করোনা বিপর্যয়ের মধ্যে বন্যার হানা

শামীমা আক্তার তন্দ্রা

বাংলাদেশ এখন এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। এক দিকে করোনার থাবা অন্য দিকে বন্যা। গত বছর ডেঙ্গুর কারণে বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কিন্তু এ বছর ডেঙ্গুর বদলে এসেছে করোনা। যদিও করোনা এক বৈশ্বিক মহামারি। বাংলাদেশের মানুষও রক্ষা পায়নি এই মহামারি থেকে। করোনার কারণে আজ বহু মানুষ কর্মহীনতায় ভুগছে। নিম্নআয়ের মানুষ না খেয়ে দিন অতিবাহিত করছে। শিক্ষিত বেকারদের কথা নাই বা বললাম। তারা না পারছে কোনো চাকরির পরীক্ষা দিতে, না পারছে গ্রামে দীর্ঘদিন অবস্থান করে কৃষিকাজ করতে। অপর দিকে কৃষকরা যে উঠে দাঁড়াবে সেটাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বন্যার কারণে। দেশের বেশির ভাগ ফসল উত্পাদন হয় উত্তরবঙ্গে আর সেখানে প্রতি বছরই বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হেনে চলেছে। এ বছরও এই শত্রু আঘাত হানতে ভোলেনি। বন্যাদুর্গত বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ক্ষতিগ্রস্তরা বলেছেন, মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রকোপের মাঝে বন্যায় তারা চরম অসহায় পরিস্থিতিতে পড়েছেন। শুধু উত্তরবঙ্গ নয় রাজধানীর ঢাকার নিচু এলাকাগুলোর দিকে বন্যা ধেয়ে আসছে এবং মধ্যাঞ্চলের জেলাগুলোতে ব্যাপক অবনতি হচ্ছে। পদ্মায় ভাঙন ধরেছে। এখনো থামছে না। উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামের কাজিয়ার চর এলাকায় এমনও পরিবার আছে যারা কি না এক মাসের বেশি সময় ধরে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নৌকায় বাস করছেন। অনেকে চোখের সামনে তাদের ঘরবাড়ি সর্বস্ব বিলীন হতে দেখেছেন এই নদী ভাঙনের কারণে। এই দুর্ভিক্ষপীড়িত অসহায় মানুষরা পড়েছে চরম বিপাকে। করোনার জন্য লকডাউন গেল এখন আবার বন্যা। মানুষের কোনো কাজ নেই। সরকারি ত্রাণ দিয়ে আর কতদিন সংসার চালানো যায়। তাছাড়া বন্যার কারণে সাপের উপদ্রব বেড়ে গিয়েছে। সেই সঙ্গে ডায়রিয়ার মতো রোগব্যাধি তো আছেই। ১৯৯৮ সালে বন্যা দুই মাসের বেশি সময় স্থায়ী ছিল। এবার এক মাসের বেশি সময় ধরে বন্যা চলছে। এই বন্যা স্থায়িত্বের দিক থেকে ৯৮ এর পর দ্বিতীয়। বন্যায় প্লাবিত বিভিন্ন এলাকায় কমেনি বন্যার পানি। মাদারীপুরে বন্যার কড়াল গ্রাসে ভেঙে যাচ্ছে বিভিন্ন স্থাপনা। টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জের অবস্থা দিনে দিনে খারাপ হচ্ছে। ভারত ও নেপালের পানির কারণে মূলত আমাদের বন্যার প্রকোপটা বেশি। মুন্সিগঞ্জে বন্যার পানি কিছুটা কমে যাওয়ার কারণে রাস্তাঘাটের ভাঙন চোখে দেখা যাচ্ছে। সরকারি হিসাবে ৩১টি এই বন্যায় এ পর্যন্ত ৪১ জনের মৃত্যু হয়েছে। বাংলাদেশে এবারের বন্যায় এখন পর্যন্ত প্রায় অর্ধকোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে সরকারি হিসাবেই বলা হচ্ছে। শুধু উত্তরবঙ্গেই নয় বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, এখন রাজধানীর ঢাকার নিচু এলাকাগুলোর দিকে বন্যা ধেয়ে আসছে এবং মধ্যাঞ্চলের জেলাগুলোতে অবনতি হচ্ছে। ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে দিনে দিনে। তাছাড়া বন্যাকবলিত এলাকার মানুষ গবাদিপশু নিয়েও বিপদে রয়েছেন। এবার তিন দফায় আঘাত হেনেছে বন্যা। বাংলাদেশে ৩১টি জেলায় করোনা ভাইরাস এবং বন্যা—এই দুটি দুর্যোগ এক সঙ্গে মোকাবিলা করাটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশে বন্যা সংঘটিত হয়। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বন্যা দেখা দেয়।

এদেশে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা এ প্রধান তিনটি নদীর মিলনস্থলে অবস্থিত পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ বাংলাদেশ। যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ছয়-সাত মিটার উঁচু। ফলে বর্ষাকালে যখন তিনটি নদীর বিশাল অববাহিকায় পানি এক সঙ্গে এসে পড়ে তখন বাংলাদেশে পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পায়। ফলে তা থেকে বন্যার সৃষ্টি হয়। বর্তমানে যেসব বেড়িবাঁধ আছে সেগুলো আরো উঁচু করতে হবে। নদীর পাড়সহ সারা দেশে প্রচুর গাছ লাগাতে হবে। তাছাড়া বন্যাদুর্গতদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে যাতে তারা দুর্যোগের সময় এখানে আশ্রয় নিতে পারে। বন্যার স্থায়ী সমাধানের ওপর নির্ভর করছে এ দেশের মানুষের স্বস্তি ও শান্তি। করোনার মধ্যে বন্যা আমাদের ওপর সত্যিই একটা ব্যাপক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে। অর্থনৈতিকভাবে আমরা বিপর্যস্ত হয়েছি। তবে ভেঙে পড়লে চলবে না আমাদের। কারণ রাত যত গভীর হয় সকাল তত সন্নিকটে আসে। এই মুহূর্তে আমাদের উচিত হবে, ভেঙে না পড়ে মনে সাহস রাখা ও ধৈর্য ধারণ করা এবং সবাই মিলে করোনা রোগী ও বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়ানো। মহামারি করোনা ও বন্যার মাঝেই আমাদের যার যার অবস্থান থেকে আশার আলো খুঁজে নিতে হবে। করোনা বিপর্যয়ের মধ্যে বন্যার হানা, তবুও আমরা আশার আলোর স্বপ্ন দেখতে ভুলবো না।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়