অপব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে, ভূমি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের বাস্তবতা অনুধাবনে ব্যর্থতার সুযোগ রয়েছে, সম্মতি গ্রহণের বাধ্যবাধকতায় রাষ্ট্রের সব বিষয়ে ভেটো দেয়ার প্রবণতা সৃষ্টি হতে পারে। এমনকি তাদের নিজেদের স্বার্থে গৃহীত অর্থনৈতিক বা প্রশাসনিক পদক্ষেপসমূহ বিরোধিতার মুখোমুখি হতে পারে। দেশের সংবিধানের সঙ্গে বেমানান এবং চলনসই নয় বিধায় কানাডা এই ঘোষণাপত্রের বিরোধিতা করেছে। কানাডা সরকারের ভাষ্যমতে, দেশের সংবিধানে স্বাধীনতা এবং অধিকারের যে বিধান রয়েছে, জাতিসংঘের এই ঘোষণাপত্র তার সঙ্গে চলনসই নয়। এর কয়েকটি আর্টিকেল নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে যে, এগুলো আদিবাসীদের এমন কিছু অধিকার দিয়েছে যা রাষ্ট্রের মৌলিক গঠনতন্ত্রের সঙ্গে চলনসই নয়। এমনকি, মন্তব্য করা হয়েছে যে, এটি পশ্চিমা গণতন্ত্র অনুসরণকারী কোনো সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক সরকারের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে না। সমালোচনা করে বলা হয়েছে যে, কানাডাতে আদিবাসীদের অধিকার অন্যদের অধিকার খর্ব করতে পারে না। কারণ, এই দেশে ২০০ থেকে ৩০০ বছর ধরে অন্যরাও আদিবাসীদের সঙ্গেই পশু শিকার করেছে এবং মাছ ধরেছে।

বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে, জাতিসংঘ আদিবাসীবিষয়ক স্থায়ী ফোরামের আদিবাসীদের অধিকার সংক্রান্ত ঘোষণাপত্র ২০০৭-এ আদিবাসীর সংজ্ঞা স্পষ্ট না করেই, তাদের বিভিন্ন ধরনের অধিকার এবং সুবিধাদির কথা বিবৃত হয়েছে। অন্যদিকে, যে কোনো সংখ্যালঘু ব্যক্তিকেই তার ইচ্ছে মতো নিজেকে আদিবাসী বা উপজাতি ঘোষণা করার এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। (UN, 2017) তাই একথা বলা যেতেই পারে যে, সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত না করে এবং নিজেদের আত্মচিহ্নিতকরণের সুযোগ দিয়ে আদিবাসী তকমাটিকে বিশেষজ্ঞ তথা সুযোগসন্ধানী চক্রের কুক্ষিগত করার পথ খোলা রাখা হয়েছে। হয়তো এগুলো বিবেচনা করেই পৃথিবীর অনেক দেশই এই কনভেনশন ও ঘোষণাপত্র অনুমোদন করেনি।

অপরদিকে, আমাদের দেশের কিছু স্বার্থান্বেষী মহল ২০০৮ সালের শুরু থেকেই ‘আদিবাসী’ দাবি আদায়ের জন্যে আদাজল খেয়ে ময়দানে নেমে পড়ে। ২০০৭ সালের পূর্ব পর্যন্ত যে পার্বত্য চট্টগ্রামের কোনো আঞ্চলিক দল বা কোনো নেতাই আদিবাসী’র স্বীকৃতি চায়নি, সেই পার্বত্য চট্টগ্রামে হঠাত্ করেই সবাই আদিবাসী হওয়ার দৌড়ে শামিল হয়ে গেলেন। এর কারণ মানবাধিকার বা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করা নয়, বরং সুদীর্ঘ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেওয়া।

যথেষ্ট প্ররোচনা সত্ত্বেও, বাংলাদেশ সরকার আদিবাসী বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুল করেনি, বরং বিজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে এবং আইএলও কনভেনশন-১৬৯ এবং জাতিসংঘ ঘোষণাপত্র-২০০৭ অনুমোদন (ratify) না করে বাংলদেশকে বিশ্বের অনেক প্রভাবশালী দেশের কাতারে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছে। সরকারের এই প্রজ্ঞার যথোপযুক্ত বাস্তবায়ন করাই বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এই গুরুদায়িত্ব পালনে সরকারের পাশাপাশি দেশের সবাইকেই এগিয়ে আসতে হবে।

n লেখক : গবেষক