দুটো ঈদ গেল। তার তাগে বৈশাখ। আগে এসব উৎসব মানেই ছিল রোজগেরে মানুষের জন্য বাড়তি আয়ের সুযোগ। কিন্তু এবারে তা হয়নি। উৎসবকেন্দ্রিক ব্যবসায় ধস নামিয়ে দিয়েছে করোনা। করোনার সঙ্গে বিশ্বমন্দা—দুই মিলিয়ে বড়দের মতো ছোট ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত।
অন্যদিকে, জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম সাধারণ মানুষও ক্রয়ক্ষমতা হারিয়ে নিস্ব প্রায়। পণ্যের উৎপাদক থেকে বিক্রেতা এবং ক্রেতা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত। অনেক ক্ষুদ্র—মাঝারি উদ্যোক্তার ব্যবসায় ফেরা অনিশ্চিত হয়ে গেছে। অপ্রাতিষ্ঠানিক কিংবা অসংগঠিত খাতেরও একই দশা। স্ট্রিট ফুড বিক্রেতা, হকার কিংবা স্বকর্মসংস্থানে জড়িতদের ঘুরে দাঁড়ানোর মতো অবস্থা আর নেই। তাই ঢাকার বিভিন্ন স্থানে দোকানগুলো আর খুলছে না। এসব অনেক দোকানই এখন নতুন দোকানীর আশায় টু লেট ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ভাড়া হচ্ছে না।
অতিক্ষুদ্র থেকে শুরু করে মাঝারি কিংবা বড়—সব খাতই ধরাশায়ী হয়েছে করোনার থাবায়। অপেক্ষাকৃত বড় অনেকেই সাময়িক পরিস্থিতি সামাল দিতে পারলেও ক্ষুদ্র—মাঝারি উদ্যোক্তারা আর টিকে থাকতে পারছেন না। ফলে, বাংলাদেশে দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি আরো বেড়ে গেল বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদগণ। তাদের মতে, অনানুষ্ঠানিক খাতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে। যার ফল বহু মানুষের কর্মহীন হয়ে পড়া। করোনার বিস্তার ঠেকাতে লকডাউন এবং দীর্ঘ মেয়াদে ছুটির কারণে দেশে বেকার বেড়েছে। কাজহীন হয়ে পড়েছেন বহু পরিবহনশ্রমিক, রিকশাচালক, দিনমজুর, হোটেল-রেস্তোরাঁকর্মী, ছোট দোকানদার। আর নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন। চাকরি হারানোর শঙ্কায় আছেন আরো অনেকে। এ ধরনের মানুষেরা রাজধানী ছাড়ছে এমন খবর এখন নিত্য দিনই দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, দেশের ৫ কোটি ১৭ শ্রমশক্তি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত রয়েছে। যা দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৮৫ ভাগ। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত হওয়ায় এই বিপুল পরিমাণ মানুষ রয়েছেন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়। লকডাউনের ফলে তারাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। দীর্ঘ মেয়াদে ছুটি পর জনজীবন স্বাভাবিক হওয়া শুরু হলেও অর্থনীতি গতি পায়নি। কর্মসংস্থানের স্থবিরতা না কাটালে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়বে এমনটাই আশঙ্কা অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০১৯ সাল শেষে বাংলাদেশের জাতীয় দারিদ্র্যের হার ছিল সাড়ে ২০ শতাংশ। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেম সম্প্রতি এক গবেষণায় বলেছে, যদি পরিস্থিতি এ রকম চলতে থাকে সে ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের আয় ২৫ ভাগ কমে গেলে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখা আরো ২০ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে। সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, যে কোনো দুর্যোগ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ওপরই সবার আগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। করোনা ভাইরাসের অভিঘাতও এই শ্রেণির শ্রমিকদের ওপরই প্রথমে পড়েছে। অথচ দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে এই অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের রয়েছে বড় ভূমিকা। আর দুর্যোগ কেটে গেলেও যে কাজে ফিরবেন, সে নিশ্চয়তা নেই তাদের। এ জন্য কাজ হারানো এই মানুষগুলো রয়েছেন বেশি ঝুঁকিতে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনে কটেজ, অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এখাতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৩ মিলিয়ন, যারা দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৩৫ দশমিক ৪৯ শতাংশের যোগান দিচ্ছে। এখাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, করোনার অভিঘাতে স্থবির অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে হলে সমাজের সবার হাতেই টাকার সরবরাহ থাকতে হবে। যেমনটি বিশ্বের অন্যান্য দেশেও করা হচ্ছে। কারণ, শুধু উত্পাদকদের হাতে টাকা গেলে হবে না। উত্পাদিত পণ্য কিনবেন যিনি, তার হাতেও টাকা থাকতে হবে। নইলে পণ্য কিনবেন কীভাবে? উত্পাদক-ভোক্তা কাউকে এখানে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। একইভাবে একজন চা-দোকানি থেকে শুরু করে মাঝারি উদ্যোক্তা পর্যন্ত, সবার প্রতি যত্নশীল হতে হবে। সবাইকে প্রণোদনার সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প-ব্যবসা খাত শ্রমঘন। বিপুল কর্মীবাহিনী এসব খাতে কাজ করে। ফলে, শুধু বড় উদ্যোক্তাদের আর্থিক সহায়তা দিলেই অর্থনীতি ঠিক থাকবে—এমন ধারণা ভুল।
এসএমই ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আলি জামান বলেন, বড় ব্যবসায়ীরা তাদের ক্ষতি অন্য ব্যবসা থেকে পুষিয়ে নিতে পারলেও ছোট ব্যবসায়ীদের সে সুযোগ নেই। তারা সহায় সম্বল তথা সর্বস্ব পুঁজি দিয়ে ব্যবসা করে থাকেন। দীর্ঘ মেয়াদে ছুটি আর লকডাউনের সময়কালে অনেক ব্যবসায়ী তার পুঁজি ভেঙে সংসার খরচ চালিয়েছেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এদের অনেকেই আর স্বাভাবিক আগের অবস্থায় ফিরতে পারবেন না। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিতে যাদের অবদান বেশি তারাই আজ বেশি ক্ষতির সম্মুখীন। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য প্রণোদনা ঘোষণা করলেও তা পাওয়া যাচ্ছে না।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, করোনা পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারের পক্ষ হতে বড় অঙ্কের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হলেও উদ্যোক্তারা ব্যাংক হতে প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ঋণ সহায়তা ও প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে বেশ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন। তিনি জানান, ঢাকা চেম্বার ইতিমধ্যে বিভিন্ন খাতের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে এবং উদ্যোক্তাদের বেশিরভাগই, প্রণোদনা প্যাকেজ হতে প্রয়োজনীয় ঋণ সহায়তা না পাওয়ার বিষয়টিকে বর্তমান পরিস্থিতিতে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ ইত্তেফাককে বলেন, জাতীয় অর্থনীতির জন্য ছোটদের ঋণ দেওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাংলাদেশ ব্যাংক মাঝে মধ্যে ব্যাংকগুলোকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেয়। কতটুকু ছোটদের দিতে হবে সে বিষয়ে নিয়মও করে দেয়। তবে সে নিয়ম মানার বিষয়ে ব্যাংকগুলোর ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো চাপ থাকে না। তাই ব্যাংকগুলোকে এ বিষয়ে প্রেশারে রাখতে হবে।