মো. রাশেদ আহমেদ
বর্তমান বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের মধ্যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বেশকিছু ইস্যু নিয়ে উত্তাপ ছড়িয়েছে। ভারত-চীন লাদাখ সীমান্তে চরম উত্তেজনা প্রশমিত না হতেই আবার নতুন করে বিশ্বের দুই অর্থনীতিক পরাশক্তি দেশ যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের কূটনীতিক টানাপোড়েন এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হট ইস্যু। যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের ঐতিহাসিক বীজ বপন করেছিলেন ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় তত্কালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিনজার অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে চীন সফরের মধ্য দিয়ে। এরপর ১৯৭২ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন চীন সফর করলে এক ঐতিহাসিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে দুই দেশ। উল্লেখ্য, চীন জাতিসংঘের স্থায়ী আসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র অকুণ্ঠিত সমর্থন ছিল। ফলশ্রুতিতে তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক বিস্তার রোধে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। দুই দেশের বন্ধুত্বের সম্পর্কের দীর্ঘ পাঁচ দশক অতিক্রম করলেও কোনো দেশ তার নীতিগত সিদ্ধান্তের তেমন বড় কোনো পরিবর্তন চোখে পড়েনি। কারণ হিসেবে উভয় দেশের বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং সাময়িক শক্তি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছিল। কিন্তু বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অতীতের সকল নীতি প্রথাকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে তীব্র চীনবিরোধী নীতি গ্রহণ করেছেন। যার ফলে ২০১৯ সালের শুরুর দিকে বাণিজ্যযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। এতে চীনের ক্ষতি হয় ১০০ বিলিয়ন ডলার। খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতির পরিমাণ কম নয়। বাণিজ্যিকযুদ্ধের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থান হারিয়েছে ৩-৪ লাখ লোক। যদিও বাণিজ্যিকযুদ্ধের ইতি টানে শুভবুদ্ধির প্রমাণ দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। বর্তমান চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নজিরবিহীন তলানিতে পৌঁছেছে। গত ২২ জুলাই বুধবার টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে হিউস্টনে চীনা কনস্যুলেট বন্ধের নির্দেশ দেয় মার্কিন সরকার। পর্যায়ক্রমে, অন্য দূতাবাস বন্ধেরও ইঙ্গিত দেয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রে চীনের মোট পাঁচটি দূতাবাস রয়েছে। একে ‘রাজনৈতিক চরম উসকানি এবং কূটনীতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত’ হিসেবে উল্লেখ করে চীন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও অভিযোগ করেছেন, ‘চীন বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ ‘চুরি’ করছে বিধায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপে লক্ষাধিক মানুষ বেকার হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। পালটা পদক্ষেপ হিসেবে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর শেংদুতে মার্কিন দূতাবাস বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে কমিউনিস্ট শাসিত চীন সরকার। চীন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বর্তমান পরিস্থিতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করে। বেইজিংভিত্তিক গবেষণা সংস্থা, সেন্টার ফর চায়না অ্যান্ড গ্লোবালাইজেশনের তথ্য মতে, ১৯৭৯ সালে কূটনীতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর বর্তমানে সবচেয়ে খারাপ সম্পর্ক বিরাজ করছে দুই দেশের মধ্যে। এখন কোভিড-১৯ ভাইরাস প্রসঙ্গ কিছুটা উল্লেখ করা যেতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসকে শুরু থেকেই চীনা ভাইরাস হিসেবে উল্লেখ করে বলেন চীনের উহান ল্যাবরেটরি থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে চীন সারা বিশ্বে এই ভাইরাস ছড়িয়েছে। চীন বরাবরই এই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব অস্বীকার করেছে। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট এর সত্যতার প্রমাণ দিতে পারেনি। এমনকি চীনা ভাইরাসের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠন এবং চীনকে একঘেয়েমি করে রাখতে তত্পর ট্রাম্প প্রশাসন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হঠাত্ কেন এত তীব্র চীনবিরোধী নীতি গ্রহণ করল? বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, নভেম্বরে মার্কিন নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ঘরোয়া বিভিন্ন সমালোচনাকে পাশ কাটিয়ে চীনবিরোধী বৃহত্তর জনমতকে কাজে লাগাতে মরিয়া থাকবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমনকি বিশ্বে চীনে অর্থনীতির প্রভাব খর্ব করা এবং আগামীর বিশ্ব নেতৃত্বের চীনের হুমকি মোকাবিলায় বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্র-চীন বর্তমান পালটাপালটি পদক্ষেপ সন্দেহাতীত আগামীতে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের হুমকি। এ ধরনের হুমকি মোকাবিলার সামর্থ্য বিশ্বের নেই বললেই চলে। কারণ বিশ্বের অধিকাংশ দেশ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উভয় দেশের ওপর নির্ভরশীল। সুতরাং উদ্ধত আচরণ নয়, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র-চীনকে আলোচনার টেবিলে বসা ছাড়া বিকল্প পথ নেই। অন্যথায়, একবিংশ শতাব্দীর নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধের কবলে পড়বে গোটা বিশ্ব।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়