চট্টগ্রামে ১৫৪ হাসপাতালে বর্জ্য শোধনের ব্যবস্থা নেই

চট্টগ্রামে হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিশোধন ব্যবস্থা নেই। চট্টগ্রাম মহানগরীতে ৯১টি হাসপাতাল ও ক্লিনিক এবং জেলার ৬৩টি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে পরিবেশ আইন ও মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নীতিমালার কোনো প্রকার তোয়াক্কা না করেই চলছে। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, জেনারেল হাসপাতালসহ সরকারি পাঁচটি হাসপাতাল, কয়েকটি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালসহ মহানগর ও জেলার ১৫৪টি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের মধ্যে মহানগরীর দুই-তিনটি হাসপাতালে মেডিক্যাল বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা গড়ে তুললেও তা নিয়মিত পরিচালনা করা হয়নি বলে জানা যায়।

একইভাবে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫, বিধিমালা ১৯৯৭ এবং মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০০৮ প্রতিপালনে বাধ্য করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহের উদাসীনতা ও অবহেলা দায়ী বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। কারণ হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর লাইসেন্স পেতে এবং নবায়নের ক্ষেত্রে উপরোক্ত আইন ও বিধিমালা মানার বিধান রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে করোনা ভাইরাসের প্রার্দুভাব এবং এর চিকিত্সা নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতাল, ক্লিনিক ও প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম এবং দুর্নীতির তথ্য উদ্ঘাটন হওয়ায় পুরো চিকিত্সা ব্যবস্থার দিকে সবার নজর পড়ে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শীর্ষ ব্যক্তিদের ইতিমধ্যে সরিয়ে কিংবা বদলি করা হয়েছে। ফলে ঢাকার বাইরেও হাসপাতাল ও ক্লিনিকের লাইসেন্সসহ স্বাস্থ্যবিষয়ক আইনকানুন কতটুকু অনুসরণ করছে            তা দেখতে নড়চড় শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক হাসান শাহরিয়ার কবির ইত্তেফাককে জানান, হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোকে তিন সপ্তাহ সময় দিয়ে তাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিশোধন কর্মকাণ্ড শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হাসপাতাল ও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে প্রত্যক্ষ কর্মকাণ্ড দেখাতে না পারলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তর এবং বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে চট্টগ্রামের হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে কোনো প্রকার তরল ও কঠিন বর্জ্য পরিশোধনের ব্যবস্থা না থাকায় নাগরিকের রোগ নিরাময়ের পরিবর্তে এসব প্রতিষ্ঠান অধিক হারে রোগ বিস্তারের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অভিমত। হাসপাতাল বর্জ্যে রয়েছে বিভিন্ন রোগ-জীবাণু ও তেজস্ক্রিয় পদার্থযুক্ত তরল ও কঠিন বর্জ্য। হাসপাতালে অপারেশন রোগীর বর্জ্য, প্যাথলজি বর্জ্য, ক্যানসার রোগীর বর্জ্য, থেরাপিসহ তেজস্ক্রিয় পদার্থজনিত চিকিত্সার বর্জ্য প্রতিনিয়ত রোগীর কাপড় ও অন্যান্য সামগ্রীর ধোয়া পানিসহ বহুবিধ জীবাণুযুক্ত ক্ষতিকর পদার্থবাহী কঠিন ও তরল বর্জ্যের তেমন কোনো ব্যবস্থাপনা ও পরিশোধনের ব্যবস্থা নেই। এতে করে এসব ক্ষতিকর জীবাণুবাহী বর্জ্যের বিরূপ প্রভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে মানবদেহ, জলজ, ভূ-উপরিস্থ, ভূগর্ভস্থ প্রাণী এবং উদ্ভিদ জগত্। ফলে পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। হাসপাতালের তরল ও কঠিন বর্জ্যবাহী জীবাণু নালা-নর্দমা, খালবিল হয়ে যত্রতত্র ছড়িয়ে পড়ছে। বর্তমানে হাসপাতালের কঠিন বর্জ্যসমূহ কোনো সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ছাড়াই চট্টগ্রামের সেবা সংস্থা নামে একটি প্রতিষ্ঠান সিটি করপোরেশন থেকে অনুমতি নিয়ে কোনো প্রকার স্বাস্থ্যবিধি না মেনে ড্রাম ভর্তি করে কাভার্ড ভ্যানে করে নগরীর হালিশহর এলাকায় ময়লার ডাম্পিং ইয়ার্ডে নিয়ে যাচ্ছে। কতিপয় পরিচ্ছন্নতাকর্মী কোনো নিরাপদ ও সুরক্ষাসামগ্রী (পিপিই) পরিধান না করে নগরীর বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ঘুরে ঘুরে বর্জ্য সংগ্রহ করে থাকে। এতে করে পরিচ্ছন্নতাকর্মী ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একইভাবে আশপাশের লোকজনকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা শফিকুল মান্নান সিদ্দিকী জিসু জানান, তাদের ডাম্পিং স্টেশনে এসব বর্জ্য পরিশোধনের কোনো ব্যবস্থা নেই।

অন্যদিকে, হাসপাতালের তরল বর্জ্যসমূহ নালায় ফেলার কারণে নগরবাসী প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে পড়ছে। বর্তমানে অধিকাংশ হাসপাতাল কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিত্সা দিয়ে আসছে। কোভিড রোগীদের ব্যবহূত পোশাকসহ চিকিত্সা ব্যবস্থার ফলে সাধারণ নাগরিকরা আরো ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কারণ তাদের চিকিত্সাবর্জ্যেরও সঠিক কোনো পরিশোধন ব্যবস্থা না থাকায় পরিবেশ দূষণসহ নাগরিক স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার বেশি সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।

চট্টগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বী ইত্তেফাককে বলেন, ‘হাসপাতালগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিশোধনের ওপর তারা জোর দিচ্ছেন।’ তিনি বলেন, প্রত্যেক হাসপাতালকে পরিশোধন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। চট্টগ্রাম মহানগরীর পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মো. নূরুল্লা নূরী বলেন, ‘হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর ইতিপূর্বে লাইসেন্স নবায়নের সময় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিশোধন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য ছয় মাস সময় দেওয়া হয়েছিল। কোভিড পরবর্তী আবার তাদেরকে পরিশোধন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য চিঠি দেওয়া হবে। ’