নির্বাচনের পর কোন পথে শ্রীলঙ্কা

শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন মাহিন্দা রাজাপক্ষে। প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপক্ষে তার আপন ভাই মাহিন্দা রাজাপক্ষেকে জয়ী বলে ঘোষণা করেছেন। আগামী ২০ আগস্ট সংসদের অধিবেশন ডেকেছেন প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া। কিছু দিনের মধ্যেই নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথগ্রহণ করবেন মাহিন্দার। এর ফলে শ্রীলঙ্কার শাসনক্ষমতা একটি পরিবারের হাতেই চলে গেল।

শ্রীলঙ্কার নির্বাচনে মোট ২২৫টি আসনে লড়াই হয়েছিল। তার মধ্যে মাহিন্দার দল একাই ১৪৫টি আসনে জয়ী হয়েছে। তার এসএলপিপি জোট সঙ্গীরা পাঁচটি আসনে জয়ী হয়েছে। ফলে মাহিন্দার জোট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। মাহিন্দার বিপরীতে লড়াই করা ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টির (ইউএনপি) নেতা রানিল বিক্রমাসিঙ্গের নির্বাচনের ভরাডুবি হলেও এই নির্বাচনে নতুন মুখ হিসাবে উঠে এসেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট রানাসিঙ্গে প্রেমাদাসার ছেলে সাজিথ প্রেমাদাসা। ইউএনপি থেকে বেরিয়ে এসে গঠন করা তার নতুন দল ‘সামাগাই জানা বালাবেগাবে’ (এসজেবি) ৫৪টি আসন পেয়ে সংসদে বিরোধী দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে।

এই নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে দিকে নজর ছিল এসএলপিপি জোটের। কেননা তাদের দলের রাজনৈতিক টার্গেটই ছিল সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সংবিধানের ১৯তম সংশোধনী বাতিল করে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সুসংহত করা। এই সংশোধনীটি মূলত প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও সংসদের ক্ষমতা নিয়ে বিভ্রান্তির একটা সমষ্টি মাত্র, যেখানে একটি প্রতিষ্ঠানকে আরেকটির ওপরে কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী একই দলের বা মতের না হলে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে সংকট তৈরি হয়। ১৯তম সংশোধনী মূলত সাবেক প্রেসিডেন্ট মৈত্রিপালা সিরিসেনা (এসএলএফপির প্রধান) এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী রানিল বিক্রমাসিঙ্গের (ইউএনপি দলের নেতা) মধ্যে বিরোধ তৈরি করেছিল। ফলে তিন বছরের মধ্যেই তাদের ‘সুশাসনের’ সরকার ধসে পড়েছিল।

নির্বাচনি প্রচারণায় এসএলপিপি জোট ১৯তম সংশোধনী বাতিলের ঘোষণা দিয়েছিল। ফলে এই জোটের সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন শ্রীলঙ্কায় বড় ধরনের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। মূলত সামনের দিনে মাহিন্দা রাজাপক্ষে ২০১০ সালে প্রেসিডেন্ট থাকাকালে উত্থাপন করা ১৮তম সংশোধনী ফিরে আসতে পারে শ্রীলঙ্কার সংবিধানে।

২০১৯ সালের নির্বাচনে তামিল ও মুসলিম ভোট ছাড়া গোটাবায়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া তাদের এই নীতিকে আরো বেপরোয়া করেছে। সম্প্রতি হয়ে যাওয়া নির্বাচনেও তারা কট্টর পন্থার আশ্রয় নিয়েছে। নির্বাচনের আগ মুহূর্তে এসএলপিপি সরকার ২০১৯ সালের ২১ এপ্রিলের বোমা হামলার ঘটনাটি পুনরায় তদন্তের ঘোষণা দেয়। এসএলপি সরকার এই তদন্তের ঘোষণা দিয়ে মূলত সহিংস ইসলামি জঙ্গিদের ব্যাপারে সিংহলি বৌদ্ধদের আতঙ্ককে উসকে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এছাড়া এসএলপিপির বর্তমান মন্ত্রিসভা স্বাধীনতার পর  মুসলিম প্রতিনিধি ছাড়া প্রথম মন্ত্রিসভা। তামিলরা যে ফেডারেল সংবিধান এবং তামিল অধ্যুষিত নর্থ ও ইস্ট অঞ্চলের জন্য সর্বোচ্চ স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানিয়েছে, এসএলপিপি সুনির্দিষ্টভাবে সেটা নাকচ করে দিয়েছে। তামিল দলগুলো জোর দিয়ে বলছে যে, জাতিগত প্রশ্নে বিদেশিদের হস্তক্ষেপ থাকতেই হবে, এসএলপিপি যেটাকে দেশবিরোধী মনে করে।

পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে এসএলপিপি আর বিরোধীদের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। প্রস্তাবিত মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ কর্পোরেশন কমপ্যাক্টের ভূমি ইস্যু এবং কথিত যুদ্ধাপরাধ ইস্যু নিয়ে এসএলপিপি প্রকাশ্যেই যুক্তরাষ্ট্র আর পশ্চিমা দেশগুলোর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কলম্বো বন্দরের ইস্টার্ন টার্মিনাল এবং ত্রিনকোমালি তেল ট্যাংকে ভারতের বিনিয়োগ নিয়েও ভারতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে ক্ষমতাসীন সরকার। এসএলপিপি যেখানে চীনপন্থি, সেখানে অন্যরা বেইজিংয়ের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন এবং মূলত পশ্চিমাপন্থি। এসএলপিপি জোটের নিরঙ্কুশ জয় শ্রীলঙ্কায় চীনা প্রভাব আরো বৃদ্ধি করবে।

কিন্তু বর্তমান ক্ষমতাসীন জোট যেভাবে তামিল ও মুসলিম সংখ্যালঘুদের অধিকারকে আমলে নিচ্ছে না, তাতে দেশে জাতিগত বিভাজন তৈরি হবে। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবশালী প্রতিবেশী ভারত ও শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে প্রভাবশালী যুক্তরাষ্ট্র এবং জাপানের সঙ্গে ভারসাম্য না করে এককভাবে চীনের দিকে ঝোঁকা শ্রীলঙ্কাকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নির্দিষ্ট অক্ষে নিয়ে যাবে। ইতিমধ্যে শ্রীলঙ্কায় হাম্বানটানা বন্দরে চীনের বিনিয়োগ নিয়ে নানা বিতর্ক ও ক্ষোভ রয়েছে। চীনের দিকে ঝুঁকে পড়া ও বৌদ্ধ ও সিংহল জাতীয়তাবাদে অন্য জাতিগোষ্ঠীর মতকে গুরুত্ব না দেওয়ার পলিসি শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়