ভয়াবহ বিস্ফোরণে বিধ্বস্ত বৈরুত

লেবাননে বিদেশি হস্তক্ষেপ বাড়বে!

২ হাজার ৭৫০ ম্যাট্রিক টন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট থেকে বিস্ফোরণে বিধ্বস্ত বৈরুত। অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট কেবল বৈরুতকেই বিধ্বস্ত করেনি, পুরো দেশ এবং এর সরকারকেও বিধ্বস্ত করেছে। বৈরুত এখন বিধ্বস্ত নগরী থেকে ক্রমেই বিক্ষোভের নগরীতে পরিণত হচ্ছে। সরকারের অবস্থা টালমাটাল। পরিস্থিতি এতটা খারাপ যে নাগরিকরা এখন নিজের দেশকে আরেক দেশের অধীনে দিয়ে দিতে আবেদন জানাচ্ছেন।

গত ৪ আগস্টের মতো এত বড় দুঃস্বপ্ন আগে কখনো বৈরুতবাসী দেখেনি। দেড় শতাধিক মানুষের অকালে প্রাণ গেছে। ৬ হাজারের বেশি মানুষ আহত। হতাহতদের মধ্যে বাংলাদেশিসহ অনেক বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন। নারকীয় ঘটনার তদন্ত চলছে। বাইরের হস্তক্ষেপ আছে কি না সেদিকেও তদন্তে নজর দেওয়া হচ্ছে। যদিও ভস্মীভূত ছাই থেকে কীভাবে আবার নতুন করে গড়ে উঠতে হয় বৈরুত তা জানে। শহরটির ৫ হাজার বছরের ইতিহাসে অনেকবারই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে যুদ্ধ, হামলা কিংবা ভূমিকম্প যাই হোক না কেন এতটা খারাপ অবস্থা আগে কখনো হয়নি।

প্রধানমন্ত্রী নিজেই জানিয়েছেন, গত ছয় বছর ধরে বন্দরের গুদামে এই পরিমাণ অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট মজুত করে রাখা হয়েছিল। ২০১৪ সালে একটি মালবাহী জাহাজে করে ঐ রাসায়নিক এসেছিল। কাগজপত্রে গন্ডগোল থাকায় বন্দর কর্তৃপক্ষ জাহাজের জিনিস বাজেয়াপ্ত করে। কথা ছিল নিলামের মাধ্যমে রাসায়নিক বাজারে ছেড়ে দেওয়ার। কিন্তু গত ছয় বছরে সেই কাজটি করা হয়নি, এমনকি সেখানে যথেষ্ট নিরাপত্তার ব্যবস্থা ছিল না। অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট জমিতে সারের, খনিতে ও বোমা তৈরিতে কাজে লাগে।

 

g বিদেশি শক্তির প্রভাব বাড়বে

ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক আরব সেন্টারের ফেলো জন ম্যাকারনের মতে, লেবানন ক্রমেই ব্যর্থ রাষ্ট্রের দিকে যাচ্ছে। এই বিস্ফোরণে লেবাননের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে বিদেশি শক্তির প্রভাব আরো বাড়বে। তাছাড়া বিস্ফোরণকে কাজে লাগিয়ে সরকার এবং বিরোধী দল উভয়ই তাদের প্রভাব আরো বাড়ানোর চেষ্টা চালাবে। হিজবুল্লাহও সরকারে বা সমাজে তাদের ক্ষমতা আরো বৃদ্ধির চেষ্টা চালাবে। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং ইরান তো সহায়তার জন্য বসে আছে। আবার বৈরুত বন্দর পুনর্গঠনের জন্য চীনের সহায়তা চাওয়া হতে পারে। জার্মানিও লেবাননে রাজনৈতিক সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে। আবার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ঋণ দিতে আরো দরকষাকষির সুযোগ পাবে।

ইতিমধ্যে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জানিয়েছেন, বৈরুতের সংস্কার কাজে ফ্রান্স সবরকম সাহায্য করবে। তবে একই সঙ্গে তার মতে, দেশের সরকার বড় রকমের সংস্কার না করলে লেবানন ক্রমশ ডুবতে থাকবে। প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ বৈরুত সফরে গিয়ে জানান, লেবাননের নেতাদের কাছে ‘একটি নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা’ প্রস্তাব করবেন। এরপর ১ সেপ্টেম্বর আবারও লেবাননে আসবেন। এর মধ্যে লেবাননের নেতারা প্রস্তাব বাস্তবায়ন না করলে তার দায়িত্ব তিনি নেবেন বলে বৈরুতের বাসিন্দাদের আশ্বস্ত করেন ম্যাক্রোঁ। মঙ্গলবার বৈরুত বন্দরে বিস্ফোরণের পর বুধবার ‘লেবাননকে আগামী ১০ বছরের জন্য ফ্রান্সের অধীনে নিন’ শীর্ষক এই পিটিশনে বলা হয়েছে, লেবাননের কর্মকর্তারা দেশ পরিচালনায় পুরোপুরি ব্যর্থ। তাই সুষ্ঠু পরিচালনা পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করতে লেবাননের ফ্রান্সের অধীনে যাওয়া উচিত। উল্লেখ্য, ১৯২০ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত লেবানন ফ্রান্সের অধীনে ছিল।

সরকার বিরোধী আন্দোলন ক্রমশ দানা বাঁধছে লেবাননে। তিন এমপি পদত্যাগ করেছেন। জর্ডানে লেবাননের রাষ্ট্রদূতও পদত্যাগ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, লেবাননে ক্ষমতার পরিবর্তন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। গত বছরই অর্থনীতির বেহাল দশা, সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। করোনাকালে সেই পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়েছে। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত চলা গৃহযুদ্ধের পর এখন লেবাননের অর্থনৈতিক অবস্থা সবচেয়ে খারাপ।