‘লকডাউন ও অন্যরকম ঈদ’

করোনার এই সময়টাতে এমনি কেটে গেল ২টি ঈদ। এর মাঝেও ঈদের আনন্দ থেমে ছিল না। আর তাই স্বপ্নইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন আয়োজন করেছিল ‘লকডাউন ও অন্যরকম ঈদ’ নামে একটি ইভেন্ট, যাতে অংশগ্রহণ করে অনেকেই জানিয়েছেন তাদের নিজেদের ঈদের অভিজ্ঞতা। আর তার মধ্য থেকে নির্বাচিত প্রথম তিনজন এর লেখার আজ দ্বিতীয় লেখাটি ছাপানো হলো-

স্বপ্ন! মানুষ স্বপ্ন দেখে কারণ স্বপ্ন মানুষকে বাঁচতে শেখায়। হাজার উঠতি পড়তিতে ফের উঠে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়। আমিও স্বপ্ন দেখেছিলাম ভালোভাবে পড়াশোনা শেষ করবো, চাকরি পেয়ে প্রথম বেতন আম্মু আব্বুর হাতে এনে দিয়ে বলবো-’তোমাদের অবসর নেয়ার সময় হয়েছে’। কিন্তু আমার স্বপ্ন ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসেই স্বহস্তে কাফনের কাপড় পড়িয়ে আম্মুকে নতুন ঘরে পাঠাতেই অর্ধ অপূর্ণতা পেয়ে গেল।

নিজের মধ্যে অনেকটা পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম। আগের মতো সুযোগ পেলেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাসায় আসা প্রায় বন্ধ করে দিলাম। যতটা সম্ভব দিন রাত নিজেকে পড়াশোনা, ল্যাব ও স্বেচ্ছাসেবী কাজে ব্যস্ত করে তুললাম। দেখতে দেখতে মার্চ মাস চলে এলো। একদিন ফেসবুকে দেখলাম চীনে করোনা ভাইরাসের প্রকোপ। মার্চের মাঝামাঝি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সবাই যে যার বাসার পথে পাড়ি জমালাম। ভেবেছিলাম হয়তো অল্প কিছুদিনেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে, খুব বেশিদিন বাসায় থাকা লাগবে না। কিন্তু আমরা যা ভাবি তা আসলে ঘটে না।

বাংলাদেশে লকডাউন সেই সাথে পবিত্র রমজান মাস চলে এলো। চারিদিকে আতংক ছড়িয়ে পড়লো। সকলের সব কাজ বন্ধ। রাস্তায় গাড়ি নেই, বাস নেই, চিরচেনা ঢাকা শহরের নেই সে যানজট, নেই জনগণের রাস্তাঘাটে চলাফেরায় যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলার প্রবণতা কারণ সকলে এক অদৃশ্য ভাইরাসের ভয়ে ঘরেবন্দি। আমার কাছে এক দিক থেকে মনে হয়েছে প্রকৃতি সবাইকে ঘরবন্দি করে নিজেকে মানুষের বসবাসের যোগ্য করার জন্য ছুটি নিয়েছে। তবে প্রত্যেক ঘটনার ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিক আছে বলে আমি বিশ্বাস করি।

প্রথমদিকে আক্রান্ত সংখ্যা শনাক্ত কম হলেও দিন দিন উর্ধ্বগতিতে বহু মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতে শুরু করলো, তার চেয়েও কষ্টের আক্রান্ত ব্যক্তিদের পাওয়া কষ্টগুলো, দিন আনে দিন খায় মানুষগুলোর ক্ষুধার্ত আহাজারি,ডাক্তার ও স্বেচ্ছাসেবীদের সামনে থেকে সাধারণ মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা তবুও পর্যাপ্ত যোদ্ধার অনুপস্থিতির জন্য অন্যান্য রোগী এবং সাধারণ মানুষের নিত্যজীবনের ব্যাঘাত। ভাবছেন আমি আমার ঈদের কথা না বলে এত কষ্টের কথা কেন তুলে ধরছি? কারণ অন্ধকার ঘরে গা এলিয়ে দিয়ে কিংবা বারান্দায় বসে বৃষ্টি দেখে দিন রাত আমি শুধু এসবই ভেবে গেছি।

প্রত্যেক বছর ঈদে গ্রামের বাড়ি যাওয়া হয়। আমি একটু অন্যরকম; কখনো নতুন জামা ঈদের দিন পড়ে বের হই না তবে ঈদ উপলক্ষে আম্মু জামা প্রতিবছরই কিনে দিতো। এবছর কিছুই কিনা হয়নি। গ্রামে গিয়ে চাঁদরাতে সন্ধ্যা থেকে বাড়ির ও এলাকার সকল বাচ্চা ও কিশোরীদের মেহেদী পড়ানো আমার দায়িত্ব থাকতো। এবার আমার নিজের হাতেও মেহেদী উঠেনি। পুরো রমজান মাস অনলাইনে স্বেচ্ছাসেবী হয়ে যারা এই করোনায় দুর্ভোগে আছে তাদের কাছে সাহায্য পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করে কিছুটা শান্তি খুঁজেছি। ঈদের দিন সকালে আব্বু আর বড় ভাই নামাজে যায় কিন্তু এবার তার কিছুই হয় নি। সবাই বাসায় সাধারণ একটি দিনের মতোই আরেকটি দিন কাটিয়েছি। তবে করোনা ভাইরাসের আগমনে আমরা কিছু শিক্ষাও পেয়েছি। পরিবারকে সময় দেয়া, একজন আরেকজনের কাছে থাকার অনুভূতি, পরিবেশ সংরক্ষণে সকলকে সচেতন হওয়া এবং নিজেদের স্বাস্থ্য সচেতনতা।

আসন্ন ঈদ-উল-আযহা র জন্যও কোন পরিকল্পনা নেই। ঈদ মানে আনন্দ। এই পৃথিবীর সবার জন্য ঈদ সেদিনই হবে যেদিন আর মাস্ক পড়ে বাইরে যেতে হবে না থাকবে না করোনা নামের অদৃশ্য কোনো কিছুর ভয়, যেদিন প্রাণ ভরে বাতাসের অক্সিজেন নিয়ে একে অপরের থেকে দূরে নয় বরং আলিঙ্গন করে আবার আমরা বাঁচার জন্য স্বপ্ন দেখবো।

আমি এখনো স্বপ্ন দেখি!

হ্যাঁ, এক সুস্থ পৃথিবীর।