মানুষ মানুষের জন্য

২০২০ সালের শুরু থেকেই দেশকে বিভিন্ন ধরনের প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। বছরের শুরুতেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনা ভাইরাস মহামারি আকার ধারণ করে। বাংলাদেশের জনগণের মধ্যেও কোভিড-১৯-এর সংক্রমণ নিয়ে আতঙ্ক বিরাজ করছিল। এই আতঙ্ক ও আশঙ্কার মধ্যেই ৮ মার্চ দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। যার ফলশ্রুতিতে একে একে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত, কলকারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। শুরুতে স্বল্প সময়ের জন্য ছুটি ঘোষণা করা হলেও ধাপে ধাপে তার মেয়াদ বাড়ানো হয়। এর ফলে জনজীবনে স্থবিরতা নেমে আসে, স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড হয় বাধাগ্রস্ত। দীর্ঘদিনের লকডাউনের ফলে শিল্পকারখানার উত্পাদন যেমন ব্যাহত হয়েছে, তেমনিভাবে মাঝারি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বিপুল পরিমাণ লোকসানের শিকার হয়েছেন। অনেকের ব্যবসা একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে। আবার প্রতিবছর পহেলা বৈশাখ ও ঈদকে কেন্দ্র করে যে অর্থনৈতিক জোয়ার সৃষ্টি হয়, সেটিরও পথ বন্ধ ছিল এবার। তাই সার্বিকভাবে এর ফল পড়েছে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর। এর সঙ্গে নিয়মিত করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা তো আছেই। বলা যায়, এ বছর চরম দুঃসময় পার করছে দেশবাসী।

করোনার এই সংকটকালীন সময়েই মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেশের উপকূলে আঘাত হানে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আম্ফান। মে মাসের ২০ তারিখে আঘাত হানা এই ঘূর্ণিঝড়ে হতাহতের সংখ্যা আগের সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়গুলোর তুলনায় কম হলেও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল অপূরণীয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী প্রাথমিক বিবরণীতে জানা যায়, আম্ফানে দেশের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা। অধিকন্তু টেলিফোন লাইন, বিদ্যুত্ সংযোগ, রাস্তাঘাটের ক্ষয়ক্ষতির ফলে সারা দেশের সঙ্গে উপকূলের যোগাযোগ ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একদিকে করোনার সংক্রমণ, অন্যদিকে ঘূর্ণিঝড়ের ফলে উপকূলের সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে আসে চরম আঁধার।

মার্চ-এপ্রিলে করোনার প্রাদুর্ভাব, মে মাসে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের পর বর্ষা আসার সঙ্গে সঙ্গে জুনের শেষ সপ্তাহ থেকে দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে বন্যা দেখা দিতে শুরু করেছে। পুরো জুলাই মাস জুড়ে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে আশঙ্কাজনকহারে। পাহাড়ি ঢল, ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে দেশের প্রবহমান নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে দ্রুতগতিতে। জাতিসংঘের অফিস ফর দ্য কো-অর্ডিনেশন অব হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাফেয়ার্সের (ওসিএইচএ) নিয়মিত ব্রিফিংয়ে দেওয়া তথ্যমতে, ১৯৮৮ সালের পর বাংলাদেশে এবারের বন্যা সবচেয়ে বেশি সময় ধরে স্থায়ী হতে পারে। এরই মধ্যে দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে নিরুপায় জীবনযাপন করছে। বন্যার প্রভাবে দেশে এ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক প্রাণহানি ঘটেছে। আবার পাহাড়ি ঢল ও বনজঙ্গল থেকে বিভিন্ন প্রজাতির বিষধর সাপ বন্যার পানির সঙ্গে মানুষের বসতবাড়ির কাছাকাছি চলে আসছে। এর ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানে সাপের কামড়ে সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি প্রতি বছরের মতো এবারও বজ পাতের কারণে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।

ঝড়, বন্যা কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত করোনা ভাইরাসের মতো সংকটে দেশের অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থায় যে ক্ষয়ক্ষতি ও স্থবিরতা নেমে আসে, সেটি মোকাবিলায় সরকারি পদক্ষেপের যেমন প্রয়োজন রয়েছে, পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও সামাজিক উদ্যোগেরও যথেষ্ট প্রয়োজন ও ভূমিকা রয়েছে। একটি দুর্যোগ যখন আসে, তখন সেটি শুধু কোনো নির্দিষ্ট এলাকা বা অঞ্চলকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং পুরো দেশের ওপরই তার আগ্রাসী প্রভাব পড়ে? তাই এ ধরনের দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠার জন্য জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার। দুর্যোগের এই ভয়াল দুঃসময়ে সমাজের সবাইকে একতাবদ্ধ হতে হবে। এ সময়ে সবার উচিত মানবিক সেবায় নিজেকে আত্মনিয়োগ করা। সমাজের বিত্তবানরা অর্থসাহায্য দিয়ে এবং তরুণ ও কর্মক্ষম ব্যক্তিরা শ্রমের মাধ্যমে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারেন। বন্যাকবলিত এলাকায় ব্যক্তিগত বা সাংগঠনিক উদ্যোগে ত্রাণসহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে? আবার চাইলে এলাকাভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবক দল তৈরি করে সরকারি ত্রাণ কার্যক্রমে প্রশাসনকে সহায়তাও করা যায়। যেসব পরিবার একেবারেই হতদরিদ্র বা যাদের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে, তাদেরকে সমবায় ভিত্তিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া যেতে পারে। এভাবে বিভিন্ন মানবিক উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে সমাজের সবাই মিলে দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। আর এজন্য দেশের সবাইকেই এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ‘মানুষ মানুষের জন্যে’।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়